প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিশু তুহিন হত্যা : এ কেমন বর্বরতা?

মাহফুজা অনন্যা : আবরারের শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই পাঁচ বছরের শিশু তুহিনের বীভৎস লাশের ছবি এবং ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া দেখে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। আমার কাছে মনে হয়েছে ঘটনাটি গুজবও হতে পারে। মানুষ এতো পাশবিক হতে পারে? পাঁচ বছরের শিশু হত্যা করে কান কেটে, অন্ডকোষ কেটে বিচ্ছিন্ন করে লাশটিকে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছে। বিশ্বাস করতে পারিনি। তাই এক ছোট ভাইয়ের পোস্ট দেয়া দেখে কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কি সত্যি? ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সে আমাকে একটি লিংক পাঠালো ভিডিওসহ। আমি বেশীক্ষণ তাকাতে পারিনি। পাঁচ বছরের শিশুর ঝুলন্ত লাশ। কি অপরাধ করতে পারে ছোট শিশু তুহিন? কেন তার এই নির্মম মৃত্যু? জেনেছি প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে নিজের সন্তানকে নারকীয়ভাবে হত্যা করে এক পিতা। এ হত্যায় তুহিনের বাবা, চাচা, চাচী, চাচাতো বোনসহ আরও অনেকেই জড়িত। ছবিতে ঝুলিয়ে রাখা লাশের পেটে দুটি ছুরি ঢোকানো রয়েছে। তাতে নাকি প্রতিপক্ষের নাম লেখা। এখান থেকে কিছুটা স্পষ্ট যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই নিজের শিশুসন্তানকে খুন করে। মানুষ কতো নিচে নামতে পারে ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। একজন পিতা যেখানে সন্তানের জন্য জীবন বিলিয়ে দিতে পারেন সেখানে পিতা নিজেই ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকেই হত্যা করেছেন। আজকের পৃথিবীর মানুষ এতোটাই স্বার্থমগ্ন যে, সে তার চারপাশের আয়নায় শুধু নিজেকেই দেখছে, নিজেকে আর নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছে না।

ফলশ্রুতিতে পিতার কাছে খুন হচ্ছে শিশু, ধর্ষণ হচ্ছে নারীশিশু, এমনকি মায়ের কাছেও খুন হতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের। যেখানে একটি শিশু পিতার কাছে নিরাপদ নয়, মায়ের কাছে নিরাপদ নয়, তাহলে শিশুরা তার পরিবারের কারও কাছেই নিরাপদ নয়। শিশুদের যদি পরিবারের কাছেই নিরাপত্তা না থাকে তাহলে এ পৃথিবী কীভাবে তাদের বাসযোগ্য হবে? যে পরিবারে একটি শিশুর সবচেয়ে নিরাপদে থাকার কথা সেই পরিবারেই যদি তার নৃশংস খুন হতে হয় তাহলে আজ আর কি বলার আছে? দিন দিন আমরা কোথায় তলিয়ে যাচ্ছি মানুষ ডুবে যাচ্ছে অনিশ্চিত লোভের অতলে। সামান্য কারণে কিংবা মতের অমিল হলে কথা কাটাকাটির জের ধরে মানুষ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করছে। ভাই ভাইকে, বন্ধু বন্ধুকে, স্বামী স্ত্রীকে, বাবা সন্তানকে।

মানুষের কতোটা নৈতিক অবক্ষয় হলে একের পর এক এতোটা হৃদয়হীন, মর্মান্তিক ঘটনা ঘটাতে পারে? কিছুদিন পর পর একটি করে নতুন হত্যা বা ইস্যু তৈরি হলে আমরা বিচারের দাবিতে ফেসবুক কাঁপিয়ে তুলি, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আগের ঘটনাটা চাপা পড়ে যাচ্ছে। আবরারের জন্য মানুষের চোখের পানি এখনো শুকায়নি। বুয়েটের ছাত্র আবরার, আবু বকর, পূজাকেন্দ্রে খুন, সাগর-রুনি, তনু, নুসরাত, হোলি আর্টিসান আরও বেশ কয়েকটি অপমৃত্যু আমাদের বিবেককে জাতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। কেন আমরা এতোটা অমানবিক হয়ে যাচ্ছি? দিন দিন কেন আমরা এমন অস্থির জাতিতে পরিণতি হচ্ছি? এর থেকে পরিত্রাণের কি কোনো উপায় নেই? এ ব্যাপারে আমি এটুকুই বলতে পারি আইনের শাসন ও বিচার বিভাগকে আরও কঠোর হতে হবে। প্রতিটি হত্যা মামলা নিষ্পত্তিতে সরকারকে আরও আগ্রহী হতে হবে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা থেকে বের হয়ে দ্রুতবিচার কার্যকর করার প্রতি কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। খুনিকে রাজনৈতিক পরিচয়ে বিবেচনা না করে আসামি হিসেবে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। খুনির জন্য কঠিন শাস্তি বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিতে হবে বাংলাদেশে এখনো আইনের শাসন আছে, কারও ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও সে আইনের কাছে পার পাবে না, তাহলেই বাংলাদেশের জনগণের আইনের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা ফিরে আসবে। তখন মানুষ একটি অপরাধ করতে গেলে আইনের কঠোরতা তাকে বহুবার ভাবাবে, এতে আমাদের দেশে অপরাধপ্রবণতা কমে খানিকটা হলেও কমে আসবে। পরিশেষে একটি দেশের নাগরিক হিসেবে সবার জীবনের নিরাপত্তা আমাদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। তাই ঘরে-বাইরে কিংবা যে যে অবস্থানেই থাকি না কেন আমরা আমাদের জীবনের নিরাপত্তা চাই। লেখক : কবি ও শিক্ষক

সর্বাধিক পঠিত