প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মা-বাবার কাছে সন্তান অনিরাপদ হলে নিরাপদ আশ্রয় কোথায়?

মহসীন কবির : সন্তান হারালে যেমন মা কাঁদে তেমনি সন্তানও কাঁদে মা-বাবার জন্য। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এখন সেই নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত আশ্রয় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। নবজাতক সন্তান এখানে-সেখানে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কখনো মৃত আবার কখনও জীবিত।

সামাজিক সংকটের কারণ উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাবা-মায়ের মায়া-মমতা ঠিক আগের মতো নেই। আর একারণেই সমাজে ঘটছে নানা ঘটনা। বাবা ও মায়ের সঙ্গে সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এ দূরত্ব কখনো প্রাণঘাতি পর্যন্ত হয়ে উঠছে। এর পরিণাম হচ্ছে কখনো মায়ের হাতে সন্তান খুন। আবার মা-বাবার হাতে খুন হচ্ছে সন্তান। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ অবক্ষয়কে দায়ী করেছেন। আইনের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেও দায়ী করেছেন কেউ কেউ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় একটি পুকুরে ভাসমান কার্টনে পাওয়া গেছে এক নবজাতকের লাশ। গতকাল বুধবার সকালে উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের দত্তপাড়া গ্রামের পুকুর থেকে লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। ২৫ মে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকার ভবন পথকে এক নবজাতককে নিচে ফলে হত্যা করেছেন মা। চাচার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জন্ম নেয়া ফেলে দেয়া সেই নবজাতক।

মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার দক্ষিণ ঠেঙ্গামাড়া গ্রামে নিজের ১৪ দিনের শিশু সন্তানকে পুকুরে ফেলে হত্যার দায়ে ময়না আক্তার (২২) নামে এক নারীকে আটক করেছে পুলিশ। এর আগে ১৩ অক্টোবর বিকেলে শিশু জামিলার লাশ উদ্ধার করা হয়।

গত ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানার কাজীর দেউড়ি এলাকায় নেশাগ্রস্ত ছেলের ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন বাবা। শনিবার ভোরে কাজীর দেউড়ির ২নং গলির ভিতরে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত বাবা রঞ্জন বড়ুয়া (৫২) জেলার রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী এলাকার সমীরণ প্রসাদ বড়ুয়ার ছেলে। পুলিশ বাবার হত্যাকারী ছেলে রবিন বড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করেছে।

২৪ জুলাই কুষ্টিয়ার মিরপুরে নিমতলা চৌদুয়ার গ্রামে রুহুল আমিন ওরফে রজি কারি (৬৮) নামে এক ব্যক্তিকে তার ছেলে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে। রজি কারিকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছেন তার স্ত্রী। জানা যায়, রজি কারির সঙ্গে তার ছেলে সাজু কারি মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঝগড়া বিবাদে জড়িয়ে পড়তো। বাবা রুহুল আমিন ওরফে রজি কারির সঙ্গে ছেলে সাজু কারির বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে সাজু কারি লোহার রড দিয়ে বাবার মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। এ সময় মা ঠেকানোর চেষ্টা করলে তাকেও পিটিয়ে আহত করে। প্রতিবেশীরা ছুটে এসে রুহুল আমিন ওরফে রজি কারিকে উদ্ধার করে মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৫ অক্টোবর লক্ষ্মীপুরে পারিবারিক কলহের জের ধরে কাউছার নামের ৭ বছর বয়সী এক শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ওই শিশুর মা স্বপ্না বেগমকে আটক করেছে পুলিশ। সদর উপজেলার দক্ষিণ চররুহিতা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। কাউছার স্থানীয় পিকআপভ্যান চালক মো. রাসেলের ছেলে ও লোকমানিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার ১ম শ্রেণির ছাত্র।

প্রতিবেশীরা জানান, গাড়ি চালানোর কাজে বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকেন স্বপ্না বেগমের স্বামী রাসেল। এ সুযোগে এলাকায় অসংযমী জীবনযাপন করতেন স্বপ্না। কাউছার মায়ের কাছে ১০ টাকা চাইলে তাকে মারধর করে তার গলাটিপে ধরেন মা স্বপ্না। কিছুক্ষণ পর বাবা (সস্তান) মারা গেছে বলে চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করেন তিনি। এর আগেও স্বপ্নার বাবার বাড়িতে তার আরেকটি সন্তান রহস্যজনক কারণে মারা যান বলে জানান প্রতিবেশীরা।

সুনামগঞ্জে পাঁচ বছরের শিশু তুহিন মিয়াকে হত্যার ঘটনায় তার বাবা ও দুই চাচাকে প্রথমিকভাবে দায়ি করেছেন পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের হেফাজতের আদেশ দিয়েছে আদালত। গত রোববার ১২ অক্টোবর শেষ রাতে দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল বাসিতের ছেলে তুহিন মিয়াকে (৫) হত্যা করে লাশ গাছে ঝুলিয়ে রাখে অজ্ঞাত খুনিরা। এ ঘটনায় সোমবার রাতে তুহিনের মা মনিরা বেগম অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ বাবাকে দায়ি করলেও মা বলছেন বাবা সন্তানকে হত্যা করতে পারেন না।

২৩ জুলাই কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় জমি নিয়ে পারিবারিক কলহের জেরে ছেলের হাতে রুহুল আমীন (৭০) নামে বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় রুহুল আমীনের স্ত্রী মাহিমা খাতুন (৬০) গুরুতর জখম করে।

নিহত রুহুল আমীন উক্ত এলাকার মৃত আফসার মন্ডলের ছেলে। ঘাতক ছেলের নাম সাজু (৩০)।

সমাজ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক লোকলজ্জা আর নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই ঘটছে ভ্রæণ হত্যা, সন্তান জন্মের পর লোকচক্ষুর অন্তরালে নিক্ষেপ করা হচ্ছে ডাস্টবিনে। সামাজিক, পারিবারিক ও নৈতিক মূল্যবোধের ক্রমাগত অবক্ষয় এবং পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতার কারণে মায়েদের হাতে শিশু হত্যার মতো নৃশংসতার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে বলে মনে করেন অপরাধ বিজ্ঞানীরা।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি সেপ্টেম্বর) ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ শিশুকে। অপহরণের পর হত্যার শিকার ২৩ শিশু। এ ছাড়া প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোসহ বিভিন্ন কারণে খোদ জন্মদাতা ও জন্মদাত্রীর হাতেই নিষ্ঠুর-নির্মম হত্যার শিকার হয়েছে ২৮ শিশু।

এ বছরের ৩১ মার্চ প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মা-বাবার দ্বারা খুন হয়েছে ৫৩ শিশু। ২০১৮ সালে ৪ হাজার ৫৬৬ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গত বছর ৪১৮ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ২৩ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৮১ শিশুকে অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারীরা হত্যা করেছে। ৩১ শিশুকে অপহরণের পর হত্যা এবং ৬০ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেছেন, দেশে নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা, মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়া এবং বিচারহীনতা তিনটি সংস্কৃতির জন্য আমাদের দেশের বিশাল একটি ধস নেমেছে। যার প্রমাণ হচ্ছে বাবা ছেলেকে হত্যা করছে। নৃসংশতা, বর্বরতা, পাশবিকতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। একই বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে আরেকজন ছাত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করছে। লেজুরবৃত্তি রাজনীতি এর জন্য দায়ী। শিক্ষকরা যে লেজুর বৃত্তি রাজনীতি করছে তা এখনই বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকরা সে ধরনের আন্দোলন করবে যেখানে ছাত্রদের অধিকার সংরক্ষণ হবে, দেশের অধিকার সংরক্ষিত হবে এবং মূল্যবোধ জাগ্রত হবে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পারিবারিক, জমিজমা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে সারাদেশে এমন নির্যাতনের হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শত্রুকে পরাস্ত করতে টার্গেট করা হচ্ছে শিশুকে। মানসিক ব্যাধির কারণে ধর্ষণ, নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। ক্ষেত্রবিশেষে আইনের আওতায় আনা গেলেও অপরাধীরা যথোপযুক্ত শাস্তি পাচ্ছে, এমন নজির বিরল।

সূত্র : প্রথম আলো, দৈনিক আমাদের সময় ও মানজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত