প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাবির গণরুম যেন একেকটি টর্চার সেল

ওয়ালি উল্লাহ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থীদের প্রায় এক বছরেরও অধিক সময় কাটে অনেকটা টর্চার সেলে। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক হলের গণরুমগুলোই যেন এক একটা টর্চার সেল। মাঝ রাত থেকে ভোর পর্যন্ত নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের।  মানবজমিন

মূলত নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে বিরোধী মতের ছাত্র ও নিজ দলের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে নানা ধরনের নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ। প্রতিবছর নতুন ব্যাচ আসার সঙ্গে সঙ্গে গণরুমে শুরু হয় রাতভর র‌্যাগিং নামের নির্যাতন। এই টর্চারে নানা ধরনের গালিগালাজ ও  মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি চলে শারীরিক নির্যাতন। মুরগি হওয়া (বিশেষ প্রক্রিয়ায় শাস্তি), এক পায়ে দাঁড়িয়ে কান ধরে থাকা, জানালার রড ধরে ঝুলে থাকা, বিশেষ ধরনের যৌন বিকৃত আচরণ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকাসহ নানা ধরনের নির্যাতন চলে গণরুমে থাকা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের। মূলত হলের গণরুম ও হলের  গেস্ট রুমগুলোতে চলে এই নির্যাতন।

গণরুমে সারা রাত জাগিয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ম্যানার শেখানোর নামে এই নির্যাতন করে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। যাদের সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। গণরুমে কেউ বিশেষ কোনো ভুল করলে তার ডাক পড়ে হলের গেস্টরুমে। সেখানে আরো বেশকিছু সিনিয়রসমেত শুরু হয় ‘ভুলের’ বিচার প্রক্রিয়া।

নাম প্রকাশ না করে তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রলীগ কর্মী বলেন, গেস্টরুমে ছাত্রলীগ কর্মীদের ভুলেরও বিচার করা হয়। একবার অন্য হলের সঙ্গে গ্যাঞ্জামের কারণে আমাদের হলের সিনিয়র (৪২ ব্যাচ) আমাকে মেরে রক্তাক্ত করে। আর গণরুমের অতি ‘পাকনা’দেরও গেস্টরুমে এনে ‘সাইজ’ করা হয়।

র‌্যাগিংয়ের ভয়ে প্রথম বর্ষে কয়েকদিন ক্লাস করার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তি বাতিল করে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এমন একজন শিক্ষার্থী ফুয়াদ খন্দকার বলেন, আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জেনে জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু র‌্যাগিংয়ের জন্য হলে থাকতে পারতাম না। ডেমরা থেকে এসে ক্লাস করাও আমার জন্য কষ্টকর ছিল। একসময় হতাশ হয়ে ক্যাম্পাসই ছেড়ে দেই। এদিকে প্রায় এসব নির্যাতনে গুরুতর আহত হয় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা। গত বছরের ?মার্চে গণরুমে রড ধরে ঝুলার নির্দেশ মানতে গিয়ে কোমর ও পায়ে প্রচণ্ড চোট পেয়ে গুরুতর আহত হন প্রথম বর্ষের ছাত্র আজওয়াদ রহমান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের (৪৭তম ব্যাচ) ছাত্র। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চিকিৎসকের কাছে ‘টয়লেটে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে’ বলার নির্দেশও দিয়েছিল কথিত সিনিয়ররা। এই ঘটনার মাসখানেক আগে র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারান কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. মিজানুর রহমান। তৎকালীন ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীরা মিজানের সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। মিজানুর সরল-সোজা হওয়ার কারণে সিনিয়ররা তাকে আলাদাভাবে অকথ্য ভাষায় গালি দেয়াসহ শারীরিক নির্যাতন করে। পরদিন  আবারো বিভাগের সিনিয়ররা হুমকি-ধমকি দেয় মিজানকে। নির্যাতনের মুখে একসময় মিজান অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। পরবর্তীতে মিজানের বাবা আসলে তাকেও চিনতে পারেন না মিজান। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে মিজানকে অনেকদিন ঢাকায় চিকিৎসা নিতে হয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে পরিচয় দিতে ভুল করায় রসায়ন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র মোশাররফ হোসেনের কান ফাটান কথিত সিনিয়ররা। ১৭ই এপ্রিল মধ্যরাতের দিকে মওলানা ভাসানী হলের ১১৪ নং রুমে এ ঘটনা ঘটে। জানা যায়, ভাসানী হলের ১১৩ নং ও ১১৪ নং রুম হলো টর্চার সেল। এইসব রুমে নিয়মিত জুনিয়রদের ডেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।

একদিন প্রথম বর্ষের (৪৮ আবর্তন) শিক্ষার্থীদের ১১৪ নং রুমে ডাকা হয়। কিন্তু  পরিচয় দিতে ভুল করায়  মোশাররফকে বাংলা বিভাগের ৪৭ ব্যাচের জাহিদ হাসান তুহিন মারধর করেন। মারধরের পর তাকে ১১৩ নং রুমে পাঠানো হয়। এরপর বাংলা বিভাগের ৪৭ ব্যাচের মো. নজরুল তাকে পুনরায় মারধর করেন। এতে তার বাম কান ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। পরবর্তীতে তাকে সুস্থ হতে উন্নত চিকিৎসা নিতে হয়।

গত জুলাই মাসের মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু  হলের গণরুমে প্রথম বর্ষের আরেক শিক্ষার্থীর কান ফাটান কথিত সিনিয়ররা। গণিত বিভাগের প্রথম বর্ষের মো. ফয়সাল আলম নামে এক শিক্ষার্থী এই বর্বরতার শিকার হন।  জানা যায়, রাত ১টার দিকে গণরুমে দ্বিতীয় বর্ষের ৩০/৩৫ জন শিক্ষার্থী গিয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচয় জানতে চান।

ঠাণ্ডাজনিত সমস্যার কারণে উচ্চস্বরে পরিচয় দিতে না পারায় ফয়সালকে বিকৃত অঙ্গভঙ্গি করতে বলা হয়। এরপর তাকে আবার জানালার গ্রিল ধরে ঝুলে থাকার নির্দেশ দেন শিহাব নামে দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী। অসুস্থ থাকায় ফয়সাল এতে অস্বীকৃতি জানালে শিহাব তাকে চড়-থাপ্পড় মারেন। এতে ফয়সালের কান ফেটে যায়। পরবর্তীতে ফয়সালকেও দীর্ঘমেয়াদি উন্নত চিকিৎসা নিতে হয়।

তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যম ও প্রশাসনের কাছে মুখ খুলেন না। অধিকাংশ র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় ছাত্রলীগের কর্মীরা জড়িত থাকার খবর আসে। এ ছাড়া নেতাদের নির্দেশে ছাত্রলীগকর্মীরা গণরুমে ‘ম্যানার’ শেখাতে যায় বলে অভিযোগও রয়েছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা বলেন, ‘আমাদের কোনো কর্মীই র‌্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িত নই। ঢালাওভাবে এধরনের অভিযোগ করা হচ্ছে। এটা আগে ছিল কিন্তু আমরা এই সংস্কৃতিটি বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। কেউ যদি অতি উৎসাহী হয়ে এমন করে তবে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।

প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক বশির আহমেদ বলেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় র‌্যাগিং অনেকটা কমে আসছে। সামনে আরো কমবে বলে আমরা আশাবাদী। র‌্যাগিং বন্ধের জন্য আমরা হলের বিভিন্ন জায়গায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। আর  কোনো ঘটনা ঘটলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, প্রভোস্ট কমিটির একটা বৈঠক হয়েছে। সেখানে শিক্ষকরা নিজেদের উপস্থিতি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে র‌্যাগিং নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিভাগের ছাত্র উপদেষ্টাদের এই ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। র‌্যাগিংয়ের ঘটনা কিছু গোপনেও ঘটছে। তবে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। হলগুলোর করিডোর, কমনরুম ও গণরুমের সামনে দরজায় সিসি ক্যামেরা লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গণরুমে কে ঢুকছে এসব তথ্য আমরা  নেবো। তবে যারাই প্রথম বর্ষে র‌্যাগিং-এর শিকার হচ্ছে তারাই দ্বিতীয় বর্ষে এসে র‌্যাগ দিচ্ছে। আশ্চর্য সাইকোলজি। ফলে আমরা কাউন্সেলিংয়ের ব্যাপারেও ভাবছি।

ডব্লিউএস/এসবি

সর্বাধিক পঠিত