প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অনেক নেতা এখন লাপাত্তা

ডেস্ক রিপোর্ট : অবৈধ ক্যাসিনো, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মের হোতা হিসেবে পরিচিত ক্ষমতাসীন দলের ‘চিহ্নিত’ নেতারা লাপাত্তা হয়ে গেছেন। অবৈধ ক্যাসিনোবিরোধী কঠোর অভিযান শুরুর পরপরই ‘ক্ষমতাধর’ এসব নেতা আত্মগোপনে চলে গেছেন। যাদের কেউ বিদেশে, কেউবা দেশের ভেতরেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। তবে গত ৬ অক্টোবর বহুল আলোচিত ক্যাসিনো গডফাদার খ্যাত যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও তার সহযোগী যুবলীগ নেতা এনামুল হক আরমান গ্রেফতার হওয়ার পর অপকর্মে জড়িত নেতারা আরও বেশি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। এ কারণে গ্রেফতার এড়াতে গা ঢাকা দিয়েছেন তারা। অন্যদিকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে অবৈধ ক্যাসিনোবিরোধী কঠোর অভিযান শুরুর পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ করা গেলেও বর্তমানে সেই গতি কিছুটা মন্থর হয়ে এসেছে বলেও অনেকে মনে করছেন। এ কারণে সুযোগ বুঝে নেতাদের পক্ষে নামছে সুবিধাভোগীরা। সময়ের আলো

গতকালও যুবলীগ নেতা সম্রাটের রিমান্ড শুনানিকালে শত শত কর্মী বা সমর্থক আদালতের বাইরে অবস্থান নিয়ে সম্রাটের পক্ষে সেøাগান দেয়। তবে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এলিটফোর্স র‌্যাব এ বিষয়ে সার্বক্ষণিকই কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুবুল আলম  বলেন, অবৈধ ক্যাসিনোসহ নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে র‌্যাবের অভিযান চলমান রয়েছে। কেবল পলাতকদের গ্রেফতারই নয়, এসব বিষয়ে তথ্যানুসন্ধানসহ সার্বক্ষণিক কাজ চলছে। অবৈধ ক্যাসিনো, জুয়াসহ রাজধানীর বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত শতাধিক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। মাঝখানে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) অভিযানে নামলেও শেষ পর্যন্ত সমালোচনা নিয়ে অভিযান থেকে প্রায় বিরতিতে চলে গেছে। এরই মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, একই কমিটির সহসভাপতি এনামুল হক আরমান, সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা জিকে শামীম, কৃষক লীগের নেতা শফিকুল আলম শামীম, বিসিবির পরিচালক লোকমান হোসেন ও সেলিম প্রধানসহ অন্তত ১৬ জন প্রভাবশালী। তবে অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই আত্মগোপনে চলে গেছেন যুবলীগ নেতা সম্রাটের অন্যতম সহযোগী কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ, যুবলীগের দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা মোল্লা আবু কাওসার ও গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের নেতা দুই ভাই এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়াসহ অনেকেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই গডফাদারদের কেউ বিদেশে কেউবা দেশেই আত্মগোপন করেছেন। কেউ আটক হলেও প্রকাশ করা হচ্ছে না বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তবে তাদের আটক বা গ্রেফতারে তেমন প্রকাশ্য তৎপরতা দেখছে না সাধারণ মানুষ।

রাজধানীতে অবৈধ ক্যাসিনোর সংখ্যা প্রায় ৬০টির মতো। যার অধিকাংশেরই নিয়ন্ত্রক যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ও স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগের নেতারা। তবে এসব নেতার নেপথ্যেও রয়েছে বড় বড় রাঘব-বোয়াল। তাদের নাম-পরিচয় নিয়ে নানা গুঞ্জন উঠলেও প্রকাশ্যে আনা হয়নি। অনেকেই মনে করেনÑ অবৈধ ক্যাসিনো, জুয়া বা ক্লাব থেকে আয় করা অর্থের ভাগ-বাটোয়ারায় বড়মাপের প্রভাবশালী কিছু রাজনৈতিক নেতা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কিছু সাংবাদিক নেতাসহ অনেক প্রভাবশালীর নাম ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও নেপথ্যের এই হোতাদের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেয়নি।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, অবৈধ ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অভিযানে সরকারের ভাবমূর্তি বেড়েছে। নিজ দলের লোকদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান একদিক থেকে দৃষ্টান্তও বটে। তবে অবৈধ ক্যাসিনোসহ চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত গডফাদাররা দ্রুত গ্রেফতার না হলে অভিযানের ফল প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ফলে সরাসরি জড়িতদের পাশাপাশি নেপথ্যের নায়কদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

জানা গেছে, সম্রাটের ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুবলীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক সাঈদ অভিযানকালে বা পরপরই সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন। ক্যাসিনোকাণ্ডে আলোচনায় আসা সম্রাটের আরেক সহযোগী যুবলীগ নেতা বাদল ও জুয়াড়ি খোরশেদ আলম, ঢাকার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব (সুলতান) গা ঢাকা দিয়েছেন। এ ছাড়াও ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মোবাশে^র চৌধুরী, যুবলীগের বহিষ্কৃত দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান, গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু, তার ভাই ও একই কমিটির যুগ্ম সম্পাদক রুপন ভূঁইয়া ও আবদুর রশীদের নাম এলেও তারা এখনও ধরা পড়েনি। এমন অপকর্মে জড়িত এরকম আরও বেশকিছু নেতা ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর অভিযানের মধ্যে আত্মগোপনে গেছেন বলে জানা গেছে। তবে গেণ্ডারিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা এনু তার বাসায় অভিযানের আগেই বিদেশে পালিয়েছেন বলেও শোনা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকায় অন্তত ১০টি ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার নেপথ্যের মূল হোতা ছিলেন যুবলীগ নেতা সম্রাট। এছাড়া ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনোর মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওসার। ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবের মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন গ্রেফতারকৃত যুবলীগ নেতা খালেদ ভূঁইয়া, আরামবাগ স্পোর্টিং ক্লাব, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ক্যাসিনোর মূল নিয়ন্ত্রক যুবলীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। এ ছাড়াও মতিঝিলের আজাদ বয়েজ ক্লাবের নাছির উদ্দিন ও হাসান উদ্দিন জামানের বিরুদ্ধে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সারা দেশে টেন্ডার ও চাঁদাবাজি এবং অবৈধ ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হয়। এ পর্যন্ত র‌্যাব, পুলিশ ও শুল্ক গোয়েন্দা মিলে ৩৫টিরও বেশি অভিযান পরিচালনা করেছে। ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবে র‌্যাবের প্রথম ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের একই দিন গুলশানের বাসা থেকে এই ক্লাবের মালিক ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকেও গ্রেফতার করা হয়। ইয়ংমেনস থেকেও জুয়া ও ক্যাসিনো খেলার আসরে থাকা ১৪২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ওই রাতে ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র এবং বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ ক্যাসিনোয় অভিযান চালান র‌্যাব সদস্যরা। ২০ সেপ্টেম্বর গুলশান নিকেতনে অভিযান চালিয়ে ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাজির মাফিয়াখ্যাত যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা জিকে শামীমকে বিপুল টাকা, এফডিআর ও অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। একই সন্ধ্যায় কলাবাগান ক্রীড়া চক্রে অভিযান চালিয়ে সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ ওরফে কালা ফিরোজকে ইয়াবা ও অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হয়। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও তার ছোটভাই একই কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়ার তিনটি বাসায় র‌্যাব অভিযান চালিয়ে অন্তত ৫ কোটি টাকা, আট কেজি স্বর্ণ ও ছয়টি অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করে। তবে এ অভিযানেও এই দুই ভাইকে গ্রেফতার করতে পারেনি র‌্যাব। অথচ জুয়া ও ক্যাসিনোসহ নানা অপকর্মের মাধ্যমে বিপুল টাকা ও স্বর্ণ ছাড়াও রাজধানীতে অন্তত ৩০টি বাড়ির মালিক হয়েছেন এনু ও রুপন। এছাড়া দাপটে এসব নেতার বাসা-বাড়িতে অবৈধ ক্যাসিনোবিরোধী বেশ কয়েকটি অভিযানে মিলেছে একাধিক ভয়ঙ্কর আগ্নেয়াস্ত্র। মূলত এসব অস্ত্রের হুঙ্কার বা মহড়া দিয়েই বিভিন্ন এলাকা বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন একশ্রেণির অস্ত্রবাজ নেতা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত