প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নৃশংসতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে

আবু জাহেদ : সম্প্রতি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে তুহিন নামের পাঁচ বছরের এক শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। উপযুক্ত শব্দের অভাবে নৃশংসতার কথা উল্লেখ করেছি, কিন্তু সত্যিকার অর্থে নৃশংসতারও সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বাড়ির পাশে শিশুটির গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা লাশ, ভোরবেলা পরিবারের সদস্যরা দেখতে পায়। তার লিঙ্গ কেটে নেয়া হয়েছে, দুটো কানও কাটা, সম্ভবত ছুরি দিয়ে গলা কেটে সেই ছুরি শিশুটির পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে ওই অবস্থায় গলায় রশি বেঁধে গাছের ডালের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমি চরম আতঙ্কিত হয়ে চিন্তা করছি শিশুটিকে বাঁচিয়ে রেখে, এসব পৈশাচিক বর্বরতা তার উপরে সেই পিশাচের দল চালিয়েছিলো কিনা। চালাতেই পারে, আমরা জাতি হিসেবে পিশাচ ছাড়া তো কিছু নয়। এ রকম বহু ঘটনা আমরা নিত্যদিন জন্ম দিয়ে চলেছি। শুধু খুন করার উদ্দেশ্য হলে খুন করে চলে যেতো, এভাবে পৈশাচিক বর্বরতায় ছোট শরীরটিকে ক্ষতবিক্ষত করতো না। সেই বর্বর পিশাচের দল পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছে নির্যাতন করে, এমনকি বাড়ির পাশে এভাবে লাশ ঝুলিয়ে রেখে, তারা কাছ থেকে মূলত আরও মজা নিতে চেয়েছে। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, আমাদের পক্ষে সবই সম্ভব।

এই জাতি পৃথিবীর সব থেকে, নিশ্চিতভাবে বর্বরতম জাতিতে পরিণত হয়েছে। সামান্য দশ টাকার জন্য আমরা খুন করি, লাশ কেটে টুকরো টুকরো করতে আমাদের বাধে না। যৌতুকের টাকার কারণে জীবন্ত শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয় পিশাচ স্বামী। যতোদূর আন্দাজ করা যাচ্ছে তাতে করে পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হয়। ছোটবেলায় গ্রামে কিছু শব্দ শুনতাম, সেগুলো কানে এখন ভাসছে, পরিবারশুদ্ধ নির্বংশ করে দাও, সাপের বাচ্চাও সাপ হবে, তাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না, এই ধরনের আরও অনেক শব্দ, যা আমাদের বীভৎসতা ক্রুরতা এবং অমানবিকতাকে প্রকাশ করে। একের পর এক এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। আজকে একটা ঘটছে, কালকে নতুন ঘটনায় সেই পুরনো ঘটনার জায়গা দখল করে নিচ্ছে। আমরা সেই নতুন ঘটনার পেছনে ছুটছি। মানুষেরওবা কি দোষ, কেননা মানুষ খুব বেশি সময় এই মানসিক অত্যাচার, নির্যাতন, বীভৎসতা নিতে পারে না। আর করারইবা আছে কি সাধারণ আমজনতার। কে শোনে তাদের কথা। এই যে এতো প্রচার, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, দ-ের ভয়, তারপরও কী কিছু থামছে। অপরাধী কী ভয় করছে। নিশ্চিতভাবে না, ভয় করছে না। করলে একের পর এক, এই ধরনের ঘটনা ঘটে যেতে পারতো না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা কেবল নয়, এ হলো আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থার ব্যর্থতা।

একদিকে অবিকশিত চরম নৈরাজ্যপূর্ণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, যা কিনা একদিকে বানিয়েছে সম্পদের পাহাড়, আর অন্যদিকে সৃষ্টি করেছে সীমাহীন অনিশ্চয়তা আর হাহাকার। মানুষের সঙ্গে মানুষের একমাত্র সম্পর্কের ভিত্তি হয়েছে নগদ টাকা। মনুষ্যত্ব, প্রেম, ভালোবাসা সহনশীলতা, মানবিকতা, সব কিছু আমরা বিক্রি করে দিয়েছি নগদ টাকার মূল্যে। সেইসঙ্গে পুরো সমাজের নৈতিক শিক্ষার একমাত্র সিলেভাজ বানিয়ে রাখা হয়েছে সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেকার পুরনো অর্বাচীন বর্বর ইসলামকে। ছোটকাল থেকে ধর্মের নামে সহিংসতা বর্বরতা ঘৃণা আর নিষ্ঠুরতার শিক্ষা যে আমাদের সমাজের মানুষ পেয়ে থাকে, তা তো আর ভুল নয়। বিরাট বিরাট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের যত্রতত্র ধরে জবাই করে দিচ্ছি, হাটে-বাজারে, রাস্তাঘাটে সব জায়গায় সেই প্রাণীদের রক্ত। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে পশু রক্তের হোলি খেলছি, বাচ্চাদের কেউ তাই দেখাচ্ছি এবং শেখাচ্ছি। অন্য মানুষদের ঘৃণা করতে শেখাচ্ছি। আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি অনেক মানুষের টাইমলাইনে সেই শিশুটির ক্ষত-বিক্ষত ছবিটি ঘুরে বেড়াতে দেখে। তারা নিশ্চিতভাবেই মানবিকতার কথা বলছে এবং মানবিক কারণেই ছবিটি পোস্ট করেছে। অন্তত পক্ষে বিচার চাইতে পোস্ট করেছে। তাদেরও কিন্তু এই বীভৎস ছবিটি পোস্ট করতে বাধেনি। মানবিক বোধের এ যেন এক বীভৎস পরিণতি আমাদের। ধন বৈষম্য মানুষের সহ্য ক্ষমতার মধ্যে থাকা দরকার। চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ফলে যে অস্থিরতা এবং নির্লজ্জ নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা, সামাজিক অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে তার লাগাম টেনে ধরতেই হবে এবং অবশ্যই মানবিক বিজ্ঞানভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা ব্যবস্থাকে সার্বজনীন করতে হবে এবং সেইসঙ্গে নিষ্ঠুরতা এবং সমাজকে বিভক্ত করার ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষাকে বাতিল করতেই হবে। কেবলমাত্র আইনের প্রয়োগ করে ভয় দেখিয়ে ক্রসফায়ার করে, এই ভয়াবহ সামাজিক দুরবস্থার পরিত্রাণ ঘটানো সম্ভব নয়। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত