প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বোর্ড সভায় দীর্ঘ অনুপস্থিতি
পদ হারাতে পারেন ঢাকা দক্ষিণের ৯ ও উত্তরের ১ কাউন্সিলর

সুজিৎ নন্দী : বোর্ড সভায় একনাগাড়ে দীর্ঘদিন অনুপস্থিতি ও অনৈতিক কাজে যুক্ত থাকায় পদ হারাতে পারেন ঢাকার দুই করপোরেশনের ১০ জন কাউন্সিলর। তাদের মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) নয়জন ও উত্তর সিটির (ডিএনসিসি) একজন।

২০১৫ সালের ২৮ মার্চ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে ডিএসসিসির মোট ১৯টি বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হলেও ৫৭টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের মধ্যে ওই নয়জন একাধারে তিন থেকে আটটি, এমনকি কেউ কেউ ১৪-১৫টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে দু’একজন দু’একবার ছাড়া বাকিরা অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে কেউ পূর্বানুমতিও নেননি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, করপোরেশনের বিভিন্ন কাজেও ওই কাউন্সিলরদের দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা যাচ্ছে। তাদের অনেকেই নিজ নিজ ওয়ার্ডের নাগরিকদের সমস্যায় এগিয়ে আসেন না।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি একাধারে করপোরেশন সভায় অনুপস্থিত ওই ৯ কাউন্সিলরের নাম সম্বলিত তালিকা করেছে ডিএসসিসি। ব্যবস্থা নিতে ওই তালিকা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হতে পারে। আইন অনুসারে যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া পর পর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকলে তাকে বরখাস্ত করা যাবে।

ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন দেশের বাইরে আছেন। দেশে আসার পর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন তিনি। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটি জনপ্রতিনিধিদের বিষয়। মেয়র উদ্যোগ নিয়ে এটি করতে পারেন। আমরা প্রশাসনিক কর্মকর্তা। আমরা এটি নিতে পারি না।’
স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন আইনে বলা হয়েছে, ‘মেয়র অথবা কাউন্সিলর তার স্বীয় পদ হতে অপসারণযোগ্য হবেন, যদি তিনি যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতিরেকে সিটি করপোরেশনের পর পর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকেন।’

অভিযুক্ত কাউন্সিলররা হচ্ছেন- ঢাকা উত্তরের সদ্য গ্রেপ্তার হওয়া হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে (পাগলা মিজান) এবং ডিএসসিসির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আশরাফুজ্জামান, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একেএম মমিনুল হক সাঈদ, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের গোলাম আশরাফ তালুকদার, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের মোস্তফা জামান (পপি), ২২ নম্বর ওয়ার্ডের তরিকুল ইসলাম সজীব, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের হাসান, ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বিল্লাল শাহ, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের ময়নুল হক মঞ্জু ও সংরক্ষিত আসনে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের রাশিদা পারভীন মণি।

একাধিক সূত্র জানায়, নিয়মিত বোর্ড সভায় অনুপস্থিত কাউন্সিলরদের বেশিরভাগই নগরীতে অবৈধ ক্যাসিনো, জুয়ার আসর ও ফুটপাতের অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণসহ নানা অপরাধে জড়িত। রাতভর তারা এসব অপকর্ম করেন, আর দিনের বেলা ঘুমিয়ে কাটান। করপোরেশনের বোর্ড সভাগুলো যেহেতু দিনে অনুষ্ঠিত হয়, সে কারণেই তারা উপস্থিত থাকতে পারেন না। অভিযোগ আছে, এই কাউন্সিলরদের অনেকেই সরকারের অনুমোদন না নিয়ে একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণও করেছেন। তারা জনপ্রতিনিধি হলেও নিজেরা নিয়ম মেনে চলেন না।
৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু ডিএসসিসির ১৯টি বোর্ড সভার মধ্যে মাত্র চারটিতে উপস্থিত ছিলেন। অনুপস্থিতির তালিকায় তার অবস্থান সবার ওপরে।

৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক সাঈদ ১৯টি বোর্ড সভার মধ্যে মাত্র ছয়টিতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, সপ্তম থেকে দশম, ১২তম থেকে ১৭তম পর্যন্ত মোট ১৩টি সভায়ই উপস্থিত ছিলেন না।
১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম আশরাফ তালুকদার ১২তম থেকে পরবর্তী ৮টিসহ ডিএসসিসির ১২টি বোর্ড সভায়ই অনুপস্থিত ছিলেন। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় নাগরিকদের অভিযোগ, তিনি করপোরেশনের কোনো কাজেও আন্তরিকভাবে অংশ নেন না। এলাকার উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন না। বিভিন্ন সনদের জন্য কার্যালয়ে গেলেও তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না।

বোর্ড সভায় অনুপস্থিতির বিষয়ে গোলাম আশরাফ তালুকদার বলেন, ‘অনেক সময় দেখা গেছে, যখন বোর্ড সভা ডাকা হয়, তখন আমাদের ফোন বন্ধ বা জরুরি কাজ থাকে। সে কারণে সভায় উপস্থিত থাকা সম্ভব হয় না।’
৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য কয়েকবার দেশের বাইরে ছিলাম। এজন্য আমি কয়েকটি সভায় উপস্থিত থাকতে পারিনি। আমি কোনো ক্যাসিনো, মদ, জুয়া, দখলবাজিসহ কোনো অপরাধে জড়িত নই।’

১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোস্তফা জামান পপি ১১টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাউন্সিলর হওয়ার পর থেকে তার দেখা পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। কোনো সামাজিক কাজে তাকে পাওয়া যায় না।এলাকায় বিভিন্ন অবৈধ কাজের সঙ্গেও তার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তরিকুল ইসলাম সজীব ডিএসসিসির সপ্তম থেকে ১৩তম পর্যন্ত একনাগাড়ে সাতটিসহ মোট ১১টি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, এলাকায় মাদক, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িত এই জনপ্রতিনিধি। করপোরেশনের কোনো প্রয়োজনে তাকে পাওয়া যায় না। তিনি প্রতিটি কাজে অনাগ্রহও দেখান।

৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. হাসান একনাগাড়ে প্রথম ৫টি সভায় উপস্থিত থাকলেও পরের ১৪টি সভার মধ্যে মাত্র একটিতে উপস্থিত ছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি ১৩টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিল্লাল শাহ ১১টি বোর্ড সভায় উপস্থিত ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্থ, আমার অপারেশন হয়েছে। এখন বাসায় আছি।’ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়

সর্বাধিক পঠিত