প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গণপূর্ত অধিদপ্তরে দুর্নীতির ১৫ উৎস

ডেস্ক রিপোর্ট : দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অস্বাভাবিক মূল্যে প্রাক্কলন তৈরি, অনাব্যশক প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও নিন্মামনের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারসহ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৫টি দুর্নীতির খাত চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিম দীর্ঘ তদন্তে গণপূর্তের দুর্নীতির উৎসগুলো চিহ্নিত করে তা প্রতিবেদন আকারে কমিশনে জমা দেয়। প্রতিবেদনে দুর্নীতি প্রতিরোধে ২০ দফা সুপারিশ করা হয়। দুদক কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক খান গতকাল বুধবার সকালে সচিবালয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের হাতে প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। এ সময় গণপূর্ত সচিব উপস্থিত ছিলেন।আমাদের সময়

পরে কমিশনার মোজাম্মেল হক খান সাংবাদিকদের বলেন, দুদক ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে টিম করেছে। একেকটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কে একেকটি টিম। টিমগুলো ওইসব প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, সক্ষমতা, কাজের গাফিলতি, দুর্নীতিপ্রবণ যে জায়গাগুলো, কোন কোন ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করলে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যায় সে বিষয়গুলো পরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। ২৫টির মধ্যে আজকের প্রতিবেদনটি ১৫তম।

দুদকের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা আনয়ন এবং জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। তিনি বলেন, আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি- এ গাইডলাইনকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব। যদি তদন্ত কমিটি করা লাগে, ডমেস্টিক কমিটি করা লাগে, পদ্ধতি পরিবর্তন করা লাগে, যা কিছু করা লাগে এ রিপোর্টকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।

দায়সারা গোছের রিপোর্ট পেলাম আর দেখলাম- এটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখ্ত স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে যেসব দুর্নীতির উৎস তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে

টেন্ডার প্রক্রিয়া : টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি, যেমন-অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, নেগোসিয়েশনের নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সাপোর্টিং বা এজেন্ট ঠিকাদার নিয়োগ, বারবার নির্মাণকাজের ডিজাইন পরিবর্তন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ বুঝে না নেওয়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেরামত বা সংস্কার কাজের নামে ভুয়া বিল ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা-প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বেনামে বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ এবং ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর অনৈতিক সুবিধালাভ।

যথাযথ প্রক্রিয়ায় টেন্ডার সম্পন্ন না করা : গণপূর্ত অধিদপ্তরের বৃহৎ পরিসরের কাজ ছাড়াও মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। এ বরাদ্দের বিপরীতে কাজগুলো ছোট ছোট লটে ভাগ করা হয়। এসব কাজ পছন্দের ঠিকাদারদের দেওয়ার জন্য ই-জিপিতে না গিয়ে গোপন টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হয়। পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তার আত্মীয়স্বজন বা তাদের নামে-বেনামেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

অপছন্দের ঠিকাদারকে নন-রেসপনসিভ করা : অনেক ক্ষেত্রে সামান্য কারণে অপছন্দের ঠিকাদারকে নন-রেসপনসিভ করা হয় এবং কৌশলগত হিসেবের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে রেসপনসিভ করা হয়। যেমন- বর্তমানে ই-জিপির মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান করা হলেও টেন্ডার দাখিলের আগেই গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে রেট জানিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া পছন্দের ঠিকাদারের যেসব অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেসব অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে অন্য কোনো ঠিকাদার টেন্ডারে অংশ নিতে না পারেন।

অস্বাভাবিক মূল্যে প্রাক্কলন : সরকারি বাজেটের একটি অংশ ঠিকাদারের যোগসাজশে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে শিডিউল রেটের বাইরে গিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রাক্কলন তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ছোট ছোট প্যাকেজ : বড় বড় প্রকল্প বিশেষ করে ৩০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। অনেক সময় অসৎ উদ্দেশ্যে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের দায় এড়ানোর জন্য ছোট ছোট প্যাকেজ করে প্রাক্কলন প্রণয়ন, অনুমোদন ও ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। যেমন- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ডেলিগেটেড ওয়ার্ক হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্মাণাধীন ৬টি ভবনে আসবাবপত্রসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের জন্য দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রণয়ন করে ৬টি প্যাকেজে ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়।

টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ না করা : বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধিকাংশ ক্ষেত্রে ই-জিপি টেন্ডারিং প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেও টেন্ডারের শর্তানুসারে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন না করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ঠিকাদারের চাপে বা একশ্রেণির প্রকৌশলী বা কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়ে থাকে। ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। কাজ পাওয়ার জন্য অনেক সময় বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরামর্শক সংস্থা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উৎকোচ দিতে হয়।

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী : গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প বা নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যে রেশিও অনুযায়ী সিমেন্ট বালি মেশানোর কথা, তা না করে বালির পরিমাণ বেশি মেশানো হয়। এ ছাড়া যে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী রড নেওয়ার কথা, তা না করে তা থেকে কম মেজারের রড এবং যে ঘনত্বের রড দেওয়ার কথা, তা না করে রডের পরিমাণ কম দেওয়া হয়।

প্রকল্প প্রণয়ন, তদারকি, বাস্তবায়ন কাজে ধীরগতি : সরকারের ভবন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মকা-ের পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্মাণকাজের ব্যাপকতা ও কলেবর বৃদ্ধির তুলনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের জনবলের আকার আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে প্রকল্প প্রণয়ন, তদারকি, বাস্তবায়নে ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে।

বরাদ্দ কম : গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত ভবনের মেরামত, সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য যে পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন, তার এক-তৃতীয়াংশ পাওয়া যায় না। যথাসময়ে বরাদ্দ ছাড়ের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বিঘিœত হয়। এতে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চাহিদামাফিক করা সম্ভব হয় না।

অনাবশ্যক ব্যয় বৃদ্ধি : প্রকল্প ছক সংশোধন করে অনাবশ্যক প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়। মূূলত আর্থিক মুনাফার জন্য প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদার ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়।

স্থাপত্য ও কাঠামোগত নকশা চূড়ান্তকরণে বিলম্ব : পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রায়ই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নকশা সরবরাহ করতে সক্ষম হয় না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটে।

জরুরি ভিত্তিতে কার্য সম্পাদন না করা : গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অবহেলা, সদিচ্ছা ও মনিটরিংয়ের অভাবে প্রাক্কলন তৈরি থেকে শুরু করে টেন্ডার আহ্বান, কার্যাদেশ প্রদান এবং সংস্থার চাহিদামতো কাজ শেষ করা হয় না। এ ছাড়া বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসহযোগিতা; সময়মতো ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ না করা এবং ঠিকাদারদের আংশিক বিল পরিশোধ করা হচ্ছে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে সুপারিশ : প্রতিবেদনে দুর্নীতি প্রতিরোধসংক্রান্ত সুপারিশে বলা হয় :

(১) গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়া সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। ই-জিপি প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো দুর্নীতি বা জালিয়াতি না হয়, সে জন্য ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধানের দপ্তরে প্রকিউরমেন্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ও উচ্চ ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীদের নিয়ে কাউন্টার টেকনিক্যাল ইউনিট গঠন করা যেতে পারে।

(২) প্রকল্প নির্বাচন করার সময় ওই প্রকল্পের যথার্থতা বা উপযোগিতা আছে কিনা- তা গণপূর্ত অধিদপ্তরের চাহিদা প্রদানকারী সংস্থাকে নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবাধানে যাতে অহেতুক অযৌক্তিক সময় বাড়ানো না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। কোনো ঠিকাদার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে জরিমানা আরোপ করা।

(৩) প্রাক্কলন প্রস্তুত এবং দরপত্রের আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়নের সময় স্থানীয় দরপত্রের ক্ষেত্রে প্রত্যাশী সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

(৪) নথি নিষ্পন্নের ক্ষেত্রে ই-ফাইলিংয়ের সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রাক্কলন তৈরির ক্ষেত্রে এস্টিমেটিং সফটওয়্যার ও হিসাবরক্ষণের জন্য অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যারের প্রবর্তন করা দরকার। ঠিকাদারের বিল চেকের পরিবর্তে সরাসরি ঠিকাদারের অ্যাকাউন্টে অনলাইন ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

(৫) নির্মাণ রক্ষণাবেক্ষণ কাজ বাস্তবায়নপরবর্তী একটি যৌক্তিক সময় পর্যন্ত কাজের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিজ খরচে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পণ করা যেতে পারে। কাজের গুণগতমান নিবিড় তদারকির জন্য দুই স্তরবিশিষ্ট মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

(৬) গণপূর্ত অধিদপ্তরের ট্রেনিং একাডেমি ও টেস্টিং ল্যাবরেটরিকে আধুনিক করে গড়ে তোলা দরকার। তা ছাড়া প্রতি জেলায় নির্মাণ মালামালের গুণাগুণ পরীক্ষার জন্য ছোট আকারে টেস্টিং ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

(৭) নগর উন্নয়নসংক্রান্ত অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন। প্রকৌশলীদের নিয়মিত সুপারভিশনের মাধ্যমে কাজের মান নিশ্চিত করতে হবে।

(৮) গণপূর্তের যেসব কর্মকর্তা নামে-বেনামে ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের তালিকা তৈরি করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

(৯) পরামর্শক সংস্থার প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণ ও পূর্ব-যোগ্যতা মূল্যায়ন করে ঠিকাদারদের নিবন্ধন ও সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন এবং তা ওয়েবসাইটসহ সর্বমহলে প্রচারের ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। প্রকল্পের ক্রয়, নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কার কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে গণশুনানি ও সামাজিক নিরীক্ষার আয়োজন করা যেতে পারে।

(১০) নির্মাণকাজে গাফিলতি বা এজেন্ট বা ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটালে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

(১১) নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা এবং যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি না করার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত