প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর
নগদ ১ কোটি ৮০লাখ টাকা, অস্ত্র ও ৭ দেহরক্ষীসহ আটক যুবলীগ নেতা শামীম

মাসুদ আলম ও সুজন কৈরী : রাজধানীর নিকেতনে যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের অফিসে শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব। নিকেতনের এ ব্লকের ৫ নম্বর রোডের ১৪৪ নম্বর বাসা ঘিরে এ অভিযান চলে। চারতলা ওই বাসায় জি কে বি কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড নামক শামীমের প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়। এ সময় শামীমের কার্যালয় থেকে নগদ প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা,  ও মদের কয়েকটি বোতল জব্দ, ১৬৫ কোটি‌ টাকার এফডিআরের কাগজ। এরমধ্যে তার মায়ের নামে রয়েছে ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। বাকিটা শামীমের নামে করা। আটক করা হয়েছে শামীমসহ ৮জনকে।

নিকেতনের বাসাটিতে প্রবেশের প্রথমেই বিশাল গ্যারেজের দেখা মিলে। পাশে কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বসার জন্য কাঁচ দিয়ে ঘেরা একটি অফিস কক্ষ। তার পাশে দুই পাল্লার একটি কাঠের দরজা। দরজা দিয়ে ঢুকতেই ভেতরে তিন তলায় যাওয়ার মার্বেল টাইলসের সিঁড়ি। চারতলা পর্যন্ত উঠলেও তিন তলায় শামীমের বসার কক্ষ। পুরো বাসাটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। শামীমের পুরো কক্ষটিতে রয়েছে দামি বাতি। বিশাল ঝাড়বাতি। পুরো ঘরটি কাঠ দিয়ে সাজানো। বিশাল আকারের দুটি টিভি রয়েছে ঘরে। তিন সেট সোফা ও একটি বড় টেবিল রয়েছে। র‌্যাবের কর্মকর্তারা ওই টেবিলের ওপরই সাজিয়ে রেখেছিলেন কার্যালয় থেকে উদ্ধার হওয়া টাকার বান্ডিল, মদের বেশ কয়েকটি বোতল ও অস্ত্র।

এর আগে শামীমের কার্যালয় থেকে ৭ দেহরক্ষীকে আটক করে র‌্যাব।

জানা গেছে, মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদকে গ্রেপ্তারের পর জি কে শামীমের নাম উঠে আসে। তিনি অস্ত্রধারী দেহরক্ষীদের বেষ্টনীতে সবসময় চলাফেরা করতেন। ছোটখাটো মানুষ হলেও শামীমের ক্ষমতার দাপট ছিল আকাশসমান। রাজধানীর সবুজবাগ, বাসাবো, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় শামীম প্রভাবশালী ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত। গণপূর্ত ভবনের বেশির ভাগ ঠিকাদারি কাজই শামীম নিয়ন্ত্রণ করেন। বিএনপি-জামায়াত শাসনামলেও গণপূর্তে এই শামীম ছিলেন ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি। এক সময়ের যুবদল নেতা ক্ষমতার পরিবর্তনে হয়ে যান যুবলীগ নেতা। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতিও তিনি। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের সন্মানদী ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামের মৃত মো. আফসার উদ্দিন মাস্টারের ছেলে শামীম। আফসার মাস্টার ছিলেন হরিহরদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিন ছেলের মধ্যে শামীম মেজো। বড় ছেলে গোলাম হাবিব নাসিম ঢাকায় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সন্মানদী ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, প্রাইমারি স্কুল ও হাই স্কুল পাস করার পর তাদের গ্রামে দেখা যায়নি। ঢাকার বাসাবো আর সবুজবাগ এলাকায় বড় হয়েছেন। গত জাতীয় নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচনের জন্য প্রচারণাও চালিয়েছিলেন শামীম।

জি কে শামীম একসময় বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ক্যাডার ছিলেন। বিএনপির আমলে শামীমের ভয়ে মতিঝিল, পল্টন, শান্তিনগরের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পালিয়ে বেড়িয়েছেন। সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজি ছিল তার পেশা। ওই সময় মির্জা আব্বাসের ডানহাত হিসাবে গণপূর্ত ভবনের সকল টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আশার পরও তিনি বহাল তবিয়তে ওই ভবন নিয়ন্ত্রণ করে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে। জীবনের ভয়ে অনেক আওয়ামী লীগের ঠিকাদার ওই ভবন ছেড়ে পালিয়ে যান। বাংলাদেশের সকল ঠিকাদারকে গণপূর্তে কাজ করতে হলে তাকে বলে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রথম সারির সকল ঠিকাদার তার বাইরে ভয়ে কথা বলার সাহস পান না। এক অর্থে বলা যায়, গণপূর্ত ভবনের মালিকই তিনি।

কেন্দ্রীয় যুবলীগের নেতা হয়ে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সারা বাংলাদেশের কনস্ট্রাকশনের যত বড় বড় কাজ হয় সকল কাজ তার নির্বাচিত ঠিকাদরি প্রতিষ্ঠান ছাড়া কেউ করতে পারেন না। যদি কেউ শামীমকে না জানিয়ে দরপত্র ক্রয় করেন তবে তার পরিণাম হতো ভয়ঙ্কর।

জানা যায়, উচ্চতায় পাঁচ ফুটের কিছু বেশি শামীম ছয়জন অস্ত্রধারী দেহরক্ষীর প্রটেকশনে চলতেন। সবার হাতেই থাকতো শটগান। গায়ে বিশেষ সিকিউরিটির পোশাক। তাদের একেকজনের উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট।

বাসাবো ও এজিবি কলোনির কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পর এজিবি কলোনি, হাসপাতাল জোন এবং মধ্য বাসাবোতেই পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন শামীম। ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের মাধ্যমেই তার রাজনীতি শুরু। পরের মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা কালু ও মির্জা খোকনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় এবং তাদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে গণপূর্ত ভবনের ঠিকাদারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন। ঢাকা মহানগর যুবদলের সহসম্পাদকের পদও বাগিয়ে নেন। বিএনপি আমলে গণপূর্ত ভবন ছিল তার দখলে। একসময় মির্জা আব্বাস আর খালেদা জিয়া, তারেক রহমানের ছবিসহ সবুজবাগ-বাসাবো এলাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শোভা পেত শামীমের ব্যানার-পোস্টার। এখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শোভা পায় যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের ছবিসহ পোস্টার-ব্যানার।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কিংবা যুবলীগের পার্টি অফিস, বিয়ে বাড়ি কিংবা বন্ধুর বাড়ি, যেখানেই তিনি যান, সঙ্গে থাকে অস্ত্রধারী প্রটোকল বাহিনী। ভারী অস্ত্র নিয়ে ছয়জন নিরাপত্তারক্ষী আগে-পিছে পাহারা দিয়ে তাকে নিয়ে যান।

জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর অবৈধ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন শামীম। বাসাবো এলাকায় পাঁচটি বাড়ি এবং একাধিক প্লট রয়েছে শমীমের। বাসাবোর কদমতলায় ১৭ নম্বরের পাঁচতলা বাড়িটি শামীমের। বাড়িটির ম্যানেজার হিসেবে দেখাশোনা করেন স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. ইসমাইল হোসেন সর্দার। শামীম কয়েক বছর বাসাবোর ওই বাড়িতে বসবাস করলেও এখন থাকছেন ওল্ড ডিওএইচএসে নিজের ফ্ল্যাটে। নিজের কার্যালয় বানিয়ে বসেন নিকেতন এলাকায় একটি ভবনে।

বাসাবোতে আরো রয়েছে তিনটি ভবন এবং ডেমরা ও দক্ষিণগাঁও ছাড়াও সোনারগাঁ উপজেলা, বান্দরবান ও গাজীপুরে কয়েকশ’ বিঘা জমি কিনেছেন তিনি।

তবে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলু জানান, জি কে শামীম যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো পদে নেই। অনুমোদিত কমিটির কোথাও তার নাম নেই। কেউ যদি মুখে মুখে নিজেকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা বলে থাকেন সেটা তো হবে না। তিনি আরো বলেন, শামীম যুবলীগের সমবায় সম্পাদক পদটি বিক্রি করে চলেন। আসলে তিনি যুবলীগের কেউ না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় যুবলীগের এক নেতা বলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদে আছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ