প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দিনে দিনে জমেছে ঋণ, শোধ হবে কবে?

শাহীন কামাল : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৪ জন ছাত্রের ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া ভর্তির বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে খোদ ভিসির বিরুদ্ধে। ডাকসু নির্বাচন পূর্ব সময়ে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষার্থীদের এই ভর্তি যে নির্বাচন কেন্দ্রিক তার প্রমাণ মিলে ডাকসুতে সেই ৩৪ জনের মধ্যে ৮ জন নির্বাচিত হওয়ায়। তেলবাজ আর লেজুড়ভিত্তিক প্রশাসনিক চিত্র পিওন থেকে ভিসি পর্যন্ত সর্বত্র বিরাজমান। তেলবাজদের জয়জয়কার সর্বক্ষেত্রে। সম্মানিত ভিসি মহোদয়গন স্বীয় দায়িত্ব পালনে যতটা আন্তরিক, ততোধিক আন্তরিক তৈলমর্দনে। এ চিত্র রাজনৈতিক ময়দানে আরো প্রকট। তাইতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীরা জনসাধারনের কাছে যেতে যতটা প্রয়োজন মনে করেন তার থেকে বহুগুণ বেশি তৈলমর্দন করেন দলীয় নেতাদের। নেতার আশির্বাদ আর অনুকম্পা লাখো ভোটারের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আর ফলদায়ক। এতে গনতন্ত্রের মূল ভিত্তি জনসাধারনের প্রয়োজনীয় আর গুরুত্ব শুন্যের কোঠায় পৌঁছে যাচ্ছে দিনে দিনে। রাজনীতিতে জনগণ আজ রোবটের মতো অন্যের ইচ্ছা অনিচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটাচ্ছেন। এতে গনতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথরোধ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

জনগনবিমূখ রাজনৈতিক এহেন কালচার সম্মুখ দিনগুলোতে সত্যিকারের নেতৃত্ব বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দিবে আর তথাকথিত নেতাদের করে তুলবে সকল জবাবদিহিতা উর্ধ্বে। তৃণমূল থেকে পোড়খাওয়া সত্যিকারের জনগণের ভালবাসায় নেতা হওয়ার যে ইতিহাস ছিল কালে কালে তা আজ সুদূর অতীত। জনগনকে ভালবেসে তাদের মধ্য থেকে নেতা তৈরির মাধ্যমে মানুষের সুখদুখের ভাগিদারী হয়েছে এমন মানবিক নেতা বর্তমানে আছে কয়জন! অথচ অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা মাটির গন্ধ বুকে নিয়ে মাটির মানুষগুলোকে ভালবেসে নেতা হয়ে আজও অমর হয়ে আছেন কেউ কেউ। আজ টাকা আর বাহুবলে রাতের অন্ধকারে নেতা বনে গিয়ে নিজে নেতৃত্বের সনদ বিক্রি করছেন উচ্চ মূল্যে। তাইতো কমিটির পদ বিক্রি হচ্ছে কমিশনে। অনবিজ্ঞ, অসাড় আর অযোগ্য চাটুকারের হাতে বন্ধি হচ্ছে জনগণের আশা আকাংখা। স্থানীয় সরকারের পদ বিক্রি হচ্ছে উচ্চমূল্যে আর জনগন দর্শকের ভুমিকা পালন করছে।

শোভন রাব্বানী একদিনে তৈরী হয়নি। এটা আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত কালচার। এ দু’জনকে যেভাবে জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। অনেকের জন্য রীতিমতো হলুদ কার্ড। কিন্তু এরাই কী প্রথম? বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে চাঁদা বিষয়ে দফারফার দায় ভিসি এড়াবেন কোন মাধ্যমে? তিনি অথবা তারা নিজেদের স্বার্থে নিয়মিত ছাত্রনেতাদের তোয়াজ করছেন। বৈধ অবৈধ সুবিধা দিচ্ছেন। এই ঘটনা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়। কলেজগুলোতে উন্নয়ন কর্মকান্ড আর ভর্তি বানিজ্যে অধ্যক্ষগন নিত্য আপোষ করেন অথবা করতে হচ্ছে এদের সাথে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রনেতা বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে প্রবেশ করে বাবার টাকায় খেয়ে পড়ে কী এমন আলাদিনের চেরাগ পেয়ে গাড়ি, বাড়ি নিয়ে বের হন। কোন উৎসের বলে শিল্পপতি বনে যান!

গত বেশ কয়েক বছর দেশে ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে আসছেন। তারা এটা উপলব্ধি করেছেন যে, রাজনীতির বাইরে বড় কোন বানিজ্য নেই। এতে রাজনীতি তার আপন মৌলিকত্ব আর গৌরব হারাচ্ছে। রাজনীতিবিদদের বিষয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও দিন শেষে দেশটি তারাই চালাবেন। একজন সত্যিকারের রাজনীতিবিদ যে ত্যাগ স্বীকার করবেন, ব্যবসায়ীর কাছে তা কখনও আশা করা যায়না। দেশের যেকোন প্রয়োজনে যোগ্য রাজনীতিবিদগন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সমস্যা সমাধানে নিরপেক্ষভাবে ভুমিকা রাখতে পারেন।

রাজনীতি যতদিন টাকা বানানোর মাধ্যম থাকবে, ততোদিন রাজনৈতিক দুরাচার বন্ধ হবে না। শোভন রাব্বানী হয়ত থাকবে না, অন্য কেউ ভিন্ন নামে একই রুপে ফিরে আসবে। জনগণের মধ্য থেকে নেতা তৈরি না হলে সত্যিকারের গনতন্ত্রের ভীত কোনদিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না। পর্দা, বালিশ, মাটি খনন, টিন কিংবা এধরনের নানাবিধ অপরাধ সত্যিকারের নেতৃত্বের অভাবের প্রচ্ছন্ন প্রতিফলন। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দরকার জনগণের মতের প্রতিফলন। আর সেটা করতে ব্যার্থ হলে পিওন থেকে ভিসি পর্যন্ত কেউই দূর্নীতির উর্ধ্বে উঠতে পারবে না। তৈলবাজদের দৌরাত্ম্য রোধ হবে না। রাজনীতিতে জবাবদিহি আসলে সত্যিকারের নেতৃত্বের বিকাশ হবে আর তাতে অন্য সকল সেক্টরে দুর্নীতি ও অপরাধ বন্ধ হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে মেসেজ দিয়েছেন, তার মাধ্যমে অন্যরা বার্তা পেয়ে স্বীয় ক্ষেত্রে সজাগ হবেন। সহনীয় দুর্নীতি আর কোটি টাকা কিছুই না, মনোভাব পোষণ করলে এই ক্ষত আরো ক্ষতি করবে, সেটা মেনে নেয়ার বেশ সময় হয়েছে।

লেখকঃ শিক্ষক, সাংবাদিক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ