প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দু’ভাগে বিভক্ত সরাইল জাতীয় পার্টি

আরিফুল ইসলাম সুমন : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা জাতীয়পার্টির নেতা-কর্মীরা এখন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার উপজেলা জাতীয় পার্টির কমিটি গঠন নিয়ে এখানে দলটির নেতা-কর্মীদের মাঝে বিভক্তির বিষয়টি চরম আকার ধারণ করেছে। দলটির এক গ্রুপের গঠন করা কমিটিকে পকেট কমিটি হিসেবে আখ্যায়িত করে গত ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মো. রহমত হোসেনের নেতৃত্বে এক সংবাদ সম্মেলন করেন অপর গ্রুপের প্রথমসারির নেতারা।

সংবাদ সম্মেলন ও দলটির তৃণমূল নেতা-কর্মী সূত্রে জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে মহাজোটের ব্যানারে ‘লাঙ্গল’ প্রতিকে টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন জাপা’র কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তে এই আসনের মহাজোটের মনোনয়ন পান জিয়াউল হকের বড় মেয়ের জামাই জাপা’র কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূইঁয়া। তবে বিষয়টি ভালো চোখে দেখেননি জিয়াউল হক। তিনি জামাইকে ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন।

এতে জামাই ও শ্বশুরের মধ্যে দুরত্ব বেড়ে যায়। এখানকার জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরাও দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে তারা শ্বশুর ও জামাই’র পক্ষে-বিপক্ষে প্রচারণায় নামেন। শ্বশুর সিংহ মার্কা এবং জামাই লাঙ্গল মার্কা। আবার দু’জনেরই নির্বাচনী পোস্টারে লেখা মহাজোটের মনোনীত প্রার্থী। দুই পোস্টারেই জাপা’র দলীয় প্রধান এরশাদের ছবির পাশাপাশি মহাজোট নেতা শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার করে তাঁরা।

প্রচারণায় শ্বশুরের সমর্থকেরা দাবি করেন মহাজোটের মার্কা ‘সিংহ’ অপরদিকে জামাই’র সমর্থকরা দাবি করেন মহাজোটের মার্কা ‘লাঙ্গল’। এ অবস্থায় বিশেষ করে বিপাকে পড়ে যান এই আসনের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এই বিষয়ে দলীয় কেন্দ্রীয় কমিটির আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা না থাকায় এখানকার আওয়ামী লীগের অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মী সেই নির্বাচনে নীরব থাকেন। ফলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আসনটি কেড়ে নেন বিএনপির প্রার্থী উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া। যদিও নির্বাচনের তিন দিন আগে জামাই রেজাউল ইসলাম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে শ্বশরকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু এটিও এখানকার অনেক ভোটার ইতিবাচক হিসেবে দেখেননি।

এদিকে সেই নির্বাচনের শেষপ্রান্তে শ্বশুরকে জামাই ছাড় দিলেও সরাইল উপজেলা জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে শ্বশুরকে এককভাবে রাজত্ব কায়েম করার সুযোগ জামাই দিতে একেবারেই নারাজ। গত ১৪ সেপ্টেম্বর শ্বশুর জিয়াউল হক তার অনুসারী নেতাদের নিয়ে সরাইল উপজেলা জাতীয় পার্টির কমিটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর এই ঘোষিত কমিটিকে জিয়াউল হকের পকেট কমিটি আখ্যায়িত করে তাঁর জামাই’র অনুসারী নেতারা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়ে কট্টর ভাষায় এর জবাব দেন।

জামাই রেজাউল ইসলাম ভূইঁয়ার অনুসারী নেতা-কর্মীরা সাংবাদিকদের জানান, জিয়াউলের ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে সরাইল জাতীয়পার্টিকে।
জিয়াউল হক মৃধার ডাকে সাড়া দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হওয়া নিজ দলের অনেক নেতার শ্যাম-কূল উভয় রক্ষা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিয়াউলের কুপরামর্শে জাতীয়পার্টি এখানকার রাজনীতির মাঠে হাস্যকর হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন দলটির একাধিক ক্ষুব্ধ নেতা। জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এখানে বিভক্তি সৃষ্টি করে দলটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েই জিয়াউল হক মৃধা ক্ষান্ত হবেন বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম আহবায়ক মো. রহমত হোসেন বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিয়াউল হক মৃধা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘সিংহ’ মার্কা নিয়ে নির্বাচনী মাঠে ভাঁওতাবাজি চালিয়ে এখান থেকে ‘লাঙ্গল’ মার্কাকে সরিয়ে ফেলে এই আসনটি মহাজোটের হাত ছাড়া করিয়েছেন। এখানে ‘লাঙ্গল’ মার্কা নিয়ে এসেছিলেন তাঁরই মেয়ের জামাই। জিয়াউল হক নির্বাচনী মাঠে প্রচার করলেন এরশাদের মার্কা সিংহ, শেখ হাসিনার মার্কা সিংহ। তাঁর এই অপপ্রচার ও ভণ্ডামির কারণে এখানে জাতীয়পার্টি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন তিনি আবার নতুনভাবে ভাঁওতাবাজি চালিয়ে একটি গোঁজামিল দিয়ে মনগড়া পকেট কমিটি করেছে। তাঁর এই ভাঁওতাবাজি কেউ মেনে নিবে না। এসব অবৈধ পন্থা পরিহার করে দলীয় সাংগঠনিক নিয়মনীতির সোজা পথে তিনি আসলে, আমরা সবাই দলের শৃঙ্খল সিদ্ধান্ত মেনে নিব।

সরাইল উপজেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম আহবায়ক মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম মাস্টার বলেন, জিয়াউল হক মৃধা জাতীয় পার্টির এমপি ছিলেন ১০ বছর। এই সময়ের মধ্যে তিনি একটি জাতীয় পার্টির সভা করতে পারেননি। সরাইলে জাতীয় পার্টির একটি কার্যালয় নেই। তাঁর আমলে জাতীয় পার্টি ছিল তাঁর পারিবারিক পার্টি। আমরা এসবের তীব্র নিন্দা জানাই। তাঁর পারিবারিক অফিসে বসে দলের কমিটি তিনি মনগড়াভাবে করতে পারেন না। আমরা তাঁর পকেট কমিটি মেনে নিব না।

সরাইল উপজেলা ছাত্র সমাজের সাবেক সভাপতি মো. আলমগীর মিয়া উজ্জ্বল বলেন, বিগত জাতীয় নির্বাচনে দলকে ভালোবেসে যারা ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের পক্ষে নির্বাচন করেছেন তাদেরকে বাদ দিয়ে জিয়াউল হক মৃধা ‘সিংহ’ প্রতীকে যারা নির্বাচন করেছেন তাদেরকে নিয়ে কমিটি গঠন করেছেন। আমরা জিয়াউল হকের এই ষড়যন্ত্র মেনে নিব না। আমরা এই পকেট কমিটি মানি না।

এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, জাতীয় তরুণ পার্টির সাবেক সভাপতি এ কে এম কাজল ও যুবসংহতীর নেতা মো. রফিকুল ইসলাম সহ দলটির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ