প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কইয়ের তেলে কই ভাজার আয়োজন বঙ্গবন্ধু সেতুতে

নিউজ ডেস্ক : যমুনা নদীর ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতুতে যানবাহন পারাপারের টোল আদায় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দূর হচ্ছে না। প্রতিমাসে ২৭ লাখ টাকার বিনিময়ে টোল আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছিল জিএসআইসি-সেল-ইউডিসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০১৬ সালের মে মাস থেকে ‘জরুরি কারণে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বিনাদরপত্রে একই পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে টোল আদায়ের দায়িত্ব পায় সিএনএস, প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের জন্য। পরে কয়েক দফায় মেয়াদ বেড়ে ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই পর্যন্ত টোল আদায়ের দায়িত্ব পালন করে সিএনএস। আমাদের সময়

এর পর আইনি প্যাঁচে দরপত্র প্রক্রিয়া ঝুলে যাওয়ায় সেতু কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় নিজেরাই টোল আদায়ের। আগে যে প্রতিষ্ঠানকে মাসে ২৭ লাখ টাকা প্রদানের বিনিময়ে টোল আদায়ের পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রতিষ্ঠানই এখন স্রেফ সেতুটি পারাপার হওয়া গাড়ির ডেটা সংরক্ষণের বিপরীতে মাসে নেবে ৪২ লাখ টাকা।

যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিআরটিএর সার্ভার থেকেই মূলত প্রাথমিক সব ডেটা সংগ্রহ করবে প্রতিষ্ঠানটি। উপরন্তু টোল আদায়ের দায়িত্ব এবং এ জন্য জনবল বাবদ যে বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয়, সেটি থেকে যাবে সেতু কর্তৃপক্ষের ঘাড়েই। এমন সব শর্তেই সিএনএসের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি করতে যাচ্ছে সেতু কর্তৃপক্ষ।

বিআরটিএ থেকে গাড়ির বিবরণ সংগ্রহ করে সেই তথ্যের ভিত্তিতেই সেতু কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সিএনএসের প্রতিমাসে মোটা অঙ্কের এই অর্থ আদায়ের বিষয়টিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কইয়ের তেলে কই ভাজা। বিআরটিএর তথ্যপ্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলে এ অর্থ যেত সরকারি কোষাগারে।

নিজেরাই টোল আদায় করছেন জানিয়ে সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদৌস এ-ও বলেন, এ ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশ বাবদ প্রতিমাসে একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়ার অর্থও দিতে হচ্ছে। সিএনএসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব) তারিকুল হকও জানিয়েছেন, টোল আদায় নয়, টোল আদায়ে শুধু লজিস্টিক সাপোর্ট দিচ্ছে সিএনএস। অন্য সব কিছু সেতু কর্তৃপক্ষই করছে।

জানা গেছে, বর্তমানে সিএনএসের সঙ্গে সেতু কর্তৃপক্ষের যে চুক্তি রয়েছে, সেই মোতাবেক মাসে ৩২ লাখ টাকার বিনিময়ে সফটওয়্যার সুবিধা দিচ্ছে সিএনএস। সর্বশেষ, প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্যÑ এ সংক্রান্ত কর্মকা-ে ব্যবহৃত হার্ডওয়্যারেরও ভাড়া লাগবে, যা চুক্তিতে উল্লেখ নেই। শেষ পর্যন্ত দরকষাকষি করে হার্ডওয়ার বাবদ প্রতিমাসে ১০ লাখ টাকা ভাড়া প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ নতুন চুক্তিতে সফটওয়্যারের ৩২ লাখ টাকার সঙ্গে যুক্ত হবে হার্ডওয়্যারের ১০ লাখ টাকা। জানা গেছে, এ চুক্তির মেয়াদকাল ধরা হবে গত ১৫ জুলাই থেকে আগামী বছরের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত।

এদিকে টোল আদায়ে অপারেটিং প্রতিষ্ঠান নিয়োগ-সংক্রান্ত দরপত্র প্রক্রিয়া ঝুলে আছে আদালতে, বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের করা মামলার কারণে। জানা গেছে, আগে সেতু কর্তৃপক্ষ টোল আদায় করত গাড়ির ব্লু বুকে যুক্ত তথের ওপর ভিত্তি করে। ইতোমধ্যেই যানবাহনের প্রকৃত তথ্যের জোগান দিয়ে যাচ্ছে বিআরটিএর সার্ভার। ফলে গাড়ির প্রকৃত এক্সেল ও আকার অনুযায়ী টোল আদায় করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ফাঁকি কমে আসায় বেড়েছে টোল আদায়ের পরিমাণ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, টানা ৫ বছর বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায় করেছে জিএসআইসি-সেল-ইউডিসি। এর পরই শুরু হয় নানা নাটকীয় ঘটনা। দুই দফায় দরপত্র বাতিল; পছন্দের অপারেটর নিয়োগে দরপত্রে মনগড়া শর্ত আরোপের অভিযোগÑ এমন সব কা-ের পর বিনাদরপত্রে অন্তর্বর্তীকালীন হিসেবে প্রাথমিকভাবে ৬ মাসের জন্য বিনাদরপত্রে কাজ পেয়েছিল সিএনএস। বিনাদরপত্রের বিপরীতে বৈধতা পেতে ওই বছরের ২৬ এপ্রিল সরকারি অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয়; ‘জরুরি’ বিবেচনায় অনুমোদনও মেলে।

জিএসআইসি-সেল-ইউডিসির পর ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হয় সিএনএসের সঙ্গে। অপারেটরের খরচ নির্ধারণ নিয়েও সে সময় চলে নানা কা-। এর আগে সেতুর টোল আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেত মাসে ২৭ লাখ টাকা। একই সেবা দিয়ে সিএনএস ২৭ লাখ টাকার পাশাপাশি আদায়কৃত টোলের সাড়ে ১২ শতাংশও দাবি করে। পরে অবশ্য সেতু কর্তৃপক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে সে দাবি থেকে পিছু হটে সিএনএস।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে নিজস্ব সফটওয়্যার দিয়ে টোল আদায় করত সেতু কর্তৃপক্ষ। এভাবেই চলছিল। ২০১৮ সালের ১২ মার্চ পরীক্ষামূলকভাবে এক মাসের জন্য সফটওয়্যার বসানোর অনুমতি পায় সিএনএস। এর পর এক সপ্তাহ সময় বৃদ্ধি করা হয়, যা পরে সংশোধনপূর্বক করা হয় এক মাস। এ সেবা নিতে সফটওয়ার ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মোট আদায়কৃত টোলের শতাংশ হিসেবে অর্থ দাবি করলেও তা নাকচ হয়ে যায়। ফলে পূর্বনির্ধারিত অর্থেই কাজ চালিয়ে যেতে থাকে সিএনএস।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সেতু কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সফটওয়্যারের মাধ্যমে টোল আদায় চলছিল বড় কোনো সমস্যা ছাড়াই। ইন্টারন্যাশনাল রোড ডায়নামিকের (আইআরডি) কানাডা স্ট্যান্ডার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে টোল আদায় করছিল কর্তৃপক্ষ। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএনএসের পক্ষ থেকে তাদের সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রস্তাব আসে। সিএনএসের প্রস্তাবে পরীক্ষামূলকভাবে তাদের সফটওয়্যার বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এতে টোল আদায়ের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে যায়। এর মূল কারণ, বিআরটিএর সার্ভারের সঙ্গে সিএনএসের সফটওয়্যারের সংযুক্তি থাকায় যানবাহনের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায়।

বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায়, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে বিভিন্ন সময় যন্ত্রপাতি ক্রয় করে সেতু কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে সাধারণ কিছু যন্ত্রপাতি ছাড়া টোল আদায়ের কাজে বড় অর্থ ব্যয় করতে হয় না।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ