প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রত্নাগর্ভা কথা সাহিত্যিক দীলতাজ রহমান

তোফাজ্জল লিটন :কবি নাসির আহমেদকে অনেক দিন বলতে শুনেছি, ‘অনেক এমএ পাশ মূর্খ দেখেছি; দীলতাজের মতো স্বশিক্ষিত একজনও দেখিনি…’

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কথা সাহিত্যিক দীলতাজ রহমানের জন্মদিন ১৭ সেপ্টেম্বর । তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে এই লেখা।

নিজভূম বাংলাদেশ ছেড়ে পৃথিবীর আরেকটি প্রান্ত আমেরিকা এসেও দীলতাজ আপা সম্পর্কে প্রায় একযুগ পরেও উপরোক্ত কথাটির যথার্থতা আমার কাছে এতটুকু ম্লান হয়নি ! আর আমার ক্ষেত্রে এ কথাটিও সত্যি, আমি তাঁর সন্তানতুল্য হয়েও, তাঁর চারপাশের অনেকের থেকে আমিই বোধহয় তাঁকে দেখার ও জানার সুযোগটি বেশি পেয়েছি। তিনিও তাঁর লেখাতে তাই বলেছেন, যে লিটনের সাথেই আমি রাজশাহী, চাপাই, জলছত্র ঘুরে বেড়িয়েছি, ও ছাড়া আমার এই ভ্রমণ সম্ভব হত না।’ এ ছাড়াও আছে আমাদের অনেক চলাচলের আরো স্মৃতি। দিনের পর দিন আমরা আলোচনা করিনি এমন কোনো বিষয় নেই! তাই আমার কাছে, দীলতাজ আপা আজো আমার একজনই! এখানে এখনো কতজনের কাছে তাঁর গল্প আমার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

কথা সাহিত্যিক দীলতাজ রহমানের লেখার সূচনা কবিতা দিয়ে হলেও অনেকের মতো আমারও দৃঢ় বিশ্বাস তাঁর লেখা ছোটগল্প দীর্ঘদিন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে পাঠকমনে। দীলতাজ রহমান মুখোমুখি গল্প করতেও যাপিত জীবনের কথাগুলোই গল্পের মতো বলে যান, প্রচণ্ড জীবনময় করে। তখন প্রতিদিনই মনে হত, এই নিয়ে কথা বোধহয় এখানেই শেষ! কিন্তু দীলতাজ আপা সাধারণ একটি বিষয়কে কী অসাধারণ করে তাঁর লেখার মতো বলতেও যে পারেন, আমি তার একজন ক্ষুদ্র সাক্ষী!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মেসবাহ কামাল ‘আদিবাসী সম্মেলন’ আয়োজন করেছিলেন। বিয়াম মিলনায়তনে, সেই অনুষ্ঠানে দর্শক সারিতে দীলতাজ রহমানের পাশের আসনে বসার সূত্রে পরিচয় ২০০৭ সালে । আমরা ক’জন গল্প করছিলাম। সে সব শুনে দীলতাজ আপা নিজে আগ্রহী হয়ে জানতে চাইলেন, ‘আগামীকাল তুমি টাঙ্গাইলের জলছত্র যাবে, তো আমাকেও নিয়ে যেও। আমিও সাঁওতালদের জীবন যাপন দেখার জন্য যাবো।’

আমার যাওয়ার দরকার ছিল সাঁওতালদের নিয়ে একটা মঞ্চ নাটক লেখার জন্য। পরদিন দীলতাজ আপার ব্যক্তিগত সহকারি, গাড়ি এবং চালক নিয়ে চলে গেলাম জলছত্র। যেতে যেতে জানতে শুরু করলাম, আপা এত সরল, এত স্বচ্ছ, যে অবাক হয়ে মুগ্ধ হতে লাগলাম। তাঁর প্রতি সে মুগ্ধতা আমার এতদিনে এতটুকুও ফিকে হয়নি। বরং প্রতি মুহূর্তে তার জন্মগত প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি তা বাড়িয়েই নিয়েছেন। নিচ্ছেন।

তিনদিন ছিলাম আমরা জলছত্র। এই তিনদিনে দেখলাম তাঁর মানুষ ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা। মানুষকে পড়তে পারার এক আশ্চর্য মনন তাঁর। সমানভাবে তাঁর মাঝে বিদ্যমান মানুষের প্রতি কৌতুহল ও মমতা।

সেদিন সেখান থেকে তিনি আগে বিদায় নিয়ে ঢাকা ফেরার সময়, একটি বই দিয়েছিলেন। তখনি নয়, আমি ঢাকা থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গিয়ে দীলতাজ রহমানের সে ছোট গল্পের সংকলনটি পড়া শুরু করলাম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবগুলো গল্প গিলে গিলে খাওয়ার মতো পড়লাম।

গল্পগুলোতে ঘটনা ও পরিবেশের বর্ণনায় এত সামন্জস্য, যে চোখের সামনে সে সব ছবির মতো ভাসতে লাগলো। চলমান ও জীবন্ত মনে হতে লাগলো সব ঘটনা । পরিচিত সব শব্দও তাঁর গল্পে যেনো নতুন হয়ে দেখা দিচ্ছিল আমার কাছে। তাঁর যাপিত জীবন সহজ-সরল আটপৌরে হলেও গল্পগুলোতে কঠিন ঘোরপ্যাঁচ। শঠতা কপটতার আশ্রয় নিয়ে যে কেউ কারো কাছে চিরকালের গ্রহণযোগ্যতা পায় না, প্রতিটি গল্পে সেটাই যেন নীরবে মুখর হয়ে আছে। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, তার সব সৃষ্টিজুড়ে একটা রোমান্টিক আলো ছায়ার মতো খেলে থাকে !

আমি নাটকের মানুষ। দীলতাজ রহমানের ‘জোছনার স্রোতে’ শিরোনামের একটি ছোটগল্পের চিত্রনাট্য করতে গিয়ে দেখলাম, তাঁর গল্পের একেকটি চরিত্র আমার ভেতরেই জীবন্ত হয়ে উঠছে। চাইলেই যেনো তাদের সঙ্গে, তাদের একজন হয়ে সহজে কথা বলা যায় ! তাদের বলা সংলাপগুলোতে নেই কোনো আরোপণ। দীলতাজ রহমানের সে গল্পে আমার সে নাটকটি “জোছনার স্রোত” বিটিভিতে ২০০৮এ প্রচার হয়েছিলো।

দীলতাজ রহমানের জন্ম ১৯৬১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। গোপালগঞ্জ জেলার চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামে। বর্তমানে তিনি লেখালেখি ছাড়াও আন্তর্জাতিক মানের একটি সফট ওয়্যার ফার্মের “বিট মাস্কট”এর চেয়ারম্যান।

আমরা যাদেরকে রত্নগর্ভা পুরস্কার পেতে দেখি, সেই হিসাবে দীলতাজ রহমান তাদের অনেকের অধিক বলে আমি মনে করতে বাধ্য! একসময় তিনি “দৈনিক মাতৃভূমি”র সাহিত্য সম্পাদকও ছিলেন।

দীলতাজ রহমানের লেখা গল্পের বইসমূহ- ধূসর আঁচলে চাবি, বহুকৌণিক আলোর সংঘাতে, বৃত্তভাঙা আয়তন, মেঘের মেয়েরা, ফেরার ঘর নেই, নীলকণ্ঠ নাগ, গহিন দূরত, তারান্নুম, নিঃসঙ্গ সৈকতে সোনার ময়ূরপঙ্খি নাও’ ছাড়াও আছে তার আগের সাতটি বইয়ের একটি একত্রিত সংকলন, যা ‘দীলতাজ রহমানের গল্পসমগ্র ১’ নামে প্রকাশিত।

কবিতার বইসমূহ-

জনকের প্রতিচ্ছবি, আশ্চর্য সর্বনাশ, সবুজের সাথে সখ্য, এ গোলাপ তোমার জন্য, পারিজাত অপরাজিতা, রৌদ্রজলে মরিচিকা ঢেউ, বৃষ্টি এসে, ওই দুটি চোখ আমার সীমা লঙ্ঘনের ঠিকানা, রাতান্ধ বিড়াল, আমি কদমফুলের ঘ্রাণ চাই, এ মাটি শেখ মুজিবের বুক।

শিশুতোষ বইসমূহ-

একটি পাখির ডাকে, সোনার মেয়ে করিমন, ভালো ভূত, মা আমার চোখের আলো, পটলের হারিয়ে যাওয়া।

আমি এই লেখকের প্রজ্ঞাময়, সুস্থ, দীর্ঘ জীবন কামনা করি এবং তার লেখাগুলো প্রকৃত পাঠকের কাছে পৌঁছে যাবে সে আশাও ব্যক্ত করছি!

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ