প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অবহেলা ছিল, সিআইডি ও ফরাসউদ্দিনের কমিটির তদন্তেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে

বিশ্বজিৎ দত্ত : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিষয়ে তদন্ত করছে সিআইডি। তারা এ বিষয়ে এখনো কোন অভিযোগ গঠন করেনি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে এখন পর্যন্ত তারা কোন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পায়নি। তবে ঘটনার দিন ও আগে থেকেই বাংলাদেশে ব্যাংকের বৈদেশিক মূদ্রা বাণিজ্য শাখায় যথেষ্ট গাফিলতি ছিল বলে তারা প্রমাণ পেয়েছে। রিজার্ভ চুরি হয়েছিল ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার রাতে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই চুরির বিষয়ে নিশ্চিত হয় ৬ ফেব্রুয়ারি, শনিবার দুপুরে। অন্যদিকে সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিনকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গতকাল দৈনিক প্রথম আলো ফরাস উদ্দিনের প্রতিবেদনের কিছু অংশ প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়েছে রিজার্ভ চুরির তথ্য ২৪ দিন পর্যন্ত সরকারের কাছে গোপন রেখেছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আতিউর রহমান।

প্রতিবেদনে বলা হয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কাউকে বিষয়টি না জাননো অপরাধ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর আবুল কাসেম তথ্য গোপনের বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, ৪ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার রাতে চুরি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তা ধরা পড়ে ৬ ফেব্রুয়ারি, শনিবার। অর্থ চুরির ঘটনা নিশ্চিত হওয়ার পরে শনিবার দুপুরে তিনি বিষয়টি গভর্নর আতিউর রহমানকে জানান এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে জিডির অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে পাঠানোর জন্য তিনি বলেন।

কিন্তু গভর্নর তাঁকে জানান, জিডি করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা হয়রানির শিকার হবেন এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন। আর অর্থমন্ত্রী কোথায় কী বলে ফেলেন ঠিক নেই। তদন্ত কমিটির কাছে তথ্য গোপন রাখার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন আতিউর রহমান। তিনি বলেছেন, তাঁর বন্ধু ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আমান্দো এম তেরেঙ্গার সঙ্গে তিনি টেলিফোনে কথা বলেছেন।

ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর তাঁকে বলেছেন, জানাজানি হলে অপকর্মকারীরা পালিয়ে যাবে; বরং গোপন থাকলে সম্প‚র্ণ অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে ফরাসউদ্দিন কমিটির মন্তব্য হচ্ছে, একজন বিদেশি কর্তৃপক্ষের পরামর্শ ও অনিশ্চিত আশ্বাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বিষয়টি কোনো আইনানুগ কর্তৃপক্ষকে, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকেও জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি। ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের দ্য ইনকুয়ারার পত্রিকায় বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির সংবাদ প্রকাশিত হলে ১ মার্চ গভর্নর গোয়েন্দা সংস্থাকে জানান। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রীকে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠান এবং ৭ মার্চ অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন।সব শেষে তদন্ত কমিটি বলেছে, ‘স্বাধীনতার ৪৪ বছরে ১২ জন অর্থমন্ত্রী ও ১০ জন গভর্নর কাজ করেছেন। অর্থমন্ত্রী-গভর্নর মতান্তর, এমনকি মনান্তর আগেও ঘটেছে। তবে এবার এটি যেভাবে দ্বন্দ্বে রূপ নিয়ে প্রকাশ্যে এসেছে, তা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত, অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর এবং দেশের সুশাসন ও সুনামের জন্য মারাত্মক নেতিবাচক।’ রিজার্র্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারের ঘটনার প্রায় তিন বছর পর মামলা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরও আদৌ অর্থ উদ্ধার হবে কি না, তা নিয়ে আছে অনিশ্চয়তা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা চলবে কি না, তাও অনিশ্চিত।

ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক থেকে চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বাকি অর্থের অস্তিত্ব এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। ক্যাসিনোর মাধ্যমে এই অর্থ অন্যত্র নেওয়া হয়। ভুয়া নামে হিসাব খোলা এবং অর্থ সরিয়ে ফেলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রিজাল ব্যাংকের কর্মকর্তা মায়া দেগুইতোকে চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি ফিলিপাইনের একটি আদালত দোষী সাব্যস্ত করে ৩২ থেকে ৫৬ বছরের জেল এবং ১০ কোটি ৯০ ডলার অর্থদণ্ড দিয়েছেন। এ ছাড়া দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক চুরি ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য রিজাল ব্যাংককে ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানা করেছে। ঘটনার তিন বছর পরে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে করা মামলায় ফিলিপাইনের পাঁচটি আর্থিক ও ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠান, দেশটির ১২ জন, ৩ জন চীনা নাগরিকসহ মোট ২০ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ