প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আসামের রাষ্ট্রহীন মানুষদের কি হবে?

আবু জাহেদ : কলমের এক খোঁচায় সারা পৃথিবীর মোট রাষ্ট্রহীন মানুষের সঙ্গে সম্ভবত আরও যুক্ত হলো আসামের ১৯ লাখ বাঙালি। এতোদিন তাদের পরিচয় ছিলো, ভারতের মতো বৃহত্তর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন তারা। কিন্তু রাতারাতি চোখের পলকে সেই মানুষগুলোই আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়ে পরিচয়হীন মানুষে পরিণত হলেন। সম্ভবত লিখেছি কারণ তালিকায় নাম না থাকলেও বিদেশি বলে চিহ্নিত কিংবা বন্দিশিবিরে নেয়া হবে না বলে আশ্বস্ত করেছে আসাম রাজ্য সরকার। এখনো নাগরিকপঞ্জি থেকে যারা বাদ পড়েছে তাদের সুযোগ থাকছে, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার। বলা হয়েছে ১২০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে। যদি ট্রাইব্যুনালে মামলায় কেউ হেরে যায়, তার জন্যও সুযোগ থাকছে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার। কিন্তু তারপর কি? তারপর সম্ভবত প্রচ- অনিশ্চয়তা, বন্দিশিবিরে ঢুকিয়ে দেয়ার আশঙ্কা কিংবা গন্তব্য বাংলাদেশ বর্ডার। কিংবা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে যখন আসামে প্রথম নাগরিকপঞ্জি তৈরি হলো দেখা গেলো সেই তালিকায় আসামের অর্ধেকের বেশি নাগরিক বাদ পড়ে গেছে। প্রচ- সমালোচনার মুখে ওই বছরই নাগরিকপঞ্জির সংশোধিত তালিকা তৈরি হয়, যেখানে বাদ পড়ে যায় ৪০ লাখ বাঙালি। কিন্তু তারপরও সমালোচানা এবং বিক্ষোভ চলতেই থাকে, অবশেষে আজ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হলো।

আমি ভাবছি বছরের পর বছর ধরে সেখানকার মানুষ তাদের জাতীয়তা প্রমাণ করার জন্য কাগজপত্র নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে। যে ১৯ লাখ বাদ পড়ে গেলো তাদের এখনো ওই একই কাজ করতে হবে। কীভাবে এই দরিদ্রপীড়িত মানুষগুলো বছরের পর বছর ধরে অপরিসীম এই দুর্ভোগ সয়ে যাচ্ছে। মানুষের সহ্য ক্ষমতা কতোটা। আসামে কেন নাগরিকপঞ্জি তৈরি করা হলো সেটা তো পরিষ্কার। যুগের পর যুগ ধরে সেখানে বাঙালি খেদাও, বাংলাদেশি খেদাও আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এই নাগরিকপঞ্জি তৈরি করা হয়েছে। অতএব যে ১৯ লাখ বাদ পড়েছে, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের সেন্সরে পজিটিভ হয়ে, তাদের একটা অংশ হয়তো নাগরিকত্ব ফিরে পেতে পারে। কিন্তু তারপরও বাদ পড়ে থাকার সম্ভাবনা বিরাট একটা অংশের। তাদের নিয়ে কি করবে ভারত সরকার।

এদিকে নাগরিকপঞ্জিতে বাদ পড়াদের অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে ভারত থেকে বের করে দেয়া হতে পারে, তখন বাংলাদেশের জন্য আর একটা রোহিঙ্গা সংকটের মতো সমস্যা তৈরি হবে, তাই নিয়ে বাংলাদেশের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করা যায়। যদিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তার সাম্প্রতিক ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, এটা একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু তারপরও সংগত কারণে বাংলাদেশ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগছে।
পৃথিবীর সব থেকে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে ছোট্ট একটা জায়গায় প্রায় ১৮-১৯ কোটি মানুষ ঠাসাঠাসি করে বাস করে। যে দেশটি ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ধাক্কায় বেসামাল হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য নতুন কোনো সংকটের সম্ভাবনা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার জন্ম দেবেই।

আসামের নাগরিকপঞ্জি প্রশ্নে ভারত তার নিজের অবস্থানে থেকে বিষয়টি দেখবে, তেমনি দেখবে বাংলাদেশ। এই দু’দেশের নাগরিকেরাও তাদের স্ব স্ব দেশের স্বার্থগত অবস্থানে থেকে যে বিষটিকে ব্যাখ্যা করতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে লাখ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন মানুষে পরিণত হলো তাতে করে তাদের অপরিসীম দুর্ভোগ এবং অনিশ্চিত জীবনের কোনো লাভ হয় না।
সারা পৃথিবীজুড়ে মানুষকে রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন করে দেয়ার এই যে রাজনৈতিক খেলা চলছে, তা করতে যেয়ে জন্ম হয়েছে বিরাট এক জনসমষ্টির, যাদের কোনো পরিচয় নেই। এই পরিচয়হীন মানুষ হয়েছে এক আপদ, যারা কারও নয়, কেউ তাদের চায় না। এই গ্রহের একজন মানুষ হিসেবে একখ- ভূমির উপরে দাঁড়ানোর অধিকারও তাদের নেই। আর কেবলমাত্র মানুষ হয়ে জন্ম নেয়ার কারণে পৃথিবীতে তাদের যে অধিকার, সার্বজনীন মানবতাবাদের যে কথা আমরা বলি… ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির আড়ালে এবং জাতীয় সীমানার কাঁটাতারের মধ্যে, তার সব কিছুই নিশ্চল বিবর্ণ হয়ে যায়। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত