প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক যুবক

বেলাল হোসেন : হঠাৎ করে মনে হলো পড়ালেখার আর দরকার নেই। কেনো মনে হলো তা জানা ছিলো না ওর। লেখাপড়া বাদ দেয়ার পর একটা কাজ বাজ করা দরকার, তাহলে সেটা কি কাজ হতে পারে? তাও জানা ছিলো না। কারণ তখন ওর বয়স ছিলো ১২ থেকে ১৩ বছর আর উচ্চতা ছিলো মাত্র সাড়ে তিন ফুট বা চার ফুট । যাই হোক, ঢাকায় ওর দুর সর্ম্পকের এক ভাই ছিলো তার সাথে যোগাযোগ করা হলে সে ওকে ঢাকায় আসতে বললে ও ঢাকায় আসে। দুয়েকদিনের মধ্যই ওর একটা গার্মেন্টেসে চাকরি হয়। গার্মেন্টেসের নাম ছিলো ফ্যাব ক্লাসিক প্রাইভেট লিমিটেড। পদবী এ্যালেনজার, বেতন ৮০০ টাকা। কয়েক মাস সেখানে চাকরি করার পর আর ভালো লাগে না চাকরি। এরই মধ্য ওর গায়ে গুটি বসন্ত উঠেছিলো, ওর মা ঢাকায় গিয়ে ওকে বাড়িতে নিয়ে আসে। যাই হোক এবার আবার ড্যাং ড্যাং করে ঘোরা যাবে। মজাই মজা কাজ তো আর করতে হবে না।

গার্মেন্টেসে চাকরিকালীন অবস্থায় ওর কোন শত্রু ছিলো না বরং সবাই বন্ধু ছিলো। একবার প্রচুর জ্বর হয়েছিলো। তখন সবাই ওর যত্ন করেছে। বিভিন্ন ধরণের খাবার খাইয়েছে। তাহলে সেই দিনগুলি ছিলো ওর জীবনে মনে করার মতো। আজ ২৩-২৪ বছর পর সেই দিনগুলো মনে পড়লে তাদের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে ওর। তা কি সম্ভব। সম্ভব নয়!

এবার বাড়িতে বসিয়ে বসিয়ে মূর্খ ছেলেকে কে খাওয়াবে? পরিবার হয়তো বা একথা বলে না কিন্তু ও বুঝতে পারে তাদের কথা গ্রামের আরশিপড়শিরা বা কি বলে। পরিবারের চেয়ে আরশিপড়শিদের কথাই গ্রামে বেশি থাকে। তাদের কারণেই আবার ওর বাবা একটি চাকরি ঠিক করলো। সেটা লঞ্চের কেরানী। যাক ভালোই হলো। খারাপ না কেরানী বলতে কথা। যারা লঞ্চে যাতায়াত করে তারা কেরানীর কাজ কি বুঝতে পারবেন। অন্য ভাষায় টিকিট মাস্টারও বলা হয়। ছোট মানুষ এই বয়সেই কেরানি সবাই খুশি। ও খুশি! কিছুদিন কেরানীগিরি করার পর চাকরিটা মালিকের ভাগ্নের জন্য চলে গেল।

ওই বয়সে কেরানীগিরি চাকরি আর পাওয়া যাবে? এটা সত্য তার পরো কিছুদিন কেরানীগিরি চাকরি খোঁজার পর একটা জুটলো। এবার লঞ্চের কেরানী না ট্রলারের, তাও মান রইল। ট্রলারে কিছুদিন কেরানিগিরি করার পর, ঢাকা বরিশাল-ঢাকা লঞ্চের কেবিন বয়ের একদিনের চাকরি করে, আবার চাকরি থেকে অবসর নিলে ও। কি করার আর এবার বলাই চলে কেন সে চাকরি করতে পারে না আবারও গ্রামের মানুষের চোখের বিষ। কি করার ওর বাবা বলে এসব বাদ দিয়ে পড়াশুনাটা করো কাজে লাগবে। না পড়ালেখা ভালো লাগে না। কাজ করতে হবে।

এবার জেলা শহরে গিয়ে একটি আইসক্রিম কোম্পানির সাথে কথা বলে আইসক্রিম বিক্রি শুরু করে দিলো। কিছুদিন আইসক্রিম বিক্রির পর আবারও ঢাকায়, সেখানে টুকটাক কাজ যেমন- একদিন রডের কাজ, কাঠমিস্ত্রীর কাজ, পুরান ঢাকায় একটি পলিথিন কারখানায় কাজসহ বিভিন্ন কাজ করেছে ও।

এবার মনে হলো এটা জীবন নয়। পড়ালেখা করতে হবে। ও যখন ঢাকায় গার্মেন্টেসে গিয়েছিলো তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পাঠ শেষ করে এসব কাজে যোগ দিয়েছিলো। এর মধ্যে ৩ বছর এটা ওটা করে সময় শেষ। তাহলে তো ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি হতে হবে? না তা সম্ভব নয়। গ্রামের একটা স্কুলে গিয়ে সে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে আসলো (অবশ্য শিক্ষকরা ওকে ৮ম শ্রেণীতে ভর্তির পরার্মশ দিয়েছিলো) সেটা হবে না নবম শ্রেণীতেই ভর্তি হয়ে বাড়ি আসলো ও।

একজন প্রাইমারি শিক্ষক ওকে জিজ্ঞাসা করছিলো ইংরেজীতে বলো (বইখানা টেবিলের ওপর) ওর সে উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা ছিলো না। কারণ এতো বড়ো ট্রান্সলেশন কি করে পারবে। যাই হোক এবার আর টালবাহানা চলবে না, পরীক্ষায় পাশ করার আশায় পড়াশুনায় মনোযোগ দিতেই হলো। এবার সে নবম শ্রেণী পাঠ শেষ করে দশম শ্রেণীতে উঠলো। মারহাবা! দশম শ্রেণীতে ওঠার পর কে আর নাগাল পায়, এসএসসি, এইচএসসি, অনাস, মাস্টার্স পাঠ শেষ করে। আবার চাকরির প্যারা মাথায় উঠলো। পড়ালেখার মাঝে বেশ সময় কেটে গেলো।

এরপর চাকরি বিস্তারিত না বলেই শুরু করছি। একটা রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে ওর নিকটতম এক বন্ধু ছিলো। তার কোম্পানিতে সাক্ষাৎ করেই চাকরি হয়ে গেলো। এরপর আবারও সেই পুরান কথা এটা ভালো লাগে না। সেখান থেকে অপসোনিনে মেডিকেল প্রমেশন অফিসার, সেখানেও ভালো লাগে না। নাভানা ফার্মসিটিউক্যালস না এ চাকরি আর ভালো লাগে না। আবার বন্ধুর কেম্পানিতে ধরনা দিলো। ওর বন্ধু ভাবলো আমার কোম্পানি ছাড়া ওর গতি নাই। ও একথা বুঝতে পেরে সেখান থেকে রিজাইন দিয়ে চট্টগ্রাম চলে গেল। সেখানে চাকরি খোঁজাখুজি করার পর এমজেএম নামে একটা গার্মেন্টেসে চাকরি হলো। ৪ দিন সেখানে চাকরি করে, কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড নামে একটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে শিক্ষক হিসেবে জয়েন্ট করলো। ৬-৭ মাস সেখানে শিক্ষকতা করে আর ভালো লাগে না পুরনো অভ্যাস।

কি আর করা, বরিশালে চলে এলো আবার বরিশাল থেকে চট্টগ্রাম গেল চাকরির জন্য। না চাকরি মিলছে না। এবার আবার ঢাকায় পাড়ি জমাতে হবে। যেই চিন্তা সেই কাজ। ঢাকায় আসার পর আর চাকরি মেলে না। বন্ধুকেও একবার ফোন করেছিলো চাকরির জন্য এবার বন্ধু সরাসরি বলে দিলো ভালো অপসন পেয়ে চলে গিয়েছে এখন আর আমার এখানে সম্ভব না। যাক ভালো হলো এবার চাকরি নাই। ভোগান্তির কথা উল্লেখ করব না এটা আলোচ্যে বিষয় নয়। এভাবে চলতে লাগলো। মাঝে মাঝে ইন্টারভিউ থাকে। কিন্তু বলে-ব্যাটে মিলছে না। আবার ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়ার পর, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ডেকো কোম্পানিতে চাকরি হলো একদিন ডিউটি করার পর, চট্টগ্রাম সিপিংলাইনে সিভি দেওয়া ছিলো সেখান থেকেও ডাক আসলে, ডেকো ফেলে এবার সিপিংলাইন চট্টগ্রামে।

সিপিংলাইন বলতে সার্ভে কোম্পানিতে (চাকরি কন্টিনার সার্ভে) ১২ ঘণ্টা ডিউটি মাইনে কম। কিছুদিনের মধ্য অপারেশন ম্যানেজারের খুব প্রিয় পাত্রতে পরিণত হতে পেরেছিলো ও। তাই ওকে একাধিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো। কয়েক মাস চাকরি করার পরে, সেখান থেকে আবার চাকরির উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসলো। এবার কি করার একুশে টেলিভিশনের সিনিয়র এক সাংবাদিক একটি পত্রিকা করেছে সেখানে চাকরি হলো তাও করলো না।

কি আর করার এক ট্যাক্স এ্যাডভাইজারের কাছে গিয়েছিলো কারণ তার সাথে অনেক কোম্পানির সাথে তার ভালো খাতির আছে সে একটা ভালো চাকরি দিতে পারবে। সেটা হলো না। তার সাথেই রেখে দিয়েছিলো। আর বলেছিলো ভাল চাকরির খবর পেলে তোমাকে দিবো। তাও একটা ভরসা হলো। সেখানে একঝাঁক উকিল মোক্তার ছিলো। তাদের অবহেলায় অযত্নে তাদের চোখের চাহনিতে, রোষানলে ও এবার এলএলবিতে ভর্তি হলো। ১০ মাস তার সাথে থাকার পর ওখান থেকে চলে এলো । এবার ও কি করবে?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত