প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শতাব্দীর অন্যতম পুঁজিবাদবিরোধী সমাজতাত্ত্বিক, অধ্যাপক ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন ছিলেন আমার শিক্ষক

এই মাত্র জানা গেল, এই শতাব্দীর অন্যতম পুঁজিবাদবিরোধী সমাজতাত্ত্বিক, অধ্যাপক ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন (সেপ্টেম্বর ২৮, ১৯৩০ – ৩১ আগস্ট, ২০১৯) আর নেই। নীরবে চলে গেলেন আমার সরাসরি শিক্ষক, আমার ডক্টরেট প্রোগ্রামের প্রথম সুপারভাইজার অধ্যাপক ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন (৮৮)। নিউইয়র্ক শহর থেকে প্রায ২৮০ কিলোমিটার দূরে স্টেট ইউনিভাসিটি অব নিউ ইয়র্ক, বিংহামটনের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন বহুবছর। পৃথিবী তাকে অনেকভাবে চেনে। তরুণ বয়সে তার জীবন শুরু হয় ছাত্ররাজনীতির একটি ভিস্ট হিসাবে। সত্তর দশকে যে মার্কিন ছাত্রদের মধ্যে চিনা বিপ্লব ও মাও জে দং- এর প্রভাব পড়েছিলো, যে ছাত্র উত্থান সংগঠিত হয়েছিলো পুঁজিবাদের সদর দপ্তরে- তিনি তাদের নেতৃত্বে ছিলেন। যারা পুঁজিবাদকে সভ্যতার ব্যবস্থা হিসাবে অগ্রহণযোগ্য মনে করে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার সন্ধান করেছিলেন, ওয়ালারস্টেইন তার অন্যতম। নিউ ইয়র্ক শহরের বুকের ওপর দাড়িয়ে থাকা কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় অনেক চমৎকার মানুষের জন্ম দিয়েছে। এরা শুধু পন্ডিত নয়। জগত বদলাবার জন্য যা করা দরকার তা করেছেন নিরলসভাবে। এক পর্যায়ে ওয়ালারষ্টেইন কলাম্বিয়া ইউভার্সিটির দুই সহপাঠি ও বন্ধু টেরেন্স হপকিন্স ও জিওভানি এ্যারিগিকে নিয়ে বিংহামটনে সমাজবিজ্ঞান বিভাগটি খুলেছিলেন। প্রতিটি বিষয়ে এখানে যারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তারা ওই সময়ের বিকল্প পৃথিবী নির্মাণে অঙ্গিকারাবদ্ধ স্কলার- একটিভিষ্ট।

আমি নিউ ইয়র্কে থাকতেই টেরেন্স হপকিনস মারা যায়। একদিন বাসার বেল টিপতে গিয়ে শুনি উনি আর নেই। তারপর দেশে এসে শুনলাম এ্যারিগী মারা গেলেন। আজ শুনলাম ওয়ালার স্টেইন মারা গেলেন। বাংলাদেশে সংবাদে সেটা আসেনি। কোনো তথ্য নেই। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালগুলোতে সমাজবিজ্ঞান ও সভ্যতা সম্পর্কে পড়ানো হয় না। ফলে মিডিয়ার লোকেরাও হয়তো জানেও না লোকটা কে?

তিনি শুধু অধ্যাপক নন, আন্তর্জুাতিক সমাজবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি ছিলেন। এতেও পুরাটা বলা হয় না। কার্ল মার্কস ও গুন্ডার ফ্যাংকের পাশাপাশি তার নাম উচ্চারিত হয়। যখন পুঁজিবাদীদের আধুনিকীকরন তত্ত্বকে বিধস্ত করলো ডিপেডেন্সী তত্ত্ব- যার মাধ্যমে ল্যাটিন আমেরিকার একদল পন্ডিত চিন্তুার ইতিহাসকে নাড়া দিলেন। গুন্ডার ফ্র্যুাংক, পল ব্যারান এই নামগুলো সমাজচিন্তার মানুষেরা জানে। যারা জগত বদলাবার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু সেই ডিপেডেন্সি তত্ত¡ও একসময়ে জগৎব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আটকে গেলো। তাকে উদ্ধার করে ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন এর ওয়ার্ল্ড সিস্টেম তত্ত্ব। এই সময়ে কাল মার্কস মতোই তার পান্ডিত্য ছিল বিশ্বজনীন পরিবর্তন ব্যাখ্যায় ও মানুষের মুক্তির ব্যাপারে অকপট। তার সময়ের কাল মাকর্স-এর অনেক বক্তব্যকে তিনি যুগোপযোগী প্রাসঙ্গিকতা দিযেছেন। শুধু ইকোনমিক মানদন্ডে পৃুথিবীকে ৩ ভাগ করেছেন-কোর-পেরিফেরী-সেমী পেরিফেরী। গতানুগতিক মার্কসবাদীরা তার সঙ্গে একমত হয় না, প্রায়শ। কিন্তু মাকসীয় চিন্তার ইতিহাস থেকে তাকে বাদ দেয়া সম্ভব নয়। আজকের যুগের যে বিশ্বায়ন তত্ত্ব-বলা হয়, ওয়ালারস্টেইন তার পূর্বসূরী। তিনিই প্রথম বলেছিলেন, এখনকার পৃথিবীর যে কোনো দেশের যে কোনো প্রান্তের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে হলে- করতে হবে বিশ্বজনীন মাপকাঠিতে- ওয়াল্ড ইজ দি ইউনিট অব অ্যানালিসিস। দেশের সীমানায়, এমনকি শুধু শ্রেণির সীমানায় জগৎ ুপরিবতনের শক্তির বিশ্লেষন সম্ভয় নয়। আর তার ওপর দাড়িয়ে মার্কসবাদী ও নয়া মার্কসবাদীরা বিশ্বায়ন তত্ত্ব দাড় করিয়েছেন বিভিন্নভাবে।

আমি এখানে এ আলোচনাকে আর জটিল করতে চাই না। পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে আমরা সেখানে ছুটে গিয়েছিলাম স্টেট ইউনিভাসিটির অব নিউইয়র্ক -এর নাম শুনে। আমাদের কখনো মনে হয়নি ওটা বিশ্ব বিদ্যালয়। পুর্তোরিকো, আর্জেন্টিনা, চিলি, নিকারাগুয়া, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ঘানা, মরক্কো, ইতালি, ইংল্যান্ড, জার্মান থেকে যারা এসেছিলো আমরা শুধু সহপাঠি ছিলাম না। জগত বদলাবার অঙ্গীকার যাদেরকে তাড়িত করেছিলো, তারাই ওই সমাজবিজ্ঞান বিভাগের জমায়েত হয়েছিলাম। ডিপার্টমেন্ট ছাড়াও ওয়ালারন্টেইন পরিচালিত ফানান্ড ব্রডেলু সেন্টারের কাজ ছিলো সমাজ বদলানোর অঙ্গিকার থেকে সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়ন। আমাদের শিক্ষকদের অধিকাংশই পৃথিবীর কোনো না কোনো এলাকার প্রগতিশীল গণআন্দোলনের একটিভিষ্ট এবং একই সঙ্গে সময়ের শ্রেষ্ট পন্ডিত ও অধ্যাপক।
অনেক কিছু মনে পড়ে আজ। আমি ওখানে একটা পর্যায়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সংসদের সভাপতি নিবাচিত হয়েছিলাম। সে ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। আমরা ও আমাদের শিক্ষকেরা একসঙ্গে সেই সময়ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংগঠিত আন্দোলনগুলোতে অংশ্রগ্রহণ করতাম। পৃথিবীর সর্বত্র আন্দোলনগুলোর ওপর আলোচনা হতো, আমরা আপডেট রাখতাম। নিউ স্কুল বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একসঙ্গে গিয়ে তকাতর্কি করতাম। মার্কিন প্রশাসনের তাবেদার অধ্যাপকদের তুলোধুনো করত আমাদের শিক্ষকেরা- আর আমরা তাদের পক্ষে সায় দিতাম, আরগুমেন্ট করতাম বুক চিতিয়ে।

একটা উজ্বল যুগের অবসান হলো। ওয়ালারসেইনর ও তার সঙ্গীদের জীবদ্দশায় মাকিন পুঁজিবাদী পন্ডিতেরা, হারবার্ড, স্টেনফোর্ডের নাক উুুঁচু অধ্যাপকেরা, যারা পৃথিবীর মানুষ নিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করতো না, তারা ইমানুয়েল ও এই র‌্যাডিক্যাল দলটার মেধা ও যোগ্যতাকে ভয় করতো, কাছে দাড়াতে পারতো না। রাষ্ট্রনীতিতে নোয়াম চমস্কিকে অনেকে বেশি চেনেন কিন্তু সমাজচিন্তায় ও সরাসরি আন্দোলন সংগ্রামের তাত্তি¡ক ওয়ালারস্টেইনে এবং তার দলের আমাদের ডিপাটমেন্টের শিক্ষক মার্ক সেলডেন, জিওভানী এ্যারিগী, চালার কেদারসহ, ওয়াল্ডেন বেলো, জেমস পেট্রাস, ক্যালভিন সান্টিয়াগো- কোনো একটা দেশের নাগরিক নন, কিন্তু মানুষের সংগ্রামের তত্ত¡ নির্মাণে ইতিহাসে দাগ কেটে আছেন। ওয়ালারস্টেইন কলাম্বিয়া বিশ্বিবিদ্যালয়সহ অনেক স্থানে অধ্যাপনা করলেও তার শ্রেষ্ঠ সময়টা কাটিয়েছেন সারা পৃথিবী থেকে আগত আমাদের মতো ছাত্রদের সঙ্গে, আপস্টেট নিউইয়কের ছোট্ট শহর বিংহামটনে। কয়েক বছর আগেও তিনি বৃদ্ধ বয়সে অকোপাই মুভমেন্টের ধারাবাহিক কমেন্ট্রি করার জন্য কর্মস্থল থেকে নিউইয়র্ক শহরে ছুটে এসেছেন, অনেকের জানার কথা।

আজ মার্কিন প্রশাসন ও পৃথিবীতে অযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব আধিপত্য করছে বটে, তবে মানুষের সংগ্রামে অগ্রসরের পথটি সরলরেখায় যায় না, সভ্যতার গতি উঠানামা করে এগোয়, এটা স্পাইরাল- এ কথাগুলো ওয়ালারস্টেইনের। এ যুগের গণ আন্দোলনের ধরণু কি হবে- সে বিষয়ে আমার একখানা গ্রন্থ আছে। খুব ভারিক্কী ইংরেজীতে বলে আমি এটাকে সুস্বাদু বাংলায় রূপান্তর করে ছাপাবো বলে কাজ করছি। যাদের কাছে চিন্তুায় সাহায্য নিয়েছি তাদের মধ্যে অন্যতম মানুষটা চলে গেলেন। ব্যক্তি আচরনে এরা ছিল খুবই বন্ধুত্বপুর্ণ। ওখানকার অধ্যাপকেরা ছাত্রদের আনুষ্ঠানিক আদব-কায়দা নিয়ে মাথা ঘামাতো না। ফলে ক্লাশে আমাদের ঠ্যাং উচু করে কথা বলার সময় মনেই হতো না যে ওরা সময়ের পৃথিবীখ্যাত চিন্তাবিদ। ছোট্ট বিংহামটন শহর, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত এর দুটি ছোট নদী সাসকোহেনা ও সেনাঙ্গো, আমার দুই সন্তুান, আমার জগত বদলানোর অঙ্গিকারাবদ্ধ বন্ধুরা হয়তো বাংলায় এ লেখাটা পড়বে না। কিন্তু আমি তাদের স্মরন করি।
লেখক : শিক্ষক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত