প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরও সহস্রাধিক স্থানে আগুন, আমাজন ধ্বংসের নীলনকশা!

খালিদ আহমেদ : বিশ্বের সর্ববৃহৎ চিরহরিৎ বৃষ্টি-অরণ্য আমাজনে আট মাসে ৭৫ হাজার বার আগুন লাগার ঘটনা স্বাভাবিক কিছু নয়। টানা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পুড়তে থাকলেও পৃথিবীর ‘ফুসফুস’খ্যাত এ বনভূমির দাবানল নিয়ন্ত্রণে ব্রাজিল সরকারের নিষ্ক্রিয়তা প্রকৃতির কাছে নিতান্ত অসহায়ত্বও নয়। দৈত্যাকার অ্যানাকোন্ডা থেকে রাক্ষুসে পিরানহাসহ প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে জানা-অজানা বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির এই অভয়াশ্রমকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়ার পেছনে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী নীলনকশা। দি ইন্টারসেপ্টার, মোঙ্গাবে, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ও এএফপি

আমাজনের আয়তন ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার, যার ৬০ শতাংশ পড়েছে ব্রাজিলে। বন উজাড় করে দেশি-বিদেশি বহুজাতিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে ভূমি ইজারা দিয়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে ব্রাজিলের উগ্র ডানপন্থি পরিবেশবিদ্বেষীরা দীর্ঘদিন ধরে এই নীলনকশায় লিপ্ত। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান মধ্যস্থতাকারীদের একটি অংশ, যারা ব্রাজিল সরকারের পক্ষে আমাজনে বিনিয়োগ বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রভাবিত করে যাচ্ছেন। সোনা, হীরা থেকে কয়লা- নানা ধরনের মূল্যবান খনিজ পদার্থ উত্তোলন, কৃষি, পশুপালনসহ অন্যান্য ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠা এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে তাদের আহ্বান জানাচ্ছে ব্রাজিল সরকার। আর উন্নয়নের নামে এগুলো বাস্তবায়ন করছেন ব্রাজিলের ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ হিসেবে পরিচিত দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো। যার সরাসরি প্রমাণও মিলেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ক্ষমতায় বসার পর থেকেই আমাজন বিনাশের অপরাধে জরিমানার হারও কমিয়ে দিয়েছেন তিনি। ফলে আমাজন বাঁচানোর দাবিতে বিশ্বজুড়ে যখন বিক্ষোভ চলছে, তখন বোলসোনারো জেগেই ঘুমাচ্ছেন। কারণ এই ধ্বংসলীলা তার কারসাজি অনুযায়ীই চলছে।

এদিকে, আমাজনের ব্রাজিল অংশে সহস্রাধিক স্থানে নতুন করে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। আমাজনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পোপ ফ্রান্সিস। তিনি এই বনকে পৃথিবীর জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ ফুসফুস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিশ্বব্যাপী ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের আমাজনের জন্য বিশেষ প্রার্থনা করতে আহ্বান জানিয়েছেন।

আমাজনে প্রাকৃতিক দাবানলের মৌসুম জুলাই থেকে অক্টোবর। তবে এবার আগের বছরের তুলনায় ৮৩ শতাংশ বেশি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। পুড়ে ভস্ম হয়েছে ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার বনভূমি। এসব জায়গা ইজারা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ব্রাজিল সরকারের। এদিকে, পৃথিবীর মোট চাহিদার ২০ শতাংশ অক্সিজেন সরবরাহ করা আমাজনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে গত ৫০ বছরে। এখন সেখানে শিল্পায়নের নামে যে হারে আগুন লাগানো হচ্ছে, তাতে শিগগির এ বনাঞ্চলের আরও এক-পঞ্চমাংশ বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি বৈশ্বিক বাস্তুসংস্থানের জন্য ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ডেকে আনবে। আমাজনে দুর্যোগের কারণ হিসেবে বৃহৎ অর্থে বন উজাড় করে মুনাফার জন্য পশুপালন, খনি খনন ও রফতানিমুখী কৃষি শিল্প গড়ে তোলার লোভকে দায়ী করা হচ্ছে। নথিপত্র থেকে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের কাছে এই লোভকে ফেরি করছেন দেশটির কয়েকজন প্রভাবশালী রিপাবলিকান লবিস্ট (মধ্যস্থতাকারী)। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সখ্য রয়েছে। ব্রাজিল সরকারের পক্ষে আমাজনে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট বিনিয়োগ বাড়াতে কাজ করছেন তারা।

পরিবেশ ও আদিবাসীবিদ্বেষী সরকার ব্রাজিলে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমাজন সংকট বড় হতে শুরু করেছে। সেনাবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো ব্রাজিলের রাজনীতিতে আমাজন নিয়ে আগে থেকে ভিন্নমতে বিশ্বাসী হিসেবে পরিচিত। আমাজনের বৃক্ষরাজি বিক্রি করে ও সেখানে কৃষির প্রসার ঘটিয়ে উন্নত ব্রাজিল গঠনের পক্ষে তার শক্ত অবস্থান রয়েছে। যে কারণে ক্ষমতার আসার পরই তিনি দেশটির প্রধান পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থার বরাদ্দ ২৪ শতাংশ কমিয়ে দেন। অন্যদিকে বন ধ্বংসের অপরাধে জরিমানার প্রক্রিয়া শিথিল করেন। হাতেনাতে যার ফল পেয়েছেন তিনি। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউট স্যাটেলাইট উপাত্ত বিশ্নেষণ করে সম্প্রতি জানায়, আগের বছরের প্রথম আট মাসের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে ৮৩ শতাংশ বেশি আগুন লেগেছে। এমনই তো চেয়েছিলেন তিনি। অথচ বোলসোনারোর অভিযোগ, বরাদ্দ কমানোর শোধ তুলতে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো আমাজনে আগুন দিয়েছে। এর পরই মূলত আমাজনের দাবানলের মতো বিশ্বজুড়ে তার অবস্থানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ফুঁসে উঠেছে।

তবে এসব পাত্তা দিচ্ছে না বোলসোনারো সরকার। আমাজনের জমি বিক্রি ও বন উজাড়ের জন্য ওয়াশিংটনে লবিস্টদের সঙ্গে দেনদরবার করে যাচ্ছেন তারা। গত জুন মাসে ব্রাজিলের আমাজোনাস রাজ্যের গভর্নর উইলসন লিমা ওয়াশিংটনভিত্তিক বলিং ফার্ম ইন্টারআমেরিকা গ্রুপের সঙ্গে এ নিয়ে কাজ শুরু করেন। ইন্টারআমেরিকা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরি পিয়ার্স জুনিয়র কেলেন ফেলিক্স ব্রাজিলের নাগরিক। তিনিও আমাজোনাসের গভর্নর লিমার সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছেন। লিমা গত বছর গভর্নর নির্বাচিত হন। খ্রিষ্টান আধিপত্যে বিশ্বাসী ‘অ্যাসেমব্লি অব গড’ নামে চার্চ পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্রাজিলের রক্ষণশীল দল সোশ্যাল ক্রিস্টিয়ান পার্টির (পিএসসি) সদস্য তিনি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের অধীন পরিচালিত বিদেশি মধ্যস্থতার বিষয় নিয়ন্ত্রণকারী ‘ফরেন এজেন্ট রেজিস্ট্রেশন অ্যাক’ কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ইন্টারআমেরিকা গ্রুপের জেরি পিয়ার্স যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার ও কংগ্রেসের বৈঠকে আমাজোনাসের গভর্নরের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করছেন।

এরই মধ্যে আমাজন অঞ্চলে উন্নয়নমুখী ব্যবসার সম্ভাবনা তুলে ধরে আমাজোনাসের গভর্নরের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট কোম্পানিগুলোর পরিকল্পনা জমা দিয়েছে ইন্টারআমেরিকা গ্রুপ। এ পরিকল্পনায় ব্যবসায়ীদের জন্য বিশাল সুযোগ হিসেবে আমাজনে খনি, কৃষি ও গ্যাস কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ব্যবসা পরিচালনার জন্য অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে দেখানো হয়েছে ‘বন সংরক্ষণের নিশ্চয়তা’র বিষয়টি। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সরকারে গৃহায়ন ও নগর উন্নয়ন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা জেরি পিয়ার্স বলেছেন, এখনও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। তিনি দাবি করেন, ‘দুর্ভাগ্যক্রমে আমাজোনাস রাজ্য সরকার তাদের সঙ্গে আপাতত আলোচনা বন্ধ রেখেছে। ২০২০ সালে নতুন করে চুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।’ তবে কেন তারা আমাজোনাস গভর্নরের পক্ষে এখনও দেনদরবার চালিয়ে যাচ্ছেন- এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি জেরি পিয়ার্স। বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও জেরি পিয়ার্স আরেকটি বিষয় স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বোলসোনারো মিলে ব্রাজিলে গোটা আমেরিকার বড় বড় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ করানোর চেষ্টা করছেন। ২০১৭ সালে ‘আন্ডার অ্যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প’ শিরোনামে জেরি পিয়ার্স তার নিজের কোম্পানির ওয়েবসাইটে একটি ব্লগ পোস্ট লেখেন। তাতে তিনি বলেন, ‘কৃষি ও খনি খাতের ব্যবসা, ব্যাংকিং এবং বিমান পরিবহনে বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে দাঁড়াতে চায় ব্রাজিল।’ জানুয়ারি মাসে কট্টর ডানপন্থি বোলসোনারো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার খবরে উচ্ছ্বসিত হয়ে আরেকটি পোস্টে জেরি পিয়ার্স লেখেন, ‘বোলসোনারোর বিজয়ের পথ রচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।’ এই জেরি পিয়ার্সের আগেও যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রভাবশালী রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র রুডি গিউলিয়ানি আমাজোনাসের সাবেক গভর্নর আমাজোনিনো মেন্দেসের সঙ্গে ১৬ লাখ ডলারের একটি বিতর্কিত চুক্তি করেছিলেন। দারিদ্র্য বিমোচন, মাদক ব্যবসা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ইস্যুকে হাতিয়ার করে উন্নয়নের নামে করা ওই চুক্তিটি আর আলোর মুখ দেখেনি। রুডি এখন ট্রাম্পের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পিয়ার্সের মতো লবিস্ট ও রুডির মতো ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের আমাজনে বিনিয়োগের জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন। তাদের মুনাফার স্বার্থেই হয়তো জ্বলছে পৃথিবীর ফুসফুস। এখন আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে আমাজনের আগুন নেভাতে বোলাসোনারো সেনা নামানোর যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা কতটা আন্তরিকতা থেকে আর কতটা লোক দেখানোর জন্য তা অনুমান করা যায়। এ অবস্থায় বোলসোনারোর লোভ থেকে আমাজন রক্ষায় আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

কেএ/এসবি

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত