প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কিছু চীনা প্রতিষ্ঠানের গ্যাঁড়াকলে উন্নয়ন

আহমেদ শাহেদ : দেশের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প পিছিয়ে পড়ছে। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় বাড়ছে খরচও। সরাসরি জিটুজি পদ্ধতি কিংবা দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পেলেও পরবর্তী সময়ে নানা অজুহাতে সময় বাড়াতে হয়। আসে খরচ বৃদ্ধির প্রসঙ্গও। দেখা গেছে, কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের কারণেই এ ঘটনা ঘটছে। দৈনিক আমাদের সময়

ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পে নিম্ন মানের কাজের অভিযোগ আসে চীনের সিনো হাইড্রো করপোরেশনের বিরুদ্ধে। এ প্রতিষ্ঠানটিকে বাদ দেওয়া যায়নি আন্তর্জাতিক দরপত্রের কারণে। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পায় পদ্মা সেতুর নদীশাসনের। অথচ প্রকল্পের এ অংশের কাজ সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। নতুন করে সময় ও খরচ বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সিনো হাইড্রোর মতো কাজ না করলেও আগেই ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে ঢাকা-সিলেট চার লেন প্রকল্পের আরেক প্রতিষ্ঠান। চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির পক্ষ থেকে সড়ক বিভাগের সচিবকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে পিছিয়ে পড়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ। প্রায় কাছাকাছি ঘটনা ঘটে ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়ক প্রকল্পে। এটি বাস্তবায়নে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে এমওইউ সই হয়। এর পর চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেয় প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তির আগেই সাব-কন্ট্রাক্টসহ নানা কারণে প্রকল্পটি থেমে যায়। এরও পর সমালোচনা হয় অতিরিক্ত খরচ নির্ধারণের কারণে। আবার অতিরিক্ত ব্যয় নির্ধারণের অভিযোগ আছে আখাউড়া-সিলেট ডাবল লাইন প্রকল্পে। চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড (সিআরবিজি) নামের প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে দরকষাকষি নিয়েও অভিযোগ আছে।

জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের একাধিক অংশের কাজ করে সিনো হাইড্রো করপোরেশন। ২০১৩ সালে এ প্রকল্পের ব্যাপারে আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ইচ্ছে করে কাজ করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। চীনা প্রতিষ্ঠানের এ কারসাজির সঙ্গে সওজের সংশ্লিষ্টদেরও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। ফলে দ্রুত কাজ শেষ করার বিষয়টি নিয়ে সওজের যথেষ্ট অবহেলা ছিল। শুধু তাই নয়, প্রকল্প মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের জানা থাকলেও বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো কথা বলা হয়নি। কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এ জন্য ব্যয় বারবার বাড়ানো হচ্ছে।

এদিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নদীশাসন কাজে অতিরিক্ত দর প্রস্তাবের অভিযোগ উঠেছে। আর এ প্রস্তাবটি দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো লিমিটেড। এমনিতেই প্রকল্পের নদীশাসন কাজের অগ্রগতি তুলনামূলক কম। প্রকল্পের কাজে প্রস্তাবিত পণ্যের হার নির্ধারণ নিয়ে আপত্তি তুলে প্রকল্পে নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। তাই ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রস্তাবিত দর যাচাইয়ে চীন যান মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব। এখন নতুন করে খরচ ও সময় বাড়ানোর জন্য চিঠি দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ নদীশাসনের কাজের গতি খুবই মন্থর। তাদের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১৪ সালের শেষদিকে। চার বছরের মধ্যে কাজ শেষ করতে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী, গত বছর ডিসেম্বরেই সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। পরে সময় এক বছর বাড়ানো হয়। মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজের সময়সীমা বাড়ানো নিয়ে ঠিকাদার ও সেতু বিভাগের মধ্যে প্রতিনিয়তই চিঠি চালাচালি হচ্ছে। চায়না মেজর ব্রিজ গত বছরের শেষদিকে ২০২১ সালের জুনে মূল সেতুর কাজ শেষ করার কর্মপরিকল্পনা দেয়। তবে সেতু বিভাগ তা অনুমোদন করেনি। তারা গত মে মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেয়। অন্যদিকে সিনো হাইড্রো করপোরেশন ২০২১ সালের জুলাইয়ের মধ্যে নদীশাসনের কাজ শেষ করার সময়সীমা দাবি করে।

এদিকে ঢাকা-সিলেট চার লেন প্রকল্পে চীনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সড়ক সচিবকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টায় ঝুলে যায় নির্মাণ প্রক্রিয়া। এর পর ওই প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নের দিকে ঝোঁকে সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু এ খাতে বিপুল অর্থ খরচ না করে অন্য দাতা সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা ভাবে সরকার। একাধিক প্রস্তাবও পায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ।

চীনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে বলা হয়, সমঝোতা স্মারকের প্রকল্পটি দুদেশের সম্পর্কের নিদর্শন। তাই ঘুষ প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠান বাদ হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায়। তা ছাড়া একক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সীমিত দরপত্রে মনোনীত করার প্রস্তাব আসে। এবার সেদিকেই হাঁটছে সরকার।

সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসারে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার জন্য ঠিক করে দেয় চীন সরকার। বিপত্তি ঘটে দরকষাকষির শেষ পর্যায়ে। সড়ক পরিবহন সচিব হিসেবে নজরুল ইসলাম যোগদানের পর ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর চায়না হারবারের দুই কর্মকর্তা ও তাদের বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিনিধি সাক্ষাৎ করতে যান। চায়না হারবারের কর্মকর্তারা গ্রিন-টির একটা প্যাকেট দেন সচিবকে। বাসায় ফিরে প্যাকেটের মধ্যে ১০টি বান্ডিলে এক লাখ মার্কিন ডলার দেখতে পান তিনি। এর পরই চায়না হারবারকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, আগে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত হচ্ছে এলটিএম। এতে করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে।

ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রসঙ্গে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান বলেন, ডিজাইন পরিবর্তন, সময় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে ব্যয় হয়তো বাড়তেও পারে।

চলতি বছরের জুনে অনুমোদন পায় আখাউড়া-সিলেট রেলপথ ডাবল লাইন প্রকল্প। ১৬ হাজার ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকার এ প্রকল্পটি দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রেল প্রকল্প। জিটুজি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডের (সিআরবিজি) সঙ্গে এর আগে নেগোসিয়েশন সম্পন্ন করেছে রেলওয়ে। চূড়ান্ত করা হয় ১৪৯৭.৫৬ মিলিয়ন ডলার বা ১২ হাজার ৭৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর পর তা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমোদন নেওয়া হয় গত ১৫ মার্চ। পরে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) তৈরি করা হয়।

একই দশা আশুলিয়া উড়াল সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে। ২০১১ সালে নেওয়া হয় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ। বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করবে সরকার। ১৬ হাজার ৯০১ কোটি ৩২ লাখ ২১ হাজার টাকার এ প্রকল্পটি ঝুলে আছে চীনের ঋণচুক্তির অপেক্ষায়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত