প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার দায় বিএনপি এড়াবে কীভাবে?

বিভুরঞ্জন সরকার : গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে রক্তাক্ত জঙ্গি হামলার ঘটনার পর কিছুটা আকস্মিকভাবেই বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। তার এই ঐক্য-ডাক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিলো। বেগম জিয়া ক্ষমতায় থাকতে এবং ক্ষমতা হারানোর পরও জঙ্গিবাদের বিপদ সম্পর্কে কখনো কোনো কথা বলেননি। বরং দেশে জঙ্গি আছে এই সত্যটি তিনি স্বীকার করতে চাননি। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়েই ২০০৫ সালে ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলো জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। এটা অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, বিএনপি এবং তার জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই দেশে জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলো। তাছাড়া বিএনপি মুখে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কথা বললেও দেশে সবচেয়ে পুরানো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের মনোভাব একেবারেই গণতন্ত্রসম্মত নয়। আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সন্ত্রাস-সহিংসতার পথ বেছে নিয়েও সফল হতে পারেনি বিএনপি। ফলে বিএনপি এখন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে খাদে পড়েছে। জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের যে ডাক খালেদা জিয়া দিয়েছিলেন সেটা কতোটা আন্তরিক, আর কতোটা খাদ থেকে পাড়ে ওঠার কৌশল সে প্রশ্ন সবার মধ্যেই দেখা দিয়েছিলো। সুসময়ের দেখা পাওয়ার জন্য খালেদা জিয়া তখন উপায় খুঁজেছেন। আওয়ামী লীগ তথা সরকারের সঙ্গে বৈরিতা কমিয়ে আনার চিন্তাও হয়তো তার মধ্যে ছিলো। তবে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ‘নিশ্চিহ্ন’ করার যে রাজনীতির চর্চা তার দল বিএনপি করে এসেছে তা থেকে সরে আসতে হলে অতীতের অনেক কিছুর জন্যই তাদের ভুল স্বীকার করে জাতির কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। তা না হলে তারা যা করবেন তা নিয়েই জনমনে সন্দেহ দেখা দেবে।

বিএনপি যে আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্নকরণের রাজনীতি অনুসরণ করে এসেছে তার বড় দৃষ্টান্ত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিলো। মূলত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্যই ওই গ্রেনেড হামলা চালানো হলেও তিনি সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান। তবে আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী রহমানসহ কমপক্ষে ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। শেখ হাসিনাসহ শতাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন। এদের অনেকেই সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। কেউ কেউ এখনো শরীরে অসংখ্য স্পিøন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। ২১ আগস্টের বীভৎস হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সময় ক্ষমতায় ছিলো বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। দেশে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে প্রাথমিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারের দায়িত্ব। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো এতোবড় অপরাধ যারা করেছিলো তাদের চিহ্নিত করা, গ্রেপ্তার করা এবং আইনের হাতে সোপর্দ করার জরুরি কর্তব্যটি তৎকালীন সরকার সম্পাদনে কেবল চরমভাবে ব্যর্থতারই পরিচয় দেয়নি, বরং ঘটনা প্রবাহ অন্য খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টাই চালানো হয়েছিলো। অপরাধীরা যাতে নিরাপদে থাকতে পারে কৌশলে সেই চেষ্টাই করা হয়েছিলো। এখন এটা অনেকের কাছে পরিষ্কার হয়েছে যে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সংশ্লিষ্টতা ছিলো। গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের দেয়া তথ্য থেকেই জানা যায় যে, হামলাকারীদের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের একাধিক মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের যোগাযোগ ছিলো।

সেসময়ে ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘হাওয়া ভবনে’ তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের উপস্থিতিতে হামলায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিলো বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। এটাও আমাদের জানা আছে যে, তখন সরকার জজ মিয়া নামের একজন ছিঁচকে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলো। সরকার তখন শৈবাল সাহা পার্থ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেও নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছিলো। ২১ আগস্টের হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে এবং শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি দিয়ে সংবাদপত্রে একটি ই-মেইল বার্তা পাঠানোর সূত্র ধরে পার্থকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। পার্থই ওই ই-মেইল বার্তাটি পাঠিয়েছিলো তার কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া না গেলেও সম্পূর্ণ অনুমানের উপর নির্ভর করে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে প্রথম চারদিন অজ্ঞাতবাসে রাখে এবং পরে তিন দফা রিমান্ডে নিয়ে তার ওপর প্রচণ্ড শারীরিক-মানসিক নির্যাতন চালায়। দরিদ্র বাবা-মায়ের সন্তান পার্থ সাহা একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। অত্যন্ত কষ্ট করে উচ্চ শিক্ষা শেষে যখন চাকরি খুঁজছিলেন, তখনই তার ওপর নেমে আসে জোট সরকারের ভয়াবহ থাবা।

শুধু ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নয়। ২০০১ সালে নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম তিন মাসে এমন একটি দিন ছিলো না যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি। শারীরিক নির্যাতন, লুণ্ঠন, ঘরবাড়িতে আগুন লাগানো, জোরপূর্বক চাঁদা আদায় এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বেশি। ভোলাসহ বিভিন্ন স্থানে নারী নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছিলো। সিরাজগঞ্জে কিশোরী পূর্ণিমাকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিলো। অথচ তার বাবা-মা নির্বাচনে ধানের শীষেই ভোট দিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন অনেকেই। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সংখ্যালঘু পরিবারের ১১ জন সদস্যকে পিটিয়ে মারা হয়েছিলো। বর্ষীয়ান কলেজ অধ্যক্ষ গোপালকৃষ্ণ মহুরী, বৌদ্ধ ভিক্ষু জ্ঞানজ্যোতি মহাথেরো, হিন্দু পুরোহিত মদনমোহন গোস্বামীকে হত্যা করা হয়েছিলো, যদিও তাদের কারোরই রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছিলো না। দেশজুড়ে শত শত সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলো চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্র আটক এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় একযোগে জঙ্গিদের বোমা হামলার ঘটনা।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকারের সমালোচনায় অত্যন্ত মুখর ছিলেন। তিনি এই সরকারের কোনো কিছুই ভালো দেখেননি। একজন রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে সরকারের ভুলত্রুটির সমালোচনা করার অধিকার তার আছে। কিন্তু তিনি যখন ঢালাওভাবে সরকারের সমালোচনা করেন তখন বিনীতভাবে জানতে ইচ্ছে হয়, তিনি কি আয়নায় নিজের মুখ দেখেন না? তার শাসনামলে দেশ কেমন চলছিলো সেসব কি তার মনে আছে? তিনি কি একবার ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সংবাদপত্রগুলোর পাতায় চোখ বুলিয়ে দেখবেন? ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ অসংখ্য বোমা হামলার ঘটনা এবং দেশজুড়ে জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থানের ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়লে তার তো বর্তমান সরকারের লাগামহীন সমালোচনা করার কথা নয়। রাজনীতিতে মতভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক। সব শিয়ালের এক ‘রার’ মতো সব রাজনৈতিক দলের এক ‘রা’ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নানা মতের, নানা পথের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করবে… এটাই গণতন্ত্রের রীতি। কিন্তু মত ও পথের ভিন্নতার জন্য সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে পরিবেশ নষ্ট হওয়াটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অথচ আমাদের দেশের রাজনীতিতে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব অত্যন্ত প্রকটভাবেই লক্ষ্য করা যায়। রাজনীতিবিদদের অসহিষ্ণু মনোভাবের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ক্রমাগত বাড়ছে। বেগম জিয়া কিংবা বিএনপির অন্য নেতারা নিজেদের শাসনামলের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য একবারও দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ না করে বর্তমান সরকার আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কিংবা আইনের শাসনের অভাব নিয়ে কথা বলেন তখন দেশের মানুষ সে বক্তব্য খুব ভালোভাবে গ্রহণ করে বলে মনে হয় না। সমালোচনা যদি বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর না হয় তাহলে সেটা মানুষের কাছেও বিশ্বাসযোগ্য হয় না।

সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় বিএনপি যদি আন্তরিকভাবেই অংশ নিতে চায় তাহলে বৃহত্তর ঐক্যের আগে বিএনপিকে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পরিচিত জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি যতোদিন তাদের গাঁটবন্ধন ছিন্ন না করবে ততোদিন বিএনপিকে আস্থায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী কেউ ঐক্য করতে আসবে বলে মনে হয় না। আর আওয়ামী লীগের জন্য বিএনপির কাছাকাছি যাওয়া আরও কঠিন। কারণ বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং তার পরবর্তী সময়কালে বিএনপি যে রাজনীতি অনুসরণ করেছে তা আওয়ামী লীগকে কেবল দূরেই ঠেলেছে। সবশেষে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকতে দেশে বোমাবাজি-সন্ত্রাস-সহিংসতাসহ যতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটেছে তার কোনোটার দায়ই তারা এড়াতে পারবে না।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত