প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাকশাল গঠনের ব্যাপারে সিপিবির সমর্থনের কথা ঝেড়ে অস্বীকার করা সত্যের অপলাপ ছাড়া কিছু নয়

মোরশেদ শফিউল হাসান  : প্রকৃত ঘটনা হলো, বাকশাল গঠনপর্বে সিপিবি নেতারা উপর থেকে একেবারে নিচের স্তর পর্যন্ত তাদের কর্মী-সমর্থকদের একথা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, দেশি-বিদেশি শত্রুদের মোকাবেলায়, একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাটা আসলে তাদেরই এজে-া, তারা বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে তা বাস্তবায়ন করিয়ে নিচ্ছেন। কর্মী-সদস্যদের এ ব্যাপারে মূল দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করতে এ-সময় নানা সভা-বৈঠকেরও আয়োজন করেছিলেন তারা। সেসব সভায় আসন্ন পরিবর্তনের পক্ষে তাদের বক্তব্য-ভাষণ ছিলো খুবই আশা-উদ্দীপনায় ভরা। ওই সময়টিতে সক্রিয় রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে থাকার পরও ডাকসু কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতিকর্মীদের এক সভায় উপস্থিত থাকার সুযোগ আমার হয়েছিলো। তাতে ছাত্র ইউনিয়ন ও সংস্কৃতি সংসদের সঙ্গে যুক্ত এবং ওই ধারাটির প্রতি সহানুভূতিশীল তরুণরাই কেবল উপস্থিত ছিলেন। আমার পরিষ্কার মনে আছে, সেদিনের সভায় সোভিয়েত কমসোমল ধরনের যুব মোর্চা গঠনের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছিলো। নতুন ব্যবস্থায় যুব বেতার গঠিত হলে তা পরিচালনার ব্যাপারেও ছাত্র ইউনিয়ন ধারার কর্মীদেরই যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে, সেটাও বলা হয়েছিলো। আজকের সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তখন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এবং ডাকসুর সহসভাপতি।

সত্য বটে, বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষিত হওয়ার পর সিপিবির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে তা খানিকটা হতাশার সঞ্চার করে। যখন দেখা গেলো একমাত্র ছাত্র ফ্রন্টে (জাতীয় ছাত্র লীগ) আহ্বায়ক শেখ শহীদের সঙ্গে যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মনোনয়নের ব্যাপারটি বাদ দিলে, কী বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কী কোনো অঙ্গসংগঠনে সিপিবি ধারার কেউ কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ পাননি। খোদ মনি সিংহকে রাখা হয়েছে কৃষক ফ্রন্টের (জাতীয় কৃষক লীগ) কেন্দ্রীয় কমিটিতে, তাও সদস্য হিসেবে। সিপিবি ও ন্যাপ (মোজাফফর) নেতারা এ-সময় নিজেদের হতাশা কাটাতে ও কর্মীদের মনোবল চাঙা রাখতে সত্য-মিথ্যা নানা প্রচার-প্রচারণার আশ্রয় নেন। যেমন ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার পর সিপিবি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে একটা কথা চালু হয় যে, ওইদিন (১৫ আগস্ট) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে বঙ্গবন্ধু (বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে?) বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটিতে শেখ ফজলুল হক মণি ও আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে আরেকজন আহবায়ক বা যুগ্মআহ্বায়ক হিসেবে মোহাম্মদ ফরহাদের নাম ঘোষণা করতেন। যদিও এই প্রচার বা ধারণার বাস্তব ভিত্তি কী ছিলো, কিংবা আদৌ কিছু ছিলো কিনা, আজও জানা যায়নি। হয়তো কোনোদিনই জানা যাবে না।

আজ যদি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কিংবা তার মতো সিপিবির আর কোনো নেতা বাকশাল গঠনের ব্যাপারে তাদের সায়-সমর্থনের কথা ঝেড়ে অস্বীকার করেন, উপরন্তু বলেন যে তারা বরং এর বিরোধী ছিলেন, তবে তার চেয়ে বড় সত্যের অপলাপ বোধ হয় আর কিছুই হতে পারে না। এটাও কি তাদের একটা ‘কৌশল’? কমিউনিস্ট নৈতিকতায় রাজনীতির স্বার্থে মিথ্যাচার যদি বা অনুমোদিত হয়ও, তবু এর মাধ্যমে তারা সে-সময়কার তাদের রাজনীতির হাজার হাজার অনুসারী ও দরদীদের (যারা আজও জীবিত আছেন এবং যাদের স্মৃতিশক্তি এখনও লোপ পায়নি) সামনে নিজেদের কী ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করছেন, একবার ভেবে দেখবেন কি? আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীদের কাছেও কি তাদের এই বক্তব্য বা ব্যাখ্যা কিছুমাত্র গ্রহণযোগ্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে?

তবে হ্যাঁ, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কর্মসূচি গ্রহণÑ প্রচার-প্রচারণা ও সভা-মিছিল সংগঠনে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ ছাত্র ইউনিয়ন ধারার নেতৃবৃন্দ যে অগ্রণী ও সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন (নিশ্চয়ই তার পেছনে সিপিবি ও মোজাফফর ন্যাপ নেতৃবৃন্দের নির্দেশনা কাজ করেছিল), তার জন্য ইতিহাস তাদেরকে স্মরণ করবে। বলা বাহুল্য, সেদিন পরিস্থিতি ছিলো তাদের প্রবল প্রতিকূলে। দেশে তখন সামরিক শাসন, যদিও আওয়ামী-বাকশাল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে সক্রিয়। আওয়ামী ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ অনেকেই হয় মোশতাকের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন, নয়তো গা ঢাকা দিয়েছেন বা পলাতক জীবন বেছে নিয়েছেন। সে-সময় দেশের ভেতরে থেকে এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে মূল ভূমিকা সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতা-কর্মীরাই পালন করেছিলেন। জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের পর রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তনের আগে পর্যন্ত তাদের এই ভূমিকা জারি ছিলো। একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে আমিও তাদের সেদিনকার সে লড়াই-সংগ্রামের একজন গর্বিত অংশীদার। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত