প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানা, এতিম লুটছে এতিমের খানা

সালেহ্ বিপ্লব : তিনবেলা খাবারের মেন্যু তৈরি করেন খানাঘর মাস্টার। ছাত্র, ছাত্রী ও স্টাফ মেস, তিন ক্যাটাগরিতে কতোজন খাবেন, তারও সংখ্যা নির্ধারণ করেন তিনি। কিন্তু গত দু’বছর ধরে চার ক্যাটাগরিতে খাবারের বরাদ্দপত্র বানাচ্ছেন তিনি। চার নাম্বার ক্যাটাগরিতে ১৫ থেকে ১৭ জনের খাবার সরবরাহ হয় এতিমখানার ফান্ড থেকে, কিন্তু এই ১৫ জনের খানাপিনার কথা এতিমখানা কর্তৃপক্ষ জানে না! সুপারিনটেন্ডেন্ট নেই, চলতি দায়িত্বে আছেন সিনিয়র শিক্ষক নূরুল ইসলাম।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত সুপার বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তিনবেলা খাবার বরাদ্দ হয়। আর স্টাফদের মধ্যে যারা ব্যাচেলর, তাদের জন্য মেসে খাবার দেয়া হয়, মাসশেষে বিল কেটে নেয়া হয় বেতন থেকে। এর বাইরে আর কাউকে খাওয়ানোর এখতিয়ার বা সুযোগ নেই। যখন তাকে দৈনিক খাবারের বরাদ্দপত্রের কপি দেখানো হলো, তিনি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। বললেন, এ ব্যাপারটি যাচাই করতে হলে খায়ের সাহেবকে লাগবে। তিনি খানাঘর মাস্টারের দায়িত্বে আছেন। খায়ের সাহেব চেয়ারে নেই, খোঁজ করতেই একটু পরে দেখা মিললো, চেয়ারে এসে বসলেন।

আবুল খায়েরও এক কথায় বললেন, ছাত্র, ছাত্রী ও ব্যাচেলর স্টাফ ছাড়া আর কারো জন্য খাবার বরাদ্দ হয় না। কোনো সুযোগ নেই। আরো দু’বার প্রশ্ন করা হলে একই জবাব তার। এরপর খাবার বরাদ্দের কাগজের কপি দেখালে তিনি একদম চুপ হয়ে যান। মুখে কোনো কথাই ফুটছিলো না। এভাবেই কাটে বেশ কয়েক মিনিট। এরপর তিনি বলেন, নতুন ছাত্রছাত্রী আসে, তাদের অভিভাবকরা আসেন। তাদের জন্য এই বাড়তি খাবারটা রেডি রাখা হয়।

খানাঘর মাস্টারের এই বক্তব্য যাচাই করা হলো। জানা গেলো, নতুন ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের খাওয়ানোর যে কথা তিনি বলেছেন, তা সত্য নয়। সত্য এটাই, এতিমখানার ভিতরে বাইরের লোক থাকে ১৫ জন। তাদের খাওয়াদাওয়া হয় এতিমদের টাকায়।
এই ১৫ জন কারা? স্টাফদের কেউ এ নিয়ে মুখ খোলেন না। সবার মধ্যেই যেনো একটা আতংক কাজ করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, শুধু তিন বেলা খাবার নয়, ওই ১৫ জনের থাকার ব্যবস্থাও এতিমখানার ভেতরে। পুরানো টিভি রুমে তারা থাকে। কী তাদের পরিচয়?

অনুসন্ধানে জানা গেলো, ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর এতিমখানার প্রশাসক ও ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মজিবর রহমান ৬১ জনকে এতিমখানা থেকে রিলিজ দেন। এর মধ্যে ৩৮ জন ছাত্র ও ২৩ জন ছাত্রী। তাদের বয়স ১৮ হয়ে যাওয়ায় নিয়মানুযায়ী এতিমখানায় থাকার আর সুযোগ ছিলো না। কিন্তু ২ ্বছর আগে এতিমখানায় থাকার বৈধতা হারানো ওই ৩৮ ছাত্রের মধ্যে ১৫ জন এতিমখানা ছেড়ে যায়নি। তারা টিভিরুমে থাকে, এতিমদের বরাদ্দ খাবারে তাদের দিন চলে। আর এই ১৫ জনের মধ্যে দু’একজন এমনও আছে, যারা এতিমখানা থেকেই লাখ লাখ টাকা কামানোর পথ করে নিয়েছে। টাকার সঙ্গে সঙ্গে দাপটও বেড়েছে তাদের।

ভারপ্রাপ্ত সুপারকে প্রশ্ন করা হলো, এমন অব্যবস্থাপনা চলে কী করে? তার কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য এ বিষয়ে পাওয়া গেলো না। তবে এটা জানা গেলো, অনেক দিন ধরে এতিমখানায় সুপারিনটেন্ডেন্ট নেই। পরিচালনা কমিটি নেই। সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশাসক বানিয়ে এতিমখানার কাজ চালাচ্ছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সার্বক্ষণিক ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ না থাকায় স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানায় সব দিক দিয়ে চরম বিশৃংখলা বিরাজ করছে।

এতিমখানায় বিশৃংখলা-অনিয়মের কথা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কানেও পৌঁছেছে। কিছুদিন আগে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (কার্যক্রম) বেগম বদরুল লাইলীকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি এতিমখানার পরিচালনা পরিষদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। সরকারের এই পদক্ষেপে এতিমখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খুশি, যদিও অদৃশ্য একটা ভয়ে মুখে প্রকাশ করছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী জানান, তারা আশা করছেন, মন্ত্রণালয়ের ওই কমিটি পরিচালনা পরিষদের নির্বাচনের পাশাপাশি এতিমখানাকে অবৈধ বাসিন্দাদের কবল থেকে মুক্ত করারও পদক্ষেপ নেবে। কমিটির প্রধান বেগম বদরুল লাইলী হজ পালন করে দেশে ফিরে কী পদক্ষেপ নেন, তা দেখার অপেক্ষায় আশায় বুক বেঁধেছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত