প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের রাজনীতি, শিক্ষার্থীরা গণহারে ফেল

মুহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন : সরকার বিরোধী রাজনীতি করার জন্য এবং সরকার দলীয় রাজনীতি করলেও প্রশাসনের নীতিনির্ধারণীতে আসার জন্য শিক্ষার্থীদের গণহারে অকৃতকার্য করানো হচ্ছে এমন মন্তব্য করেছেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের আহ্বায়ক আ ক ম জামাল উদ্দীন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যাতে বাধ্য হয়ে আন্দোলনে নামে, মিছিলে নামে, ঢাকাকে অস্থিতিশীল করে তাই কিছু শিক্ষক এটি করছেন। ২২ জুলাই, সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অধিভুক্তি বাতিলের আন্দোলন চলাকালীন সাংবাদিকদের তিনি এই মন্তব্য করেন।

২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে ৫ম দিনের মতো আন্দোলন করেছে ঢাবি শিক্ষার্থীরা। গত তিনদিন অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করলেও ২১ ও ২২ জুলাই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনের গেটে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন করে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস পরীক্ষা সব বন্ধ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সোমবার ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ, সমাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, বাণিজ্য অনুষদ, রেজিষ্টার বিল্ডিং, কাজী মোতাহার হোসেন ভবন, মোকাররম ভবন, কার্জন হল, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটসহ সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা লাগিয়ে দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। তালা লাগনোর পর তা যাতে কেউ খুলতে না পারে সে জন্য তালায় চাবি প্রবেশের জায়গায় প্রথমে মাটি দিয়ে তা সুপারগুলু দিয়ে আটকিয়ে দেয়া হয়েছে। আরও দেখা গেছে তালা কেউ খুলে কি না তা দেখার জন্য গেইটের সামনে কয়েকজন করে পাহারায় রয়েছে শিক্ষার্থীরা। তালা বদ্ধ করার পাশাপাশি গেটে ফেস্টুন টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে, ‘লাগাও তালা, বাঁচাও ঢাবি’; ঝুলছে তালা ঝুলবে, আন্দোলন চলবে।

এরপর সকাল ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা একটি মিছিল বের করে এবং পরে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয়। আন্দোলনের এক পর্যায়ে সকাল ১০টার দিকে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের আহ্বায়ক সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড.আ ক ম জামাল উদ্দিন ও ঢাবি শাখা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল তাদের কয়েকজন নেতা-কর্মীসহ এসে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বাঁধা দেন। এতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন।

সরেজমিনে দেখা যায়, আমিনুল ইসলাম বুলবুল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হুমকি দিলে তারা উত্তেজিত হয়ে পাল্টা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এসময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা- ‘নির্লজ্জ প্রশাসন, ধিক্কার-ধিক্কার’, ‘অ্যাকশন-অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘ভুয়া-ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন।

অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন সাংবাদিকদেরকে বলেন, ‘বছরে দু’বার অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। আগামী ২৮ তারিখ একাডেমিক কাউন্সিলের সভা রয়েছে। তার আগেই ছাত্রদের রেজাল্ট তৈরি করতে হবে এবং ওই সভায় ছাত্রদের ডিগ্রী পাস হবে। যদি আজ পরীক্ষা না নেওয়া হয় এবং তবে ২৮ তারিখের আগে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। পাশাপাশি অ্যাকাডেমিক সভাতেও ওই ফল অনুমোদন করানো সম্ভব হবে না। স্বভাবতই পরবর্তী অ্যাকাডেমিক সভার জন্য অপেক্ষা করতে হবে এবং ছাত্ররা এক বছর পিছিয়ে যাবে।’

তালা খুলতে না পেরে অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীনকে সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দুপুর ১টার দিকেও তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে সাংবাদিকদের কথা হয় তার সাথে। দাঁড়িয়ে থাকার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন,‘আমি দেখছি কোন বয়সের, কোন ইয়ারের, কোন ধরণের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে এবং কি ধরণের ভাষা ব্যবহার করছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি এখন হয়তো বাসায় ঘুমিয়ে থাকতে পারতাম। তার চেয়ে বরং মাঠ পর্যায়ের একটি অভিজ্ঞতা হচ্ছে।’

শিক্ষার্থীরা বলেছে আপনি সাত কলেজের অধিভুক্তিতে সমর্থন দিয়েছেন। আপনার ডিপার্টমেন্টেও তো সাত কলেজের অনেক ডিপার্টমেন্ট আছে আপনাদের উপর প্রেশার তৈরি হচ্ছে। সাংবাদিকদের এই কথায় তিনি বলেন, ‘ দেখেন আমরা সেমিষ্টার সিস্টেম চালু হওয়ার পর থেকে খুবই নিয়মিত। আমরা রাত নয়টা পর্যন্ত কাজ করি। তারপর রিসার্সের কাজ করি। সাত কলেজ অধিভুক্তি হওয়ার পরে দুজন শিক্ষক আরও নিয়োগ দিয়েছে। আরও চারজন নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। রেজিষ্ট্রার বিল্ডিং এ তাদের সেকশনটা আলাদা করে দেয়া হয়েছে। দু এক বছর পরে আলাদা ভবন ও হবে।’

তিনি বলেন, ‘আপনার মাথা ব্যথা হতে পারে তার মানে তো আপনি মাথা কেটে ফেলতে পারেন না। আমরা শুধু সাত কলেজ না এর আগেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার আগে দুই আড়াইশো কলেজের রেজাল্ট কিন্তু আমরাই দিয়েছি। আমরাই সবকিছু করেছি। তখন প্রিলিমিনারি, বিএফআস এগুলো ছিল, মাষ্টার্স ২০-২৫ টা কলেজে ছিল সেগুলো আমরা নিছি। তখন কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু আপনি যদি কান পাতেন আপনি দেখেন অন্য ধরণের বিভিন্ন ধরণের পলিটিকস এখানে আছে।’

সম্প্রতি গণিত বিভাগের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায় ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে গণিত বিভাগে ৭০, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ৩৮ জন, মৃত্তিকা বিভাগে ৩৪ জন অকৃতকার্য করেছে। ওদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের মধ্যে বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী মনিজা আক্তার মিতু তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে অভিযোগ তার পরিবারের। ইডেন মহিলা কলেজের দর্শন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ১১৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে মাত্র ১ জন।

শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হওয়ার কারণ সম্পর্কে অধ্যাপক জামাল বলেন,‘ একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে সাত কলেজ অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকে আমার বিভাগে বিভিন্ন কমিটিতে আমি আছি। সেজন্য আমার নজরে আসে এখানে এই কলেজগুলো যখন দেয়া হয় তখন পক্ষে বিপক্ষে অনেক লোক ছিল। জাতীয় রাজনীতিতে একটি গ্রুপ এখানে কাজ করতেছে। ঐ জাতীয় রাজনীতির আদর্শিক ধারার যে শিক্ষকরা আছে সেই শিক্ষকদের হাতে যে খাতাগুলো যায় ধরেন আমাদের তো শিক্ষকদেরও খাতা দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও খাতা দেখে। এই দুই গ্রুপের মধ্যে যেই শিক্ষকরা ধরেন সরকারের এন্টি আপনারা দেখেন। তারা ব্যাপক সংখ্যক ছাত্রদের ফেল মার্ক করায়। এই কারণে ফেইল করলে ছাত্ররা আন্দোলন করবে। ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল হবে। ঢাকার পরিবেশকে অস্থিতিশীল রাখতে। কমার্স ও সাইন্সের ব্যাপক সংখ্যক প্রচুর সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল(অকৃতকার্য) করছে। মানে যদি ধরেন একটি ছেলে চার বছর পড়ার পরে আপনার ২৫% ফেল করে একটি ডিপার্টমেন্টে তখন তারা তো আন্দোলন করবেই।’

তিনি বলেন,‘ঐ যে ধুর্ত টিচার রা কমিটির ভিতর থাকে, তারা পরীক্ষক তারা ব্যাপক সংখ্যায় আদর্শিক সাইট থেকে সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিপদে ফেলার জন্য,তার লো মার্কিং করে। আমি যখন পরীক্ষক কমিটিতে ছিলাম তখন এরকম একটা আপনার ৬০০ খাতার ৪৫০-৫০০ ফেল করেছে। তখন অটোমেটিকেলি কন্ট্রোলার কাউন্সিলে নোট লিখেছি। তখন ঐ পরীক্ষার ফলাফল বাতিল করে আমি আবার নতুন পরীক্ষক ঠিক করেছি। তখন আপনার ৯০ পার্সেন্ট পাশ করেছে। তারপরে আমি তখন ফলাফল ঘোষণা দিয়েছি। সবাই তো এইটা করে না। এগুলো আলোচনা করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। শিক্ষকরা পরীক্ষকরা কত নিকৃষ্টমানের হতে পারে ষড়যন্ত্র করার জন্য, সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য, ছাত্রদের জীবন নিয়ে খেলতে পারে সেটা কিন্তু সেখানে আছে আপনি খোঁজ নেন। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় যে ফলাফল গুলো হইছে আপনারা রিভিউ করেন তাহলেই দেখতে পাবেন ঐ শিক্ষক কারা? কোন আদর্শের শিক্ষক? আপনারা দেখেন দেখলেই কিন্তু বেরিয়ে আসবে যে কেন এতো সংখ্যক ছাত্র ফেইল করলো। কারা এক্সামিনার ছিল সেখানে। শিক্ষকরা ইচ্ছাকৃত ভাবে ফেল করায়।’

শুধু সরকারি দল ছাড়া অন্য দল থেকে যারা রাজনীতি করেন শুধু সেই শিক্ষকরা কি এটি করেন? অধ্যাপক জামাল উদ্দিন এই প্রশ্নের জবাবে বলেন,‘ এন্টি গভর্ণমেন্ট হইতে পারে। আবার গভর্ণমেন্টের মধ্যে ধরেন যারা এডমিনেষ্ট্রেশনে আসতে চায়। এতো ইনহিউম্যান কাজ, এতো অমানবিক কাজ এটি হতে পারে না। ’

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা যারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেন আপনারা রিভিউ করেন কোন কোর্সগুলোতে ফেল করলো ছাত্ররা? কেন ফেল করলো এবং সেই শিক্ষকরা কারা? আমরা একটু তাদের নাম চাই, দেখতে চাই। ’

ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘অতিদ্রæত এ বিষয় সমাধান হবে। ডাকসু নেতারা শিক্ষার্থীদের সাথে বসবেন।’

অধ্যাপক ড. আ. ক. ম জামাল উদ্দীনের বক্তব্যের কথা জানালে অধ্যাপক ড. এ . এস এম মাকসুদ কামাল বলেন,‘আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের(ডাকসু) ভিপি নুরুল হক নুর বলেন,‘অধিভুক্তি বাতিল চাই শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন যৌক্তিক। আমি এটিকে সমর্থন করি। আমরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যেতে বলেছি। তবে এটি তাদের ইচ্ছা তারা ক্লাসে ফিরবে কি না। যেহেতু উপাচার্য স্যার দেশে নেই, চীনে আছেন। তাই স্যার দেশে ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কিনা এটিও শিক্ষার্থীদের ইচ্ছা।’

অধ্যাপক জামালের বক্তব্যের বিষয়ে নুর বলেন,‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সর্বজন শ্রদ্ধার পাত্র। তার এ বক্তব্য আমি শিক্ষকদের সম্মানহানী বলে মনে করি এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেয়ার একটি প্রয়াস।’

তিনি বলেন,‘এর আগেও জামাল স্যারের অনেক বিতর্কিত কার্যকলাপ আমরা দেখেছি। আমি তার বক্তব্যকে সমর্থন করি না।’ সম্পাদনা : রাশেদ/ সাজিয়া

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত