প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এজলাস, বাড়ি, রাস্তা সবই কি অনিরাপদ হয়ে উঠছে?

কাকন রেজা : প্রকাশ্যে বিচারকার্য চলাকালীন এজলাসে খুন হলেন এক আসামি। পার্থিব নিরাপত্তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় এমন ঘটনা ঘটলো। রাতের অন্ধকারে গোপন খুন, তারপর রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে খুন, বাড়িতে গিয়ে খুন, এরপর বিশ্বজিৎ পরে রিফাতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা। সর্বশেষ সংযোজন এজলাসে হত্যাকা-। ভেবে দেখেছেন কি খুনের ট্রেন্ডটা। প্রশ্ন করুন তো আপনি কোথায় নিরাপদ? দিনে-রাতের চলাচলে, বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে, রাস্তায়, বাড়িতে এমনকি এজলাসেও? না কোথাও আপনার নিরাপত্তা নেই। যেকোনো জায়গায় আপনি আক্রান্ত হতে পারেন।

কি হবে আক্রান্ত হলে, একটু হাই-প্রোফাইলড হলে দু’দিন হাউকাউ, আর না হলে একদিনেই চুপ। কথা যদি খুব বেশি হয় তাহলে প্রতিপক্ষ আপনার দোষ খুঁজতে বের হবে, কেন আপনি আক্রান্ত হলেন। যেমন : রিফাতের ঘটনাই ধরুন। নিজের মৃত্যুর দায় যেন রিফাতেরই, কেন সে মিন্নিকে বিয়ে করতে গেলো। প্রভাবশালীদের প্রার্থিতাকে কেন নিজের ঘরে তুললো। তাই তো মিন্নিকে বিয়ে না করলে তো রিফাত মারা যেতো না। নয়ন বন্ড বা ফারাজী ব্রাদার্স কারও কোনো দোষ নেই। দোষ রিফাতের, দোষ মিন্নির। রিফাত আর মিন্নির বিয়েটা না হলেই হতো। তাহলেই তো বন্ড আর ফারাজীদের রিফাতকে হত্যা করতে হয় না! অবিশ্বাস্য হলেও এমন যুক্তিও মানুষ এখন নেয়, খায়।

এজলাসে হত্যাকা- নিয়ে একজন আইনজীবী আদালতের নিরাপত্তার প্রশ্নে রিট করেছেন। সবাই শুধু নিজেদের নিরাপত্তা খোঁজেন। রিট করা উচিত তো সারাদেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। আজ এজলাস আক্রান্ত তাই ওই আইনজীবী রিট করেছেন। কিন্তু সারাদেশে এজলাসের বাইরে এমন আক্রান্তের সংখ্যা অসংখ্য, যাদের অনেকেই হয়তো আদালতের দ্বারস্থ হননি, হবার ক্ষমতা নেই। হয় আদালতের খরচ চালানোর সামর্থ্য নেই, নয়তো প্রভাবশালীদের ভয়ে নীরবে চোখ মুছছেন। কই, এমন কারও নিরাপত্তা চেয়ে তো কোনো রিট দেখেনি।  কোনটার পাবলিক ডিমান্ড বেশি, কোনটায় প্রচার পাওয়া যাবে, এমন বেছে বেছে যদি রিট বা অন্য কোনো কার্যক্রম করা হয় তবেই মুশকিল। এখানে মানুষের চেয়ে নিজের প্রচারটাই বেশি থাকে। যে কাজে ‘আমি’ শব্দটি এসে যায়, যে অভিযাত্রায় ‘আমিত্ব’ ভর করে তা মূলত অর্থহীন এবং প্রবঞ্চনার প্রপঞ্চ মাত্র। সুতরাং কাজটা করতে হবে মানবতার কথা চিন্তা করে, মানুষের কথা মাথায় রেখে। আর নিজেকে ভাবতে হবে সেই আক্রান্তদের একজন। তাহলেই হয়তো রিট বলেন বা অন্য কোনো কার্যক্রম, কাজে আসবে। কিন্তু এমনটা হচ্ছে কি? হলে তো দুধ নিয়ে গবেষণা যিনি করলেন অধ্যাপক ফারুক, তার পক্ষে লোক এতো কম কেন? তিনি নিজ স্বার্থে কোনো কিছু করেননি, সাধারণ মানুষ এবং নিজেকে সেই সাধারণ মানুষের একজন ধরেই কাজ করেছেন। নিজ এবং অন্যের স্বাস্থ্যকে তো তিনি আলাদা করে দেখেননি। সবার কথা ভেবেই তিনি চ্যালেঞ্জটা মাথায় নিয়েছেন। তারপরও তাকে এতোটা ভোগান্তি সইতে হচ্ছে।   অবস্থাটা এমনি দাঁড়িয়েছে, সত্যিকার কাজ করতে যাবেন কপালে অবধারিত ভোগান্তি। লোক দেখানো কাজ করতে যাবেন, দেখবেন বাহবা পাচ্ছেন। আর নিজের যদি কোনো পদ-পদবি থাকে তাহলে তো পেছনে রীতিমতো স্তাবককুল জড়ো হয়ে যাবে। ভেসে যাবেন স্তুতিতে। চোখ মেলে তাকান, এমন উদাহরণ অনেকই দৃশ্যমান হবে।

এক সংসদ সদস্য পার্কে গিয়ে বেড়াতে যাওয়া বাচ্চাদের ধরলেন। ভালো কথা অভিভাবক হতে গিয়েছেন, বাচ্চাদের সতর্ক করতে গিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ নিয়ে কেন? তা না হয় গেলেন, তারপরও কি আত্মপ্রচারের খুব দরকার ছিলো! ওই বাচ্চাদের ভিডিও ক্লিপ কি ফেসবুকে ছড়ানোটা ছিলো অতি প্রয়োজনীয়! বাচ্চাগুলো কি কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলো? তাহলে তাদের ছবি কেন ‘পাবলিক’ করে দেয়া হবে! এটা কি আইনের ব্যত্যয় নয়? বাচ্চারা সামাজিকভাবে যে হেনস্তা হলো সেই বিচার কে করবে? যাক গে, মাঝে মধ্যেই উপদেশ শুনি, ‘কি দরকার নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর’। হয়তো দরকার নেই, হয়তো আছে। তবে এ কথা সত্যি খ্যাপা মোষ না তাড়ালে নিজেদেরই আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। আমি বুঝি, যেহেতু আমিও আক্রান্ত হয়েছি। আর সে অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, বালিতে মুখ গুঁজে উটপাখি হয়ে লাভ নেই। ঝড় আপনাকে খুঁজে নেবেই। বালি থেকে মুখ তুলে ঘুরে দাঁড়ান, ঝড়ের চোখে ঠোঁকর বসান, ঝড়ের সামনে বুক চিতিয়ে দিন। দেখবেন বালিঝড় তো, এমনিতেই ভড়কে গেছে। লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত