প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাসনের ২৫ বছর পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশে ফেরার আর্তি তসলিমা নাসরিনের!

প্রথাবিরোধী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের  চিঠি:  আর ক’দিন পর আমার নির্বাসনের ২৫ বছর পূর্ণ হবে। ২৫ বছর! আপনি কি কল্পনা করতে পারেন এই ২৫ বছর কতটা দুঃসহ? আপনি আপনার পরিবারের সকলকে হারিয়েছেন, বিশ্বসুদ্ধ লোক সে কারণে দুঃখ করে, চোখের জল ফেলে আজও। আমিও এই দীর্ঘ নির্বাসনে আমার বাবা মা ভাই দাদা কাকা মামা খালা সবাইকে হারিয়েছি, যাদের কাছে যাওয়ার আমার কোনও অধিকার ছিল না গত ২৫ বছর। আজও নেই আমার নিজের দেশে ফেরার অধিকার। আমার এই বেদনার কথা বিশ্বের মানুষ জানে না, আমার জন্য তাই কেউ দুঃখও করে না, চোখের জলও ফেলে না।

অচেনা মানুষ হিসেবে এই চিঠি আপনাকে লিখছি না। আমাকে চেনেন আপনি। দেশে থাকাকালীন বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছিল আপনার সঙ্গে। তখন, নব্বই-একানব্বই সালে আপনাকে শুভাকাঙ্খী হিসেবেই আমি বিশ্বাস করতাম। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে মৌলবাদীদের মিছিল হওয়া, আমার মাথার দাম ঘোষণা হওয়া, লোকের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করেছি এই অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে খালেদা-সরকারের মামলা করা, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া, দেশ ত্যাগ করতে আমাকে বাধ্য করার পর আমি অপেক্ষা করতাম আপনি কবে প্রধানমন্ত্রী হবেন।

আমি ভাবতাম আপনি প্রধানমন্ত্রী হলেই আমি দেশে ফিরতে পারবো। ঠিকই একদিন আপনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। আমি অধীর আগ্রহে আপনার দিকে তাকিয়ে আছি, কিন্তু দেশে তো আমাকে ঢুকতে দিলেনই না, উল্টে ভয়ংকর একটি কাজ করলেন। নামে আমার আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘আমার মেয়েবেলা’ নিষিদ্ধ করলেন। নিষিদ্ধ করার কারণ, আপনি জানালেন, বইটি অশ্লীল। আমার মেয়েবেলা আমার শৈশবের কাহিনী। এটিকে আপনি ছাড়া আর কেউ অশ্লীল বলেনি। বিদেশের অনেক ভাষায় বইটি ছাপা হয়েছে। গ্রন্থ-সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে, পাঠকপ্রিয়তাও প্রচুর পেয়েছে, এমনকী বইটি বাংলা ভাষার অন্যতম একটি সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছে। বইটি আজও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ।

সাধারণত যেসব সরকার মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তারা বই নিষিদ্ধ করে। তখন বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মানুষেরা সেইসব সরকারের বই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলা করে। গণতান্ত্রিক দেশে মানুষ তাই করে। কিন্তু বাংলাদেশের গণতন্ত্র এমনই অদ্ভুত যে, আমার বই থেকে নিষিদ্ধকরণ তুলে নেওয়ার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস কারওর নেই। নাৎসিরা যখন বই পোড়াতো, তাদের বই পোড়ানোয় কেউ বাধা দিতে পারতো না। নাৎসি সরকারের বিরুদ্ধে কারও বুকের পাটা ছিল না মামলা করে। কিন্তু আপনি তো নাৎসি সরকার নন, কেন মানুষ আপনার সরকারকে ভয় পায়!

আপনি সম্ভবত বই নিষিদ্ধ করাটা শিখেছেন খালেদা জিয়ার কাছে। আপনি বই নিষিদ্ধ করার আগে খালেদা জিয়া আমার ‘লজ্জা’ বইটি নিষিদ্ধ করেছিলেন। খালেদা জিয়ার মতো আপনিও আমার বই পড়ার অধিকার থেকে বাংলাদেশের পাঠকদের বঞ্চিত করছেন। আপনি ‘আমার মেয়েবেলা’ বইটি নিষিদ্ধ করার পর খালেদা জিয়াও ক্ষমতায় এসে পরম উৎসাহে আমার আত্মজীবনী সিরিজের অনেকগুলো বই পর পর নিষিদ্ধ করলেন।

লক্ষ করার বিষয় যে, অন্য কারও বই নিষিদ্ধ করলে সরকারকে সামান্য হলেও ঝামেলা পোহাতে হয়। অন্যরা মামলা করে, হাইকোর্ট থেকে বইকে মুক্ত করিয়ে আনে। কিন্তু আমার বই নিষিদ্ধ করলে আপনাদের কোনও ঝামেলা পোহাতে হয় না। এই একটি মানুষ যাকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা যায়, যাকে অকারণে অপবাদ দেওয়া যায়, যাকে যত খুশি অসম্মান করা যায়, জঘন্য অপমান করা যায়—নিশ্চিত, কেউ টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করবে না।

আমার বেলায় দেশের অমৌলবাদীরাও মুহূর্তে মৌলবাদী হয়ে ওঠে। আমাকে কখনও আর দেশে ফিরতে না দিলেও, আপনি ভালো জানেন, খালেদা জিয়াও জানেন, আপনাদের কোনও অসুবিধে হবে না, আপনাদের জনপ্রিয়তায় কোনও আঁচড় পড়বে না।

আমি দেশে ফিরতে চেয়েছি। আপনি সোজা বলে দিয়েছেন, দেশে যেন না ফিরি। কেন নিজের দেশে আমি ফিরতে পারবো না, তার কোনও কারণ আপনি অবশ্য দেননি। ঠিক খালেদা জিয়া যেভাবে আমাকে দেশে ফিরতে দেননি, একই পদ্ধতিতে আপনিও আমাকে দেশে ফিরতে দেননি। আমার মা’ যখন মৃত্যুশয্যায়, আমি কত যে অনুরোধ করেছি মা’র শেষ দিনগুলোয় মা’র পাশে যেন কিছুদিন আমাকে থাকার অনুমতি দেন। আপনি অনুমতি দিলেন না।

শেষ পর্যন্ত আপনার রক্তচক্ষু অমান্য করে আমি দেশে ফিরেছিলাম। ভাগ্যিস আমার পাসপোর্টের তখনও বৈধতা ছিল। আমি দেশে ফিরেছি জানতে পেরে আপনি আমার ওপর এত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে ঠিক খালেদা জিয়ার মতো আমার বিরুদ্ধে মামলা করে, আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে, একইরকম নাটক করে আমাকে দেশ থেকে তাড়ালেন। খালেদা জিয়া আর আপনার মধ্যে চুলোচুলি থাকলেও আমাকে লাঞ্ছিত করার ব্যাপারে আপনারা দু’জন কিন্তু একশ’ ভাগ এক।

আমার বাবা যখন দেশে মৃত্যুশয্যায়, তখন তাঁকে অন্তত দু’দিনের জন্য হলেও দেখতে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে কেঁদেছি, কিন্ত আপনি অনুমতি দেননি, আমার পাসপোর্ট পূনর্নবীকরণ করেননি। আমি ভেবেছিলাম, যেহেতু নিজের বাবাকে আপনি খুব ভালোবাসেন, আপনি হয়তো বুঝবেন, কোনও কন্যাকে একবার শেষবারের মতো তার বাবাকে দেখতে বাধা দেওয়া কতবড় অন্যায় কাজ। আমার বাবা মারা গেছেন, আমাকে তাঁর কাছে যেতে দেওয়া হয়নি।

আমাকে ২৫ বছর দেশে ফিরতে দিচ্ছেন না। সম্ভবত ফিরতে দেবেনও না কোনওদিন। বিদেশ বিভুঁইয়েই আমাকে বাকি জীবন পার করতে হবে। দেশে ফেরার আশা আজকাল আর করিও না। আমার সমস্ত আশা চূর্ণ হতে হতে হতে এখন অবশিষ্ট কিছু নেই। বিদেশে কী করে বাস করতে হচ্ছে আমাকে, তা, আমি জানি না, কতটুকু জানেন। তবে নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারেন যে, আমি ভালো নেই। বাংলাভাষার একজন লেখক বাংলার বাইরে বসে বাংলা ভাষায় বই লিখে বেঁচে থাকতে পারে না।

বিশেষ করে, সেসব বই যখন একের পর এক নিষিদ্ধ হয়, সরকারের ভয়ে যখন প্রকাশকরা বই ছাপানো বন্ধ করে দেয়, যখন বই ছাপায় জাল-বইএর প্রকাশকেরা অর্থাৎ চোরেরা, বই বিক্রির কোনও সম্মানী যখন লেখকের হাতে পৌঁছোয় না। আমার জায়গায় আপনি হলে, ধরুন আপনি কোনও বাঙালি লেখক হলে, আপনাকে যদি জোরজবরদস্তি নির্বাসন দেওয়া হতো, আপনারও অবস্থা কিন্তু আমার অবস্থার মতোই করুণ হতো। কখনও কি আমার জায়গায় আপনাকে কল্পনা করে দেখেছেন? মনে হয় না।

আপনি নিজে নারী, নারীর অধিকারের কথা আপনিও বলেন, আর আপনার শাসনামলেই কত নারীর মানবাধিকার কতভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত