প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রোগীদের বিদেশ যাওয়া ঠেকাতে চিকিৎসার মান বাড়ানো জরুরি

দীপক  চৌধুরী : রোগাক্রান্তমানুষ ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছেন কেন এ প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এদেশে চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও ভুক্তভোগীদের প্রচণ্ড ক্ষুব্ধতা। চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সংশ্লিষ্টদের অমনোযোগিতা ও ব্যয়বহুল চিকিৎসাপদ্ধতিই এর প্রধান কারণ বলে অভিযোগ করেন তারা।  সরকারি হাসপাতালগুলোর আচরণ আমলাতন্ত্রের মতো। এদেশ থেকে প্রতিবছর কত সংখ্যক বা কী পরিমাণ  রোগাক্রান্ত  মানুষ  ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছেন- এর সঠিক পরিসংখ্যান ভারতীয় হাইকমিশন কতৃপক্ষ দিতে পারেননি। চিকিৎসার জন্য মানুষ ভারত যায়ই মেডিকেল ভিসায়। এর বাইরে  ট্যুরিস্ট ভিসা, বিজনেস ভিসায় গিয়েও অনেকে চিকিৎসা করান। তবে বিভিন্ন সূত্রের মতে, প্রতি বছর ছয় লাখের  বেশি মানুষ ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকেন। এতে এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি বছর চিকিৎসাবাবদ প্রায় ১৫  থেকে  ২০ হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। শুধু ভারতের চেন্নাইয়ের  (সাবেক মাদ্রাজ)  সিএমসি হাসপাতালে বছরে প্রায় এক লাখ ২২ হাজার রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে।

সরেজমিন ঘুরে ও বিভিন্ন মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে জানা  গেছে,   ভেলোরে ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ এ- হাসপাতাল, শ্রী নারায়ণী হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, চেন্নাই এ্যাপলো, ব্যাঙ্গালুরু হসপিটাল, ব্যাঙ্গালুরুর সঞ্জয়গান্ধী ইনস্টিটিউট অব ট্রমা অ্যান্ড অর্থপেডিক সেন্টার, ব্যাঙ্গালুরু নারায়ণ ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়ক সায়েন্স সংক্ষেপে নারায়ণ হেলথ, অর্থপেডিক সেন্টার, হায়দ্ররাবাদ কলম্বিয়া, কলকাতার কলম্বিয়া এশিয়া হসপিটালে অসংখ্য রোগী চিকিৎসার জন্য শরণাপন্ন হচ্ছে। ভারতের নামিদামি হাসপাতালে  কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট, বোনমেরো ট্রান্সপ্লান্ট বা লিভার ট্রান্সপ্লান্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের চিকিৎসার জন্য গিয়ে বিভিন্ন রোগী অবাক হয়েছেন। জটিল নয় সাধারণ চিকিৎসায় তারা সেখানে সুস্থ হয়েছেন। অথচ  বাংলাদেশে তাদের নাকি কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট, বোনমেরো ট্রান্সপ্লান্ট বা লিভার ট্রান্সপ্লান্টের প্রয়োজনীয়তার কথাই বলা হয়েছিল।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, এদেশে সুচিকিৎসার জন্য নয়,  বেসরকারি বা প্রাইভেট হাসপাতালগুলো চিকিৎসার  চেয়ে ব্যবসাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে বলে মনে করেন সেখানে যাওয়া  রোগীরা। অন্তত শতাধিক বিপদগ্রস্ত ও রোগাক্রান্ত নারী-পুরুষ এবং তাদের সঙ্গে আসা সহকারী বা অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে আভাস পাওয়া  গেছে বাংলাদেশি এবং  বাঙালি সাধারণ মানুষের কাছে অতি জনপ্রিয়  সিএমসি হাসপাতাল।  তারা তুলনা করে  দেখেছেন, কম আর্থিক খরচে জটিলব্যাধিতে আক্রান্তরাও সুস্থ হয়ে বাংলাদেশের বাড়িতে ফিরেছেন। ভারতীয় হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর  গড়ে প্রায়  শোয়া লাখ বাংলাদেশিকে মেডিকেল ভিসা দিয়ে থাকে তারা। ২০১৮-এ বাংলাদেশ  থেকে ভারতে ১লাখ ৫০ হাজার  মেডিকেল ভিসা ইস্যু করা হয়। তবে  মেডিকেল ভিসা ছাড়াও ‘ট্যুরিস্ট ভিসায়’ গিয়ে  হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন  সেখানে।

শুধু খ্রিস্টান মেডিকেল কলেজ ও হসপিটালের (সিএমসি) কথাই বলছি আজ। সিএমসিতে সরজমিনে  দেখা  গেছে, প্রতিদিন এখানে শতাধিক  রোগী পাওয়া যায়- যারা ‘ট্যুরিস্ট’ ভিসায় ভারত ঢুকেছেন, কিন্তু চিকিৎসা নিচ্ছেন  কোনো না  কোনো  রোগের। সিএমসি হাসপাতালে  ‘কলনোস্কপি’ অস্ত্রপ্রচার করাতে গিয়েছিলেন সিলেটের একজন রোগী। গত জুলাইয়ের শুরুর দিকের  কথা। তার সঙ্গে কথা হয় স্থানীয় ইডা স্কুডার রোডের একটি  লজে।  একাধিক চিকিৎসক ‘অপারেশন’ বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করার পাশাপাশি একেক চিকিৎসক একেক ধরনের পরামর্শ  দেন তাকে। অপারেশন করতে গুহ্যদ্বারের রাস্তা দিয়ে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেন। রোগীও সেই আশঙ্কা  থেকেই সিএমসি হাসপাতালে। অল্প অর্থে সুচিকিৎসা ও আরোগ্যলাভ করার অভিজ্ঞতা জানালেন তিনি।

সিএমসিতে বাংলাদেশি  রোগীদের ভিড় এবং বাস্তবতা প্রসঙ্গে একজন খ্যাতিমান পিজিশিয়ান মন্তব্য করলেন, বাংলাদেশে এখনই প্রয়োজন অ্যাডাপ্ট টু  মেডিকেল  টেকনোলজি। কাউকে দায়ী না করে নিউরো মেডিসিন এ- সার্জারি  বিভিাগের  একজন অধ্যাপক মন্তব্য করেন, বহু রোগী পাচ্ছি যারা বাংলাদেশে সঠিক চিকিৎসা করাতে পারেননি, ভুল চিকিৎসার পর এসেছেন যা খুবই দুঃখজনক।  হাসপাতালের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা  মি.  ডোরেই জাসপার বললেন, বহু  রোগী এখান  থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকে। এখানে প্রতিদিন আউটডোরে সাড়ে সাত হাজার এবং ইনডোরে ২ হাজার রোগীর চিকিৎসা করা হয়। হাসপাতালে রয়েছে ১৫০টি বিশেষজ্ঞ বিভাগ। বাংলাদেশি, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও উত্তরপূর্ব ভারতের অনেক মানুষই চিকিৎসার জন্য এখানে আসে।

রোগীদের সঙ্গে কথা বলে এবং হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে  যোগাযোগে জানা  গেছে,  মেডিকেল অনকোলজি, নিওন্যাটালোজি,  নেফ্রলজি, নিউরো  মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি,  পেডিয়াট্রিক সার্জারি,  পেডিয়াট্রিক অর্থপ্যাডি, অর্থপ্যাডি, গ্যাস্টোএন্টারোলজি, কিডনি, হার্ট, সাইকিয়াট্রি, ইএনটি বিভাগেই  বেশি  রোগী বাংলাদেশ  থেকে এসে থাকে। ৫ বছর যাবৎ জটিল  রোগে আক্রান্ত  মো. হাবিবুর জানান, ঢাকায় পান্থপথের  একটি হাসপাতাল কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়েছে আর শুধু শুধু তিন বছর তাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছে। সিএমসিতে এসে তিনি অনেক ভালো এখন। চিকিৎসা চলছে গ্যাস্টোএন্টারলোজি ডিপার্টমেন্টে। তবে তার মতে, ঢাকায় নামজাদা চিকিৎসকদের অনেকে মানবতার জন্য চিকিৎসা নয়, অর্থ  রোজগারের হাতিয়ার হিসাবে নিজেরা  ভূমিকা নিচ্ছেন। সিএমসি ও ঢাকার হাসপাতালের তুলনা করতে গিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর  শ্রেণির ছাত্র আশরাফুল ইসলাম  বলেন, আমাদের এখানে সরকারি হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসাযন্ত্রপাতি বিদেশ  থেকে আনা হলেও তা সঠিকভাবে অপারেট বা পরিচালিত করার জন্য দক্ষ  লোক  নেই। হেপাটাইটিস- সি ভাইরাসে আক্রান্ত টাঙ্গাইলের কবির হোসেন গত তিন বছর ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন।  সেখানে এখন তিনি সুস্থ। অথচ আসন্ন মৃত্যুর আভাস দিয়ে ঢাকায় তাকে ভীষণ নিরাশ করা  হয়েছিল।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক,  কলামিস্ট ও ঔপন্যাসিক

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত