প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গপাঠ তাকে ধীরে ধীরে করে তুলেছে প্রবল পরাক্রমশালী পুরুষ

সাদিয়া নাসরিন : ধর্ষণকে শুধুমাত্র মানসিক বিকৃতি বলে একপাশে সরিয়ে রাখলে আর চলবে না। লিঙ্গটিঙ্গ কেটে ফেলে বা ক্রসফায়ার দিয়ে ইনস্ট্যান্ট মেরে ফেলেও এই মড়ক থেকে রেহাই মিলবে না। এই মড়ক থেকে রক্ষা পেতে চাইলে পুরুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই জীবাণু দূর করতে হবে, ঠিক এখানেই কাজ করতে হবে আমাদের। যে সমাজ, লিঙ্গপাঠ শিখিয়ে শিশুর দেহে পৌরুষ বপন করে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে গোড়াতেই। কাজটা কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। সময় এসেছে ধর্ষকের সঙ্গে সঙ্গে ‘ধর্ষণে’র দিকে মনোযোগ দেয়ার। ধর্ষণ ও এর মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে লৈঙ্গিক সম্পর্ক ও রাজনীতি এবং পুরুষের সামগ্রিক মূল্যবোধের আলোকে। আমাদের বুঝতে হবে এই পুরুষদের মনস্তত্ত্ব কীভাবে কাজ করে, তাদের চিন্তা, আচরণ এবং কল্পনাশক্তির উপর পুরুষতন্ত্র কী ধরনের প্রতিক্রিয়া করে।

কেইট মিলেট প্রথম বলপ্রয়োগ নামে ধর্ষণ বিষয়টি আলোচনা করেন এবং দেখান যে, ‘নারীর উপর পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশলগুলোর একটি হচ্ছে ধর্ষণ’। ধর্ষণ যতোটা না অবদমিত কামের প্রকাশ, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রকাশ নারীবিদ্বেষের। এই ধর্ষকাম, যৌন আগ্রাসন আর নারীবিদ্বেষ আমরাই তৈরি করেছি আমাদের ছেলেদের মনস্তত্ত্বে। কীভাবে? ধরুন আমার একটি কন্যা আরেকটি পুত্র সন্তান আছে। এখন এই দুটো সন্তানের ভেতরে লিঙ্গের বিভাজন তৈরি করে আমিই একজনকে বলেছি, তুমি ছেলে, তুমি পবিত্র, শক্তিশালী, তেজস্বী, উচ্ছৃঙ্খল, শৌর্যশীল, কর্তৃত্বকারী। তাকে বলেছি, ‘কেঁদো না, হার স্বীকার করো না, দুঃখকে স্বীকার করো না। তোমাকে বলেছি, পুরুষ পাথর হও, আগুন হও, কঠোর হও। তোমাকে বলেছি, কোমলতা পুরুষকে মানায় না, চোখের জলে পৌরুষ থাকে না, আপোস পুরুষের জন্য নয়’। এই আমরাই পুত্র সন্তানটিকে শিখিয়েছি ‘আমি পুরুষ’ এই কথাটি কতোটুকু গর্বের! সে দেখলো, তার ‘শিশ্ন’ নামক একটি অঙ্গ আছে যার কোনো ভয় নেই, লজ্জা নেই বরং গর্ব আছে, শৌর্য আছে। সে দেখলো শিশ্নের নাম দেয়া হয়, খেলা করা হয়, ঘুঙুর পরানো হয়, পূজা করা হয়। এর পাশাপাশি সে কন্যাটিকে শিখিয়েছি ‘শরীর লুকিয়ে রাখতে হয়, নত হতে হয়, লজ্জাশীল হতে হয়। স্ত্রীলিঙ্গ’ কথাটি কতোটুকু অবমাননার তা আমরাই পুত্রদের বুঝিয়েছি চোখের সামনে কন্যাশিশু জীবন্ত কবর দিয়ে। তারা জেনেছে, কন্যা সন্তান বেঁচে থাকে পিতার দয়ায়। তারা দেখেছে তাদের বোনেরা স্ত্রীলিঙ্গের ভার নিয়ে কীভাবে ভীত হয়ে, কুঁকড়ে থেকে, বিব্রত, লজ্জিত, অবাঞ্ছিত, অসহায়, অধস্তন হতে থাকে।

আমরাই আমাদের পুত্রদের এই ধারণা দিয়েছি যে, তোমার পবিত্রতায় কন্যারা নিজেদের রজঃ লুকিয়ে রাখবে, তোমার জন্য কন্যারা তাদের ‘সতীত্ব’ রক্ষা করবে। তোমাকে বলেছি, তোমার জন্য আজীবন সহমরণের চিতায় পুড়তে প্রস্তুত আছে কন্যারা, সাদা থানে জীবনের রং লুকিয়ে রাখবে কন্যারা তোমার জন্য। এই পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গপাঠ এভাবেই তাকে ধীরে ধীরে করে তুলেছে প্রবল পরাক্রমশালী পুরুষ, যার যৌনতা নির্ভর করে কেবল তার স্বাধীন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ লিঙ্গের উপর, নারী সেখানে ‘কর্ম’ মাত্র। পুরুষতন্ত্র যৌনক্ষমতাকে সম্মানিত করেছে, পুরুষ তাকে ক্যাপিটালাইজ করেছে। এই সমাজ এমন করে পুরুষ নির্মাণ করেছে যেখানে পুরুষের সমস্ত শক্তি, বিশ্বাস, সাহস ওই একটি লিঙ্গে পড়ে থাকে।
যৌনতাকে কীভাবে পৌরুষের-মূল শক্তি হিসেবে প্রকাশ করে তা পথের মোড়ে মোড়ে যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধের প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন ও বেচাকেনা দেখলেই বোঝা যায়। যে সমাজের বিজ্ঞাপনচিত্রে যৌনসক্ষমতাকে ‘আসল পুরুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যে সমাজে শান্ত ছেলেরাও ‘মাইয়ালি বা মেয়েলি’ বলে আগ্রাসী পুরুষের ঘৃণা আর র্যাগিংয়ের শিকার হয়, সে সমাজ বাই ডিফল্ট ধর্ষক তৈরির কারখানা।

ব্রাউনমিলানের ভাষায়, ‘পুরুষতন্ত্র ‘পৌরুষ’কে দেখে যে মুগ্ধ চোখে, তাতে গড়ে উঠে এমন গণমনস্তত্ত্ব যা ধর্ষণকে উৎসাহিত করে’। তাই কেবল লিঙ্গ নয়, সমস্ত পৌরুষত্ব দিয়ে নারীকে ধর্ষণ করে পুরুষ। ধর্ষণ শুধু নারীকেই করে না, করে নারীত্বকে, এটা অক্ষমতার প্রতি সক্ষমতার আগ্রাসন। একটি মেয়েকে জোর করে, কষ্ট দিয়ে ধর্ষক যে আনন্দ পায়, মেয়েটি ব্যথায় চিৎকার করলে ধর্ষকের যে বিকৃত উল্লাস হয়, সে আনন্দ ক্ষমতার, দমন-নিপীড়নের। অসহায় নারী হাতে-পায়ে ধরে বাঁচার আকুতি করবে, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাবে, করুণা ভিক্ষা করবে, ‘বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট, একজন একজন করে আসো তবেই না পৌরুষের মহান সম্মান টিকে থাকবে। পুরুষের কাছে যৌনতা যখন যুদ্ধজয়ের আবেদন তৈরি করে, ধর্ষণের পেছনে তখন আত্মতৃপ্তির চেয়ে বেশি কাজ করে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, জয় করা এবং অধীনস্ত করার মনস্তত্ত্ব। লড়াইটা এই মনস্তত্ত্ব নির্মাণের জায়গায় করতে হবে। প্রথমে ঘর থেকেই শুরু হোক। আপনার ছেলেকে সন্তান হিসেবেই বড় করুন, তার মগজে পৌরুষ ভরে দেবেন না। শক্তিমান, সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান, হিরো ইত্যাদি শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে শিশুটির মনের ভেতরে তার ওই ছোট্ট লিঙ্গ নিয়ে কোনো ফ্যান্টাসি, ক্রেডিবিলিটি, আনন্দ অথবা ভীতি তৈরি করবেন না। আপনার সন্তানকে শক্তির সঙ্গে নয়, মানবিক বোধের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন। তাকে ধৈর্যশীল হতে শেখান, তার মানবিক আবেগকে প্রশমিত হতে দিন। তার ভেতরে লজ্জার, পরিশীলতার, পরিমিতির বোধ তৈরি করে দিন। তাকে শিক্ষা দিন যেন সে কোনোভাবেই নগ্ন-অর্ধনগ্ন/খালি গায়ে না থাকে। তাকে শেখান শিশ্ন তার শরীরের একটা অঙ্গ মাত্র, এটি নিয়ে উচ্ছ্বাস-উল্লাস বন্ধ করুন। যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে হিস্যু করে লিঙ্গ সুবিধা নিতে দেবেন না শিশুকে, আপনিও নেবেন না। না, মানে না।

মনে রাখবেন আপনার হাতেই সে হয়তো পুরুষ হবে, নয়তো মানুষ হবে। তাই পরীক্ষা পাশের যুদ্ধের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে এই যুদ্ধ করতে হবে আপনাকে। আপনি, আমি যদি নিশ্চিত করতে পারি আমাদের সন্তান আর যাই হোক, ধর্ষক বা ধর্ষকামী হবে না, তবে এই দেশের একটি মেয়েও আর পুরুষের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকবে না। মনে রাখবেন আগে আমাদের ছেলেদের বাঁচাতে হবে এই ধর্ষকামী পৌরুষ নির্মাণের নষ্ট লিঙ্গ রাজনীতি থেকে। পুত্ররা বাঁচলে তবেই কন্যারা বাঁচবে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত