প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সিজিপিএ-৪ সময়ের দাবি, চাই উন্নত শিক্ষাও

শাহীন কামাল: পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফল প্রকাশে বিদ্যমান জিপিএ ৫ এর পরিবর্তে সিজিপিএ (কিউমিউলেটিভ গ্রেড পয়েন্ট এ্যভারেজ) ৪ করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ১২ জুন শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনির সভাপতিত্বে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, শিক্ষাবোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার কথা রয়েছে। সরকার আগামী জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা থেকে নতুন এ পদ্ধতিতে ফলাফল প্রকাশের বিষয়ে আশাবাদী।

এদেশে পাবলিক পরীক্ষায় দীর্ঘদিন বিভাগ কিংবা শ্রেণী হিসেবে ফলাফল প্রকাশ করা হতো। তখন ৬০% মার্ক বা তদুর্দ্ধ প্রথম শ্রেণি, ৪৫% বা তদুর্দ্ধ দ্বিতীয় শ্রেণি, ৩৩% থেকে ৪৪% তৃতীয় শ্রেণি হিসেবে বিবেচিত হতো। ৭৫% ও তদুর্দ্ধ স্টার মার্ক হিসেবে বিবেচিত হলেও সার্টিফিকেটে তার কোন অস্তিত্ব ছিল না। ৩৩% এর কম প্রাপ্ত মার্ক অকৃতকার্য হিসেবে পরিগণিত হতো। ২০০১ সালে বিদ্যমান পদ্ধতির পরিবর্তে জিপিএ ৫ এর প্রচলন শুরু হয়। প্রথম বছর মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় মাত্র ৭৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পায় যা নিয়ে অভিভাবক মহলে বেশ অসন্তুষ্ট দেখা দিয়েছিল। সেসময় ৮০% বা তদুর্দ্ধ প্রাপ্ত মার্ক গ্রেড পয়েন্ট ৫ কিংবা লেটার গ্রেডিং এ প্লাস হিসেবে বিবেচিত হতো। শূন্য থেকে ৩২ পর্যন্ত ছিল গ্রেড পয়েন্ট শূন্য বা “এফ” গ্রেড। পরবর্তীতে অপশনাল বিষয়ে মার্ক যোগ করার পরে জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে ফলাফলে বাম্পার ফলন শুরু হয়েছে। প্রতিবছরই এই জিপিএ ৫ এর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় দৃশ্যমান ভাবেই বেড়েছে। জিপিএ ৫ এর সহজলভ্যতার কারণে অভিভাবকমহল যেনতেন ভাবে জিপিএ ৫ এর পিছনে দৌড়িয়েছে। মানহীন জিপিএ ৫ এর কারণে সচেতন মহলের ভাবনাও কম ছিল না। “আই এম জিপিএ ফাইভ” ট্রল এখন সর্বজনজ্ঞাত।

সিজিপিএ ৪ করার ক্ষেত্রে অন্যতম যুক্তি হলো আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা। বিদেশে পড়তে কিংবা চাকুরীর ক্ষেত্রে সমতার ক্ষেত্রে অনাহূত ঝামেলা এড়াতে এ ব্যবস্থা। বিশ্বায়নের এই সময়ে উন্নত বিশ্বের সাথে শিক্ষাব্যবস্থায় তাল মিলিয়ে না চললে আমরা যে পেছনে পড়ে যাব, তা না বললেও চলে। তাছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। আমাদের উচ্চ শিক্ষাস্তরে ইতোমধ্যে সিজিপিএ ৪ চালু রয়েছে। তার সাথে মিলিয়ে নিম্নস্তরে সিজিপিএ ৪ করা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু যে বিষয়ে নজর দেয়া অধিকতর জরুরি তা হল, উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে দরকার মানসম্মত শিক্ষা। বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি ফলাফলের বাম্পার ফলন ঘটাবে সত্যি কিন্তু মানসম্মত শিক্ষার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। আর তাতে শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় টেকা অসম্ভব হয়ে যাবে।

বর্তমান জিপিএ তে প্রতি ১০ মার্কের জন্য এক এক টা গ্রেড। যেমন কোন শিক্ষার্থী ৭০ নাম্বার পেলে এ অথবা ৪। সে যদি ৭৯ পায় তাহলেও একই গ্রেডে৷ এক্ষেত্রে ৭৫ পেলেই পরীক্ষক এক ধরনের নৈতিক চাপে থাকতেন। ফলে কোন পরীক্ষক ৮০ করার চেষ্টা করতেন কেউবা আবার রেখে দিতেন। এতে একই মানের পরীক্ষা দিয়েও পরীক্ষকের ভিন্নতার জন্য ফলাফল ভিন্ন হতো। কিন্তু প্রস্তাবিত সিজিপিএ ৪ এর কারণে সেই তারতম্য হ্রাস পাবে। এখানে প্রতি ৫ মার্কে গ্রেডিং ব্যবস্থা থাকার কারণে ঐ গ্যাপটা অনেকাংশে কমে যাবে। ফলে শিক্ষার্থী ভেদে ফলাফলের তারতম্য যথার্থই হবে।

বর্তমান পদ্ধতিতে নুন্যতম গ্রেড ডি বা ১। কোন শিক্ষার্থী ৩৩% এর কম মার্ক প্রাপ্ত হলে “এফ” গ্রেড কিংবা অকৃতকার্য হিসেবে বিবেচিত হয়। নানা পারিপার্শ্বিকতায় আমাদের শিক্ষার্থীদের বেশ বড় একটা সংখা ৩৩% নাম্বার পেয়ে উর্ত্তীণ হয়। এরা যে সবাই ৩৩ পায় তা নয়। এদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষক, নিরীক্ষক, প্রধান পরীক্ষক সবাই সদয় থাকেন। শিক্ষাবোর্ডগুলো এ সকল শিক্ষার্থীর বিষয়ে সংগত কারনেই উদার আচরণ করে। কিন্তু সিজিপিএ ৪ করতে গিয়ে সেই নূন্যতম পাশের স্তর করতে হবে ৪০ যা অতিক্রম করা অনেক শিক্ষার্থীদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে পাশের হারে বিরাট পতনের সম্ভাবনা আছে যা সংশ্লিষ্টমহল ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবে কিনা তা ভাববার বিষয়। এমনিতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে নানা কথা প্রচলিত রয়েছে। তার উপর ৪০% পাশ মার্ক রেখে শিক্ষাবোর্ডগুলোর পাশের হার বর্তমান স্তরে রাখতে গিয়ে নানা ধরনের কথা উঠতে পারে। সিজিপিএ ৪ করে পাবলিক পরীক্ষায় যেকোন ফলাফল মেনে নিতে তৈরি কিনা, তা ভাবতে হবে।

সিজিপিএ ৪ করা সময়ের দাবি। নানারকম বাছবিচারে উন্নত বাংলাদেশের প্রত্যাশায় এর বিকল্প নেই। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা ব্যতিরেকে শুধুমাত্র বাহ্যিক তাল মিলিয়ে চললে কোন ফল আসবে না। উন্নত বিশ্বের সাথে টিকে থাকতে দরকার উন্নত শিক্ষা। সিজিপিএ ৪ যেন “আই এম জিপিএ ৫” এর পর্যায়ে না পৌঁছে সত্যিকার অর্থেই উন্নত শিক্ষার মাধ্যম হয়, সংশ্লিষ্ট মহল সেদিকে দৃষ্টি রাখবে বলে আশা করছি।

লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত