প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

চট্টগ্রাম কারাগারে টাকা দিলে নাকি সব মেলে

সালেহ্ বিপ্লব : কথায় আছে, কারাগারে টাকা দিলে বাঘের চোখও মেলে! এটা শুধু কথার কথা নয়। আর ‘জেলখানার সম্বল কাঁথা বাটি কম্বল’—এখন একেবারেই সেকেলে। বরং কারাগারে টাকার বিনিময়ে মিলছে নিজের চাহিদামত সব কিছুই। বিষয়টি অনেকটা গোপনে করা হলেও কারাগারের ভেতরে নিজ রুমমেটের হাতে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী খুন হওয়ার পর পুলিশের তদন্তে বিষয়টি উঠে এসেছে। এছাড়া কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক বন্দির সঙ্গে কথা বলেও এসব অনিয়মের বিষয়ে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগকে একেবারেই ভিত্তিহীন বলছে জেল কর্তৃপক্ষ। সিটিজিটাইমস২৪ডটকম

অনুসন্ধানে জানা যায়, জেল কোডের বাইরে গিয়ে নানা অনৈতিক কার্যক্রম চালাচ্ছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। টাকা হলেই কারাগারে বাসা বা আবাসিক হোটেলের মত পাওয়া যাচ্ছে সব সেবা। আর যাদের টাকা নেই তাদের কাছে কারাগার যথারীতি এক অন্ধকারের বদ্ধজীবন। বিত্তবান বন্দিরা যত বড় অপরাধীই হোক না কেন তাদের জন্য সব সুযোগ সুবিধা বরাদ্দ। অন্যদিকে টাকা যাদের নেই তাদের কপালে জোটে নানা নির্যাতন।

টাকা দিলেবাঘের চোখ’, না দিলেইলিশ ফাইলে
মুক্তি পাওয়া বন্দিরা জানান, কারাগারে প্রবেশের পরই সবাইকে ‘আমদানি’ নামক একটি সেলে বসানো হয়। এরপর রাইটার (সাজা প্রাপ্ত কয়েদি) এসে যারা টাকা দিতে সম্মত হয়, তাদের পছন্দমতো সেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। টাকা দিতে সম্মত না হলে তাদের ‘ইলিশ ফাইলে’ (কাত করে ইলিশ মাছ রাখার মতো) রাখা হয়। বন্দিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এখানে আবাসিক হোটেলের মতোই সব সুবিধা দেওয়া হয়। এমনকি টাকা হলে পাওয়া যায় যে কোনো মাদকদ্রব্য, ব্যবহার্য নানা জিনিসপত্র তো বটেই।

কারাগারে টাকায় মেলে ঘরের সুবিধা
এমনিতে নতুন-পুরনো বন্দিতে ঠাসা চট্টগ্রাম কারাগার। তিলধারণের জায়গা নেই। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি থাকায় আগে থেকেই অমানবিক দিনযাপন করছেন বন্দিরা। আর সেই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে বিত্তবান বন্দিরা কারাগারের মেডিকেল ওয়ার্ডে থাকার সুবিধা নিচ্ছেন। আবার সেলে বন্দি অনেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সেখানে নিজ বাসার মত সব সুবিধা ভোগ করছেন। অন্যদিকে যারা টাকা দিতে পারছেন না তারা ‘ইলিশ ফাইলেই’ এ থাকছেন। প্রয়োজনীয় খাবার, গোসলের পানি ও খাবার পানিও পান না তারা।

মাদক ঢোকে অনায়াসে, বেশিরভাগ বন্দিই মাদকাসক্ত
দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত হত্যাকাণ্ডের পর ৩০ মে সকালে সিএমপির একদল চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা কারাগারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এসময় এসব অনিয়মের চিত্র তারাও দেখতে পান। এমনকি অমিত হত্যায় ব্যবহার করা এই ইটও অনৈতিক সুবিধায় তাকে রান্নার কাজে ব্যবহার করতে দিয়েছে জেল কর্তৃপক্ষ। কারাগারে থেকে অনেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোবাইল ব্যবহার করেন। ভিডিওকলে নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে কথাও বলেন। তাদের অনেকের জন্য চুলার জন্য ইট, জ্বালানির জন্য ন্যাকড়া, প্লাস্টিকের বোতল, গ্যাসলাইট, ক্যাবল তার, দড়িসহ নানা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। এমনকি কারাগারে বসে সিগারেট খাওয়ার বৈধ সুযোগ থাকলেও সেখানে অনেকে ইয়াবা কিংবা গাঁজার মতো মাদকও গ্রহণ করছেন।

জানা গেছে, বন্দিরা আদালতে হাজিরা দিতে গেলেই অভিনব পদ্ধতিতে বাইরে থেকে গাঁজা-ইয়াবা নিয়ে আসছেন কারাগারের ভেতরে। চট্টগ্রাম কারাগারের বেশিরভাগ বন্দিই মাদকাসক্ত। কারাগারে মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত থাকে সুবেদার, জমাদার ও কারারক্ষীরা। ভেতরে ভয়ংকর বন্দিদের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। অমিত হত্যাকাণ্ডের পর নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্ত দল দেখতে পান অমিতকে ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ছয় নম্বর সেলে রান্না করার জন্য কাপড়ের জুট, প্লাস্টিকের বোতল, দিয়াশলাই ও ইট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে রক্তমাখা কম্বলের সঙ্গে ইটও জব্দ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ২০১৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে থাকা নিহত অমিত মুহুরী কারাগারে বসে শুধু ইটের চুলায় রান্না করা খাবার আর মাদক গ্রহণ করতেন না। তিনি সেল থেকে তার কলকাতা প্রবাসী স্ত্রী নিধি দত্ত মুহুরীর সঙ্গে মোবাইলে ভিডিও কলে কথাও বলতেন। ফেসবুক মেসেঞ্জারে ভিডিও কলের বেশকিছু স্ক্রিনশট ও মেসেঞ্জারে ছবি আদান-প্রদানের স্ক্রিনশট চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে রয়েছে।

ছবির স্থান কারাগার, নাকি আদালতের গারদখানা সেটা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ছবির ধরন দেখে মনে হচ্ছে

এসব ছবি কারাগারের সেলের ভেতরের। আদালতে জনসমক্ষে এই ধরনের ভিডিও কলে কথা বলার সুযোগ খুবই কম। এছাড়া অমিতের পেছনের দেয়াল ও জানালা দেখে মনে হচ্ছে কারাগারের সেল থেকেই তিনি ভিডিও কলে কলকাতা প্রবাসী স্ত্রীর নিধির সঙ্গে অমিত কথা বলেছেন।

এ ব্যাপারে কলকাতায় অবস্থানরত নিধি দত্ত মুহুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো সাড়া মেলেনি।

প্রভাবশালী হলে কদর বেশি
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘অমিত হত্যার পর কারাগারের ভেতরে গিয়ে যা দেখতে পেলাম তা হচ্ছে, টাকা দিলে মনের সব খায়েশই পূরণ করা যাবে জেলখানায়। মানে আপনি যা যা চান তার সবই। এক্ষেত্রে প্রভাবশালী দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হলে আরো কদর বেশি।’

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার নেশার আহমেদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আপনি যেসব অনিয়ম ও অনৈতিক সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কথা বলছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এ ধরনের কোন কিছু কারাগারে হচ্ছে না। সবকিছুই সিসিটিভি নিয়ন্ত্রিত।’

তাহলে অমিতের সেলে কীভাবে ইট গেল? এ প্রশ্নের উত্তরে কিছুক্ষণ চুপ থেকে জেলার বলেন, ‘বিষয়টা চিন্তার। তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্তে বের হয়ে আসবে।’

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত