প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রাচ্য-প্রতীচীর পথে প্রান্তরেঃ ভাত, হায়রে ভাত

ডঃ শোয়েব সাঈদ : আমাদের ছাত্রজীবনে বিটিভি’র মনোপলি যুগে বাংলা নাটকের সোনালী সময়ে নাটকের অনেক সংলাপ মননে গেঁথে যেত। তাছাড়া কিছু সংলাপ থাকে যেগুলি সামাজিক বাস্তবতায় এমনভাবে মিশে যায় যাকে কালোত্তীর্ণ বলা যায়। প্রয়াত প্রখ্যাত নাট্যশিল্পী নাজমা আনোয়ারের এমনই একটি বিখ্যাত সংলাপ “ভাত, হায়রে ভাত”। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিতর্ক এবং বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় প্রাসঙ্গিকতায় সুযোগ পেলেই বাংলা নাটকের মহীয়সী এই অভিনেত্রীর চমৎকার অভিব্যাক্তির এই সংলাপটি প্রয়োগ করতাম। কিন্তু আজকে আমাদের জীবনের এই পরিণত অধ্যায়ে সংসারের টানাটানির তাড়নায় নয়, ভাত সংস্কৃতির ভেতর থেকে উঠে আসা একজন অভিবাসী পেশাজীবির ভ্রমনবাহুল্য জীবনযাত্রায় ভাতবিহনের হাহাকারটি যখন জেগে উঠে, সংলাপটি মাথায় ঘুরপাক খেতেই থাকে। অফিসের কাজে আটলান্টিক আর প্রশান্তের এপার ওপার ভ্রমণরত অবস্থায় অনেক সময় অনেকদিন যাবৎ ভাতের দেখা মিলে না এবং এই বিষয়টি ধাতস্ত হয়ে গেলেও মাঝে-মধ্যে পুরনো অভ্যাস ভীষণ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ফলে হঠাৎ করেই মস্তিস্কের নিউরো-ট্রান্সমিশনের গিয়ারটা ভাত মোডে চলে যায়, ভাত ছাড়া মানতে চায় না। পরিবেশ এবং প্রেক্ষিতের ভিন্নতায় “হায়রে ভাত” এর দীর্ঘশ্বাসটি এখানে নাটকের কাহিনীর মত টানাটানির সংসারজাত নয়, আক্ষরিক অর্থেই বাংগালির ভাতকে খুঁজে ফেরা। ভ্রমনকালে বিশেষ করে ইউরোপে আর আমেরিকায় নাইট্রোজেন বা প্রোটিনের বা আমিষের উৎস হিসেবে মাছ-মাংসের নানাবিধ বৈচিত্র্য থাকলেও, কার্বন বা কার্বোহাইড্রেটের উৎস হিসেবে আলু এবং পাউরুটির নানা রকমের রেসিপির দাপটে ভাতের দেখাই মেলে না। ভাত বিচ্ছেদের এই পরিস্থিতিটা মূলত জটিল নন-এশিয়ান গন্তব্যে।

একবার ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ব্যস্ততায় কাটিয়ে দিলাম ১০ দিন ভাতের স্পর্শ ছাড়াই। ব্যস্ততায় ভাতের কথা মনেই ছিলনা। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন থেকে নরওয়ের ওসলো আর ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি হয়ে এস্টোনিয়ার রাজধানী টালিনে। রাত একটায় হেলসিঙ্কি থেকে ২৫ মিনিটের ফ্লাইটে টালিনে নামলাম। ইউরোপে অবস্থিত কয়েকটি আরএন্ডডি সেন্টারের একটি টালিন ইউনিভারসিটি অব টেকনোলজি ক্যাম্পাসে অবস্থিত; তাই প্রায়ই আসতে হয়। বায়োটেকের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ক্রমশই টালিনে আরএন্ডডি সেন্টার খুলতে আগ্রহী হচ্ছে। এয়ারপোর্টে নেমেই মুখোমুখি হতে হল কড়া তল্লাশির। সাধারণত ইইউ এর ২৭টি সেঞ্জেন দেশগুলোর মধ্যে বিমান ভ্রমণের সময় পাসপোর্ট কন্ট্রোলের ব্যবস্থা থাকে না। কিন্তু ঐ দফায় টালিন এয়ারপোর্টে পাসপোর্ট চেক সহ কড়া তল্লাশির কারণ ছিল প্রেসিডেন্ট ওবামাকে নিয়ে এয়ারফোর্স ওয়ানের লেনার্ট মেরি টালিন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট নামার শিডিউল আমার ফ্লাইট নামার ২-৩ ঘণ্টার মধ্যেই। রাশিয়া যাতে ইউক্রেনের মত সমস্যা রাশিয়া সীমান্তবর্তী এস্টোনিয়াতে না ঘটাতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র আর ন্যাটোর পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করতে ওবামার আগমন। ওবামার অবস্থানের সুইসটেল হোটেলের কয়েক ব্লকের মধ্যেই ছিল আমার হোটেল। রাস্তা ব্লক থাকার কারণে এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যেতে বা সকালে টালিন ইউনিভারসিটি অব টেকনোলজি ক্যাম্পাসে যেতে বেশ পেরেশানিই করতে হয়েছে। পেরেশানিতে অবশ্য মেজাজ খারাপ হয়নি। এইসব ক্ষেত্রে মেজাজ খারাপ হলে খারাপ মেজাজটা কেবল নিজেকেই দেখাতে হয়, অন্যকে দেখাতে যাওয়ার অর্থ অহেতুক বিপদ ডেকে আনা। কিন্তু অনুভব করতে লাগলাম ভাত বিরহ। পরের দিন হেলসিঙ্কি হয়ে মন্ট্রিয়লে ফেরার কথা। হেলসিঙ্কিতে একদিনের বিশ্রামের সুযোগে শহরটাকে দেখতে বের হলাম। পৃথিবীর অন্যতম সুখী আর সুনীতির দেশ ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি ঐতিহ্য আর আধুনিকতার একটি চমৎকার কম্বিনেশন। উঠে পড়লাম সাইট-সিয়িং বাসে। পোর্ট, পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, মিউজিয়াম, হেলসিঙ্কির বিখ্যাত মার্কেট স্কুয়ার, আন্ডার-গ্রাউন্ড চার্চ ঘুরে বাস এসে থামল শুরুর জায়গাটিতে অর্থাৎ হেলসিঙ্কি সেন্ট্রাল রেলস্টেশনে। সাইট-সিয়িং বাসে মজাটা হচ্ছে যে কোন স্টপেজে নেমে ঘুরাঘুরি করে আবার একই কোম্পানির আরেকটি বাসে উঠে পড়লেই হল। এক পার্কে দেখলাম গাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছে। গাছতো হাসপাতালে যেতে পারেনা, তাই চলন্ত হাসপাতালকেই আসতে হয় গাছের কাছে। গাছের এম্বুল্যান্সের ভেতর বিশাল মনিটর সহ নানা যন্ত্রপাতি। ডাউন-টাওন হেলসিঙ্কির বিখ্যাত মার্কেট স্কুয়ারের একটি পার্কে সাউন্ডওয়েব নির্ভর আলট্রাসনিক পদ্ধতির 3D Acoustic Tomograph এর মাধ্যমে গাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফলাফলটা অনেকটাই হতাশাজনক। অনেকগুলো গাছ বাহ্যত সুস্থ্য সতেজ দেখালেও ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে। বিশাল এক গর্ত গাছের আয়ুকে চ্যালেঞ্জ করছে আর এটি জননিরাপত্তার জন্যেও হুমকি।

ইতিমধ্যেই টের পাচ্ছিলাম ভাতের খোঁজ করার ইন্টেনসিটি বাড়াচ্ছে মস্তিস্কের নিউরোট্রান্সমিটার। হেলসিঙ্কি সেন্ট্রাল রেলস্টেশনে দীর্ঘ ভাত-বিচ্ছেদের অস্বস্তিতে ভাত খুঁজতে গিয়ে পেলাম “নমস্কার” নামে এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট। আমার অভিজ্ঞতায়/হিসেবে বার্সেলোনা-প্যারিস-জেনেভা-লন্ডন-টরেন্টো-নিউইয়র্ক-মন্ট্রিয়াল-টোকিও-কোপেনহেগেন-ফ্রাঙ্কফুর্ট-ব্রাসেলস-আমস্টারডাম-লিসবন-মাদ্রিদ-রোম সহ পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ শহরে অধিকাংশ (কখনো কখনো প্রায় ৮০ শতাংশ) ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট বাংলাদেশী মালিকানায়/পরিচালনায়। কিচেনে খোঁজ নিলে দেখতে পাবেন মালিক বা শেফ বা উভয়ই বাংলাদেশী। বিজনেস ট্রিপে কলিগদের ছাড়া যখন একা থাকি, ভাতের অনুভূতিতে প্রায়ই আঘাত লাগে, ফলে খোঁজ পরে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের। মাঝে মধ্যে কলিগদের নিয়ে যাওয়াও আমার পছন্দ। ফলে আমার নিজের অভিজ্ঞতাকে যদি র‍্যান্ডম নমুনায় ফেলি, ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের বাংলাদেশী মালিকানার ক্ষেত্রে আমার ধারণাটি বাস্তবতার কাছাকাছি। আমার অনুমানকে সত্য করে আবারো দেখলাম হেলসিঙ্কি সেন্ট্রাল রেলস্টেশনের “নমস্কার” রেস্টুরেন্টটি চালাচ্ছেন দিনাজপুরের লিয়াকত সাহেব। বিশ বছর যাবত আছেন। বিয়ে করেছেন এস্টোনিয়ান অর্থাৎ এস্টোনিয়ার জামাই। এক মেয়ে নিয়ে বউ থাকেন এস্টোনিয়ার রাজধানী টালিনে। প্রতি সপ্তাহেই স্স্ক্যানডিনেভিয়ায় হেলসিঙ্কি-আর বালটিকের টালিনে আসা যাওয়া করতে হয়। রেস্টুরেন্টের অন্যান্য স্টাফরাও বাংলাদেশের এবং মূলত দিনাজপুরের, ওনারই আত্মীয় স্বজন। গল্পটি করেছিলাম একদা মন্ট্রিয়লের বাসিন্দা বর্তমানে ঢাকায় সার্ক কৃষি তথ্য সেন্টারের কর্মরত কনসালটেন্ট ডঃ নাসরিনের সাথে। দেখা গেল লিয়াকত সাহেব ডঃ নাসরিনের খুবই পরিচিত, মনে হল পৃথিবীটা আসলেই ছোট হয়ে আসছে।

হেলসিঙ্কিতে আরো কয়েকবার যাওয়া হলেও সেন্ট্রাল রেলস্টেশনের দিকে যাওয়া হয়নি। এবার ২০১৯ এর মার্চে মন্ট্রিয়ল-ফ্রাঙ্কফুর্ট-হেলসিঙ্কি হয়ে নামলাম টালিন বিমানবন্দরে। আরএন্ডডি সেন্টারে দুদিনের প্রশিক্ষণ আর টালিন উপকণ্ঠে কোম্পানির ইষ্ট প্লান্ট পরিদর্শন শেষে ভাবলাম প্লেনে নয়, এবার শিপ/ফেরিতে টালিন থেকে হেলসিঙ্কি যাব বাল্টিক সাগরের হালকা লোনা জলে ভেসে ভেসে। ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, রাশিয়া, এস্টোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়েনিয়া, পোল্যান্ড আর জার্মানির মাঝে লম্বায় ১৬০০ কিমি, সর্বোচ্চ চওড়া ২০০ কিমি, আর সর্বোচ্চ গভীরতায় ৪৫০ মিটারের (গড়পড়তায় ৫৫ মি) বাল্টিক সাগর পশ্চিম ইউরোপ, বাল্টিক দেশগুলো আর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের একে-অপরের সাগরপারের সেতুবন্ধন। বাল্টিক সাগরের উত্তরে বোথনিয়া বে একটু ভিন্ন ভাবে সাজিয়েছে সুইডেন আর ফিনল্যান্ডের দক্ষিণাংশকে। বাল্টিক সাগরের পানিকে বলা হয় ব্রাকিশ অর্থাৎ মিঠা আর লোনা জলের মিশ্রণ। এই জলের লবণাক্ততা মহাসাগরের তুলনায় মাত্র ২০%। বাল্টিক সাগর ডেনমার্ক আর সুইডেনের মাঝখান দিয়ে উত্তর সাগরের সাথে মিশে আটলান্টিকের সাথে যুক্ত।

এস্টোনিয়া রাজধানী টালিন আর ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কির মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম বাল্টিকের বুকচিরে ঘণ্টা দুয়েকের বিলাসবহুল ফেরি সার্ভিস। হেলসিঙ্কি কিংবা ইউরোপের অন্যান্য শহর থেকে উড়োজাহাজে করেই টালিন এসেছি অসংখ্যবার। এবার ভাবলাম আস্তে ধীরে বাল্টিক সাগরের আধা নয়, সিকি লোনা জল মন্থন করে ফেরীশীপে টালিন থেকে হেলসিঙ্কি যাবার। এবারের অভিজ্ঞতাটুকু ছিল প্রকৃতি আর প্রযুক্তির মিশ্রণে অন্যমাত্রায় উপভোগ্য। ফেরিটি মূলত অতি অত্যাধুনিক একটি ভাসমান শপিং মল। ৩০০ মিলিয়ন ডলারের প্রায় ৭০০ ফুট লম্বা, ১২ তলার মেগাস্টার নামের ফেরীটির যাত্রী বহন ক্ষমতা ২৮০০ জন, কার পার্কিং ১৫০, ট্রাক/ট্রেইলার পার্কিং ২৫০টি। ঘুমানোর বিছানা ছাড়া পাঁচতারা হোটেলের অনেক সুবিধে রয়েছে ফেরিটিতে। দুঘণ্টায় হেলসিঙ্কি পৌঁছে ট্রামে করে সেন্ট্রাল রেলস্টেশন। আবারো খুঁজে বের করলাম নমস্কার রেস্টুরেন্টটি। এবার লিয়াকত সাহেবকে পেলাম না। আমি যে শীপে টালিন থেকে এসেছি সেটির ফিরতি যাত্রায় টালিন গিয়েছেন স্ত্রী-কন্যার সাথে সপ্তাহান্তের দিনগুলি কাটাতে। লিয়াকত সাহেবের অনুপস্থিতিতে ওনার স্বজনরাই দেখভাল করেন রেস্টুরেন্টটির। ডিনার আর আড্ডা মেরে ট্রেনে নয়, বাসে করে নতুন-পুরাতন হেলসিঙ্কি দেখতে দেখতে ফিরে গেলাম হেলসিঙ্কি (ভ্যান্টান লেন্টোয়াসেমা)এয়ারপোর্ট সংলগ্ন হোটেলে। ধরতে হবে ভোরের ফ্লাইট; হেলসিঙ্কি থেকে লুফথান্সায় ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্ট হয়ে এয়ার কানাডায় মাইসিটি মন্ট্রিয়লের পিঁয়েরে এলিয়ট ট্রুডো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের উদ্দ্যেশ্যে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত