প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধর্ম মানা না-মানা বনাম বাম রাজনীতি

বিভুরঞ্জন সরকার : এক সময় যারা এদেশে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণির রাজত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শোষণহীন সমাজ কায়েমের স্বপ্ন দেখতেন, এখন তাদের অনেকেই স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিয়েছেন। তারা অনেকেই এখন দল বদল করেছেন, লক্ষ্য বদল করেছেন। শ্রমিকরাজ, কৃষকরাজ কায়েমের বাস্তবতা দেশে নেই বলে তারা মনে করেন। সমাজতন্ত্র এখন তাদের কাছে স্বপ্ন বিলাস। কেন এই পরিবর্তন হলো? কমিউনিস্টদের এতো ত্যাগ-তিতিক্ষা, জেল-জুলুম-হুলিয়া উপেক্ষা করার পরও কেন তারা মানুষের ব্যাপক সমর্থন অর্জনে ব্যর্থ হলো? বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কেন বাম বা কমিউনিস্টরা জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় পেরে উঠলো না? গরিব মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অসংখ্য ঐতিহাসিক লড়াই-সংগ্রামে কমিউনিস্টরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন, কিন্তু মানুষের কাছে সেগুলো কেন শেষবিচারে ‘মূল্যহীন’ বিবেচিত হলো?

কেউ কেউ মনে করেন, কমিউনিস্টরা অতিমাত্রায় তত্ত্বনির্ভর। তারা যে ভাষায় কথা বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে সেগুলো বোধগম্য বা হৃদয়গ্রাহী হয় না। কমিউনিস্টদের মানুষ আপনজন না ভেবে দূর আকাশের তারা ভেবেছে। তাদের শ্রদ্ধার আসন দিয়েছে, কিন্তু ভোট দেয়ার প্রশ্ন এলে কমিউনিস্টরা সাধারণ মানুষের সমর্থন পায়নি।

কারো কারো ধারণা, কমিউনিস্টরা সময়ের সঙ্গে না চলে সময় থেকে আগে চলেছে। তত্ত্ব নিয়ে তর্কবিতর্কে যতো সময় তারা নষ্ট করেছে, তারচেয়ে কম সময় জনমনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য ব্যয় করলে তারা হয়তো বেশি সুফল পেতো। মানুষের জীবন তত্ত্বনির্ভর নয়। বাস্তবের কাঠখর জীবনের জন্য বেশি জরুরি। পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় বসলে কমিউনিস্টরা তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। তারা বিভিন্ন কমিউনিস্ট তাত্ত্বিকদের বইপত্র থেকে লাইনের পর মাইন উদ্ধৃত করে একটি জটিল অবস্থা তৈরি করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মিটিং করেন কিন্তু ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না। কমিউনিস্টরা ঐক্যসূত্র যতোটা না গাঁথতে পারে তার চেয়ে বেশি পারে ভাঙনের সুর বাজাতে পারে। তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বাম রাজনৈতিক দলগুলোকে একের পর এক ভাঙনের দিকে নিয়ে গেছে।

অনেকে মনে করেন, বামপন্থীরা ধর্মের প্রশ্নে সঠিক অবস্থান নিতে পারায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের দেশে সাধারণভাবে মানুষ মনে করে যে, কমিউনিস্টরা মূলত ধর্ম মানে না। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত কমিউমিস্টদের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে মিথ্যচার চালিয়ে এসেছে, বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। মানুষ যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে যতোটা না চালিত হয়, তারচেয়ে বেশি চালিত হয় আবেগ দিয়ে। কমিউনিস্টরা ধর্ম মানে না কিংবা তারা নাস্তিক এই অপপ্রচার কমিউনিস্টদের আগে আগে চলে।

এ ব্যাপারে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একাকার হয়ে গিয়েছিলো। তখন কমিউনিস্ট পার্টি ছিলো নিষিদ্ধ, বেআইনি। তাই কৌশলে কমিউনিস্টরা কাজ করতেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপের মাধ্যমে। পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি ছিলেন খান আব্দুল ওয়ালী খান। পূর্ব অংশের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন একটি ন্যাপ থাকলেও সে ন্যাপ সত্তরের নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ওয়ালী বা মোজাফ্ফর ন্যাপ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। আমরা ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা ছিলাম ন্যাপ প্রার্থীর পক্ষে। নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে আমরা তখনই বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে, গ্রামে গ্রামে রটে গেছে, ন্যাপের প্রার্থী ভালো, সব বিচারেই যোগ্য কিন্তু তাকে ভোট দেয়া যাবে না। কারণ তিনি আসলে কমিউনিস্ট এবং ধর্ম মানেন না।

ন্যাপ প্রার্থী যে ধর্ম মানেন এটা আমরা ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু সফল হয়েছি বলে মনে হয়নি। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রবল জোয়ার ছিলো আর ন্যাপের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো ধর্ম না মানার। ধর্মের প্রশ্নে বামপন্থীদের অবস্থান মানুষের কাছে পরিষ্কার না হওয়া তাদের জনবিচ্ছিন্নতার একটি বড় কারণ বলে মনে করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।

কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার আর একটি বড় কারণ বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তাদের ভুল সিদ্ধান্ত। ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তারা মানুষের কাছে, রাজনৈতিক মহলে সমালোচিত হয়েছে, নিন্দিত হয়েছে। এই বদনাম ঘুচিয়ে তারা মূলধারায় আসার চেষ্টা করেছে কিন্তু ততোদিনে ক্ষয় রোধের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে বামপন্থীরা।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত