প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানসিকতার পরিবর্তন না হলে দেশের উন্নতি জিন্দেগিতেও হবে না

কামরুল হাসান মামুন : ‘আলমা ম্যাটার’ এবং ‘অ্যালুমনাই’ বলে দুটি শব্দ আছে। আলমা ম্যাটার মানে হলো যেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা পড়াশোনা করেছি সেই প্রতিষ্ঠান ম্যাটার্স অর্থাৎ পর্বের বিষয়। আর যারা গর্ব করবে তাদের বলা হয় অ্যালুমনাই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো তার অ্যালুমনাই সদস্যরা। তারাই একেকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধসনধংংধফড়ৎ! শেষ বিচারে এরাই একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেমন তার মান নির্ণায়ক। সফল অ্যালুমনাইরাও তাদের জীবনের সফলতার জন্য তাদের আলমা ম্যাটারের কাছে ঋণী থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটি অধিক প্রযোজ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের জোগানের একটি বড় অংশ আসে অ্যালুমনাইদের কাছ থেকে। কারণ তাদের পূর্বসূরিরা দিয়েছিলো বলে তারা একটি ভালো প্রতিষ্ঠান পেয়েছিলো। আবার তারা দেবে বলে তাদের উত্তরসূরিরা ভালো প্রতিষ্ঠান পাবে এবং পেলেই কেবল তাদের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য ভালো মানের গ্রাজুয়েট পাবে।

খুবই দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালুমনাইদের মাঝে তাদের আলমা ম্যাটার ফিলিংসটা কেবল বছরে দুইয়েকবার মিটিং করে উৎসব করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শুধুই কি তাই তার চেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা পাস করে বের হয়ে আমলা হয়ে যান সেই আমলাদের মাঝে আলমা ম্যাটার অনুভূতিটা বড়ই ংঃৎধহমব প্রকৃতির। গতকাল যে পাস করে প্রশাসনের এন্ট্রি লেভেলে ঢুকেছে সে সেদিন থেকেই তার প্রতিষ্ঠান আর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রতিপক্ষ ভাবে। যোগ দেয়ার আগের দিন পর্যন্ত তার শিক্ষকদের নিয়ে তার অবস্থান আর যোগ দেয়ার পরদিন তার অবস্থান কেন জানি ভিন্ন হয়ে যায়। এটা শুধু আমলাদের ক্ষেত্রেই একমাত্র সত্যি তা না বরং অন্য সব ক্ষেত্রেও কমবেশি সত্যি। অথচ এ রকমটি হওয়ার কথা না। হয়েছে এর একটি কারণ শিক্ষকরা মানে আমরা সমাজের নানা বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা-সমালোচনা করি। এমনকি শিক্ষা এবং শিক্ষকদের বঞ্চনার একটি বড় কারণ হিসাবে এদেরকেই দায়ী করা হয়। এটা খুবই পরিতাপের বিষয় যে বিষয়টা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে।

অথচ সারা বিশ্বে অ্যালুমনাইরা যারা সামর্থ্যবান তারা তাদের আলমা ম্যাটার্সকে অর্থ অনুদান দিয়ে সহযোগিতা করে আর অন্যরা তাদের নিজ নিজ সামর্থ্য অনুসারে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে শিক্ষা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উন্নত হওয়ার পথ সুগম করে দেন। এই বছর এক ব্রিটিশ দম্পতি হার্ডিং এবং ক্লাউডিয়া তাদের আলমা ম্যাটার কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে একশো মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড বা একশো ত্রিশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দান করেন। এটাকে ধরা হয় কোনো একজনের কাছ থেকে ইতিহাসে সর্বোচ্চ অনুদান। আমলারা রাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত। তারা সরাসরি নিজেদের টাকা না দিলেও তারা ইচ্ছা করলে সরকারকে বোঝাতে পারে শিক্ষায় বিনিয়োগ কেন উন্নয়নের ষধঁহপযরহম ঢ়ধফ হিসাবে সারাবিশ্বে বিবেচিত হয়। অর্থ অনুদানের চেয়ে কোনো অংশেই কম হতো না। কেন আমাদের শিক্ষায় জিডিপির ১.৮ থেকে ২.২ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খায়? যেখানে ইউনেস্কো বলেছে উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো শিক্ষায় জিডিপির ন্যূনতম ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া।

হার্ভার্ড এমআইটি স্ট্যানফোর্ড ইয়েল, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড ইত্যাদি ইত্যাদি বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ধষঁসহর-রা অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা রাখে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ থেকে পাস করে জীবনে অনেক ধনী হয়েছে। তারা কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের ঋণের কথা কখনো স্মরণ করেন? কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আছেন যিনি তার সারা জীবনের প্রায় সমস্ত সঞ্চয় যেই বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন সেই বিভাগকে দিয়ে দিয়েছেন। উনার নাম অধ্যাপক শফি। মৎস্য বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। বিভাগের জন্ম থেকে সবকিছুই তার নিজের হাতে সাজানো। এই শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফর্মাল অবসরে গেছেন ২০০৫ সালে। অধ্যাপক শফির মৎস্য বিভাগের নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য তার নিজের উপার্জন থেকে জমানো প্রায় সত্তর লাখ টাকা আপন বিভাগকে দিয়ে দেন। এটা এক বিরল দৃষ্টান্ত। এই সমাজে অধ্যাপক শফির চেয়ে সামর্থ্যবানদের কি অভাব আছে?

এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে অনেকেই বড় বড় ঠিকাদার হয়ে এখানকার বিভিন্ন ভবন নির্মাণের কাজ পান। তারা ইচ্ছা করলে লাভ কম করে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করে কাজটি করতে পারেন। কিন্তু তারা কি করেন? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে যারা কাজ পান তাদের আরো মানবিক হতে হবে। আমরা দেখেছি গ্রামের প্রাইমারি স্কুল নির্মাণের যারা কাজ পায় তারা কি নিম্নমানের কাজ সেরে সর্বোচ্চ মুনাফা করে। অথচ এ রকম হওয়ার কথা ছিলো না। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে দেশের উন্নতি জিন্দেগিতেও হবে না। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ