প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইতিহাস
চৌদ্দশ বছরের তারাবি

মুজাহিদুল ইসলাম : রমজানের চাঁদ ওঠার সাথে সাথে মুসলমানরা পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় করে, এ মাসের বিশেষ আমলের প্রস্ততি নিতে থাকে। তবে বিশেষ মনযোগ কুরআন তেলাওত ও তারাবির ব্যাপারে। তারাবিতে সকল বয়সের মুমিন রাতভর মসজিদপ্রাঙ্গণে আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকে।

ইসলামের উদয়কালে কীভাবে সূচিত হলো এ পূণ্যময় আমলের, শতাব্দী-পরিকক্রমায় কীভাবে তা ইবাদাতের পাশাপাশি সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক এবং ফিকহি ও আকিদাগতভাবে মুসলিম ইতিহাসে তারাবি কোন ধরনের ভূমিকা রেখেছে? এ মহান আমলের ইমামতির সাথে কারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন? আবার তারাবি পড়াবার জন্য মৃত্যুদণ্ডাদেশের মুখোমুখি হতে হয়েছে কাদেরকে? ইতিহাসের এসব তথ্য সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরতেই আজকের আয়োজন।

ফারুকি উদ্যোগ
আল্লামা ইবনুল মুবাররাদ (মৃত্যু : ৯০৯) ইসলামে তারাবির নামাজের সূচনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এভাবে বলেন : ‘কেউ যেন এমন ভুল না বুঝে যে, তারাবি উমর রা.-এর তৈরি এবং তিনিই প্রথম এটার প্রচলন করেছেন। বরং এটা তো নবিযুগের আমল। উমর রা. কেবল লোকদেরকে একজন কারির পেছনে একত্রিত করেছেন। মানুষ নিজের মতো একাকী নামাজ আদায় করতেন। উমর রা. তাদের একজন কারির পেছনে একত্রিত করেন… আর তারাবির নামরকরণ? তা তো প্রতি চার রাকাত পর পর বিশ্রাম গ্রহণ করার কারণে রাখা হয়েছে।।’

ইবনুল মুবাররাদের ছয় শতাব্দী আগে ইতিহাসের জনক তাবারি উমর রা. কর্তৃক লোকদেরকে এক ইমামের পেছনে একত্রিত করার নির্দেশনার সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘১৪ হিজরিতে উমর রা. সকল অঞ্চলে এক ইমামের তারাবিতে সকলকে একত্রিত করার লিখিত নির্দেশনা প্রেরণ করেন। উমর রা. পুরুষ ও নারী প্রত্যেকের জন্য আলাদা ইমাম নির্ধারণ করে দেন; উম্মাহাতুল মুমিনিন নিজেদের মর্যাদার দিক বিবেচনা করে হয়তো তাঁরা নারীদের সাধারণ জামাতে অংশ গ্রহণ করতেন না। যেমন একটি বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয়, আয়েশা রা.-এর আজাদকৃত গোলাম জাকওয়ান তারাবির নামাজে আয়েশা রা.-এর ইমাম ছিলেন।’

এমনকি ইতিহাসের আঁকর গ্রন্থগুলো আমাদের সামনে সে-সকল কারিদের নাম তুলে ধরতে ভুলে যায়নি।। পুরুষদের ইমাম ছিলেন উবায় বিন কা’ব (মৃত্যু : ২২), যিনি বিশ বছর সবাইকে নামাজের ইমামতি করেন, মুয়াজ বিন আল-হারেস আল -আনসরি (মৃত্যু : ৬৩)।

নারীদের ইমাম ছিলেন তামিম বিন আওস আদ-দারি (মৃত্যু :৪০), সুলায়মান বিন আবি হাসমাহ আলকুরশি এবং আমর বিন হুরায়েস আল-মাখজুমি (মৃত্যু : ৮৫)।

সুন্নি স্কলারদের নিকট তারাবির নামাজ সুন্নাত; ফরজ নয়। তবে এ নামাজ মসজিদে আদায় করতে হয়। কারণ, এটা মুসলিমদের শি’য়ার। এটা অন্যান্য ফরজে কিফায়া ও সুন্নাতের মতো শিয়ার। যেমন : ঈদের নামাজ।

রমজান মাসে মসজিদে বাতি বৃদ্ধি করাকেও উত্তম বলে মত দিয়েছেন ইসলামিক স্কলারগণ। তাঁরা বলেন, ‘আলি রা. রমজানে মসজিদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। মসজিদে লণ্ঠন দেখতে পেয়ে বলেন, আল্লাহ উমর রা.-এর কবরকে আলোকিত করুন। যেভাবে তিনি আমাদের জন্য মসজিদকে আলোকিত করেছেন।’

রমজানে সাহাবাদের অনুসরণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম তারাবির নামাজ আদায় করলেও কিছু বিচ্ছিন্ন মতামত দেখা যায়, যাঁরা এটাকে উমরের বিদআত বলার চেষ্টা করেন। যেমন জায়দিয়্যাহ কিছু ইমাম ব্যতীত পুরা শিয়াসম্প্রদায় এ মতবাদে বিশ্বাসী। ইমাম মাকরিজি (মৃ্ত্যু : ৮৪৫) বলেন, মু’তাজিলার নিজামিয়া সম্প্রদায় তারাবির নামাজকে নাজায়েজ মনে করে।

তারাবির প্রসিদ্ধ কজন ইমাম
যুগেযুগে সমাজের বিভিন্ন স্তর হতেই রমজানের তারাবির জন্য ইমাম হয়েছেন। বড় বড় আলেম, প্রথিতযশা কারি, প্রসিদ্ধ পর্যটক, নামিদামি ব্যবসায়ী এমনকি মজদুর পর্যন্ত তারাবির নামাজের ইমাম হয়েছেন।
ইসলামের ইতিহাসে কুরআনের সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ তাফসিরগ্রন্থের কৃতিত্বের অধিকারী ইমাম তাবারি (মৃ্ত্যু : ৩১০), তৎকালীন কারিদের মুকুট আবু বকর বিন মুজাহিদ আল-বাগদাদি (মৃত্যু : ৩২৪) এবং যুগের কণ্ঠস্বর ইমাম আল-জাওজির (মৃত্যু : ৫০৭) মতো জ্ঞান জগতের তারকা রমজানের তারাবির ইমামতি করেছেন।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনু আসাকির (মৃত্যু : ৫৭১) বলেন, তাঁর শায়েখ কারি আবুল ফাতাহ আল-আনসারি আল-মাকদিসি (মৃত্যু : ৫৩৯) দিমাশকের আলি বিন হুসাইন মসজিদে তারাবির নামাজ পড়াতেন। আবু জাফর বিন আল-ফানাকি আশ-শাফেয়ি (মৃত্যু : ৫৯৬)-এর তারাবির নামাজের তেলাওত শোনার জন্য মানুষ ভিড় করতো।

ইসলামের বুদ্বিবৃত্তিক ইতিহাসের মানসপুত্র শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ আল-হাররানির (মৃত্যু : ৭২৮) ব্যপারে তাঁর ছাত্র ঐতিহাসিক ইবনুল ওয়ারদি বলেন, ‘রমজানে আমি তাঁর পেছনে নামাজ আদায় করেছি। তাঁর তেলাওতে দেখেছি বিনম্রতা। দেখেছি হৃদয়তন্ত্রীকে কবজা করে নেয়ার অপূর্ব ক্ষমতা।’

প্রখ্যাত পর্যটক ও ফকিহ ইমাম মাকদেসী (মৃত্যু : ৩৮০) তাঁর ইয়ামান ভ্রমণ সম্পর্কে বলেন, ‘আদানের বাসিন্দারা রমজান মাসে নামাজে কুরআন খতম করতেন। আমিও তাঁদের তারাবি পড়িয়েছি। সালামের পর দোয়াও করেছি। তাঁরা খুবই চমৎকৃত হতেন।’

ব্যতিক্রম নন ব্যবসায়ীগণও। প্রখ্যাত ব্যবসায়ী ও কারি আবু আল-হিলালি (মৃত্যু : ৫৪৬), মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খাজা জামাল উদ্দিন (মৃত: ৮২৪) এবং মক্কার খাদিম আহমাদ বিন আবদুল্লাহ আদ-দাওরি আল-মাক্কি (৮১৯) রমজানে তারাবির নামাজ পড়াতেন।

এ বিষয়ে অবাক করার মতো একটি ঘটনা ঐতিহাসিক সালাহউদ্দিন সাফদি (মৃত্যু : ৭৬৪) বর্ণনা করেন। ইহুদি পণ্ডিত মুসা বিন মায়মুন আল-কুরতুবি মরক্কে কৌশলগত কারণে ইসলাম গ্রহণ করেন। কুরআন হিফজ করে ফিকহের ওপরগ পাণ্ডিত্য অর্জ।ন করেন। মরক্কো হতে নদীপথে মিসরে আসার সময় নদীতেই তারাবির নামাজ পড়ান। মিসরে আসার পর একপর্যায়ে পূর্ব ধর্মে ফেরত যান। এবং ইহুদিদের প্রধান নিযুক্ত হন।

কুরআন তেলাওতে দক্ষতা
তারাবির ইমামগণ চমৎকার তেলাওত, শ্রুতিমধুরতা, দক্ষতা ও একই দিনে নামাজে প্রচুর তেলাওতের ঘটনায় ইতিহাসের পাতায় স্বরণীয় হয়ে আছেন। দিমাশকের প্রধান বিচারপতি আবুল হাসান ইমাদ উদ্দিন আত-তারতুসি আল-হানাফি (মৃত্যু : ৭৫৮) সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষের নামাজে কোরআন খতম করে শোনাতেন।

কারি আবুল হাসান কামাল উদ্দিন আল-হামিরি আল-ইসকান্দারি আল-মালিকি (মৃত্যু : ৬৯৪) রমজানজুড়ে প্রতি রাতে ১৫ পারা কুরআন নামাজে তেলাওত করতেন।

তারাবির অনেক ইমাম সাত কেরাত, কখনো দশ কেরাতে তারাবির নামাজ আদায় করতেন। পূর্বে বর্ণিত আবু আলি আল-হিলালি দিমাশকের মসজিদে তারাবির নামাজে একাধিক রেওয়ায়াতে তেলাওত করতেন। একই শব্দের বিভিন্ন রেওয়ায়াতও পড়তেন। আবু আব্বাস আল-বারদানি আল-বাগদাদি (মৃত্যু : ৬২১) তারাবিতে প্রসিদ্ধি লাভের জন্য শাজ রেওয়ায়াতে তেলাওত করতেন। অনুরূপভাবে কারি মুহাম্মাদ বিন আহমাদ আল-মাকদেসি আশ-শাফেয়ি (মৃত: ৮৮৫) তারাবির নামাজে পুরা কুরআন খতম দিতেন। এবং প্রতি দশ দিনে এক কেরাতে নামাজ পড়াতেন।

তারাবির কোনো কোনো প্রসিদ্ধ ইমাম তো বছরের পর বছর একই মসজিদে তারাবিহ পড়িয়েছেন। আবুল হাসান বিন দাউদ আল কুরশি আল-কুফি (মৃত্যু : ৩৫২) ছিলেন খুবই সুললিত কণ্ঠের অধিকারী। কুফার জামে মসজিদে একাধারে ৪৩ বছর তারাবির নামাজ পড়িয়েছেন। আবু আবদুল্লাহ নিসাপুরি (মৃত্যু : ৩৯২) ৬৩ বছর খতম তারাবি পড়িয়েছেন। কারিম উদ্দিন আবু জাফর আল আব্বাসি (মৃত্যু : ৫৭৪) বাগদাদের প্রেসিডেন্টপ্রাসাদে প্রায় ৫০ বছর তারাবির নামাজ পড়িয়েছেন।

তারাবির বিশেষ জামাত
রমজানের সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষ আচরণ হলো, সামাজিকভাবে উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন ও রাজা-বাদশাহদের নামাজ পড়ানোর জন্য সুন্দর তেলাওতের অধিকারী হাফেজ নির্বাচন করা। হাফেজ জাহাবি (মৃত্যু : ৭৪৯) বলেন, আব্বাসি খলিফা মুসতাজহির বিল্লাহ (মৃত্যু : ৫১২) হাফেজ সাহেবের তেলাওতে মুগ্ধ হয়ে প্রতিদিন এক পারা কুরআন তেলাওত নামাজে শুনতেন। যেখানে খুবই অল্প তেলাওত শ্রবণের রেকর্ড রয়েছে তাঁর।

অনুরূপভাবে কারি আবুল খাত্তাব আলবাগদাদি (মৃত্যু : ৪৯৭) আমিরুল মুমিনিন মুসতাজহির বিল্লাহকে তারাবি পড়াতেন। জাহাবির মতে সুলতান বিন ইয়াহয়াহ আল কুরশি (মৃত্যু : ৫৩০) বাগদাদের নিজামিয়্যাহ মাদরাসায় তারাবিহ পড়ান। আব্বাসি খলিফা তাঁকে সন্মানসূচক বিশেষ পোশাক দেন।

উন্দুলুসে ইবনু মুকাতিল আল কিসি গ্রানাডি (মৃত্যু : ৫৭৪) চমৎকার তেলাওয়াতকারী ছিলেন। গ্রানাডার কেন্দ্রীয় মসজিদে তাঁকে তারাবির ইমাম নিযুক্ত করা হয়। খোদ সুলতান মানসুর কারি আবুল হাসান ফাহমি কুরতুবির তেলাওতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ঘনিষ্ঠ করে নেন। এবং নিজ সন্তানদের শিক্ষাদানের দায়িত্ব দেন।

আবুল হাসান ইবনে ওয়াজিব আল কিসির তেলাওত সুন্দর হওয়াতে তাঁকে শাসকদের তারাবির ইমাম নিযুক্ত করা হয়। মুহাম্মদ বিন কাসেম আল আনসারি আল জিয়ানি সুললিত কণ্ঠের অধিকারী হওয়ার কারণে হামরাপ্রাসাদের মসজিদে তারাবির নামাজ পড়াতেন।

এমনকি বড় বড় আলেমগণও মাঝে মাঝে তারাবিহ পড়ানোর জন্য অন্যদের নিতেন। আবু হাফস বলেন, আমি আহমাদ ইবনে হাম্বলের (মৃত্যু : ২৪১) সাথে রমজানে তারাবি পড়েছি। ইবনু উমায়ের তাঁর নামাজ পড়াতেন। ইমাম সাখাবি কারি বাদরুদ্দিন বিন তাকি আল কাবানি (মৃত্যু : ৮৪৪)-এর জীবনীতে লেখেন, ‘তিনি আমাদের শায়েখ ইবনু হাজারকে (মৃত্যু :৮৫২)-কে মৃত্যুর আগ পযন্ত তারাবি পড়িয়েছেন।’

খতিবে বাগদাদি (মৃত্যু :৪৬৩) বলেন, ইমাম কানাবি (মৃত্যু : ২২১) (যিনি মালিক বিন আনাসের মুয়াত্তার বর্ণনাকারী) ইবনু ইবাদ নাসায়ির (মৃত্যু :১৭৯) ছাত্র। ইবনু ইবাদ তাঁকে তারাবির নামাজের জন্য নির্বাচন করেন। অন্যদিকে কোনো কোনো বড় ইমাম নিজেরা একাকী ঘরে তারাবি পড়তেন। ইমাম শাফেয়ি (মৃত্যু : ২০৪) মানুষের সাথে মসজিদে নামাজ পড়তেন না। বরং বাড়িতে একাকী ৬০ খতম তেলাওত করতেন।

রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
তারাবির বৈধতার ব্যাপারে মাজহাবি মতবিরোধ তো আছে। কিন্তু প্রশাসনের ছত্রছায়ায় তারাবিহ বন্ধের ইতিহাসও রয়েছে। ইসমাইলি শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ফাতেমিরা তাদের শাসন-ইতিহাসে হিজাজ, শাম, মিসরসহ তাদের শাসনাধীন অঞ্চলে তারাবির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফাতেমি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে এর অনুসারীরা অনুসারীদের বলতো, ‘আমাদের মাজহাব হলো, তারাবি আদায় না করা; কারণ, তা নবিজির সুন্নত নয়, বরং উমরের প্রচলিত সুন্নত।’

সিবত ইবনুল জাওজি (মৃত্যু : ৪১১) বলেন, ফাতেমি খলিফা মানসুর (মৃত্যু : ৩৩৪) তাঁর বাপ-দাদার কর্মপন্থার বিপরীতে তারাবির অনুমোদন দেন। ঐতিহাসিক ইবনু সাইদ আনতাকি (মৃত্যু : ৪৫৮) বলেন, ফাতেমি খলিফা আজিজ বিল্লাহ (মৃত্যু : ৩৮৬) মিসরে তারাবির নামাজের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে সুন্নি মুসলিমগণ বড় কঠিন হয়ে যায়। তবে তার পরবর্তী হাকিম বিআমরিল্লাহ (মৃত্যু : ৪১১) সাময়িকভাবে তা আদায়ের অনুমতি দেন। পরে আবার ১০ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেন। এবং এ আইন অমান্যকারীদের মৃত্যুদণ্ডাদেশের আদেশ দেন।

মাকরিজি বলেন, ৩৯৯ হিজররিতে হাকিম রমজান মাসে তারাবির নামাজ পড়াবার অপরাধে রাজা বিন আবুল হুসাইনকে হত্যা করেন। ফাতেমিদের তারাবির নামাজের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার কারণে বায়তুল মুকাদ্দাসে শায়েখ আবুল কাসেম আল ওয়াসিতিকে মারতে মারতে প্রায় মৃত্যুর মুখে ফেলে দেয়া হয়।

এই হাকিম বিআমরিল্লাহ ৪০৮ হিজরিতে পুনরায় তারাবির নামাজের অনুমতি দেন। এবং আনুষ্ঠানিকভাবে মিসর ও অন্যান্য জায়গার মসজিদে তা আদায় করা হয়। তার শাসনামলে কখনো অনুমোদন, কখনো নিষেধাজ্ঞা–এমন সিদ্ধান্তহীনতার মধ্য দিয়েই ঘোরপাক খেয়েছেন তিনি।

তারাবির জন্য মাজহাবভিত্তিক একাধিক জামাত
মক্কার হারামে তারাবির অদ্ভুত আয়োজনের মধ্যে রয়েছে ফিকহি মাজহাবভিত্তিক একাধিক মিহরাব ও জামাত। মুসলিম উম্মাহের ঐক্য-বিনষ্টের সর্বশেষ আরেক দৃশ্য। মুসলিমগণ তাদের এক কাবাতেই চার মাজহাবের আওতায় ভিন্নভিন্নভাবে ইবাদাত করতে থাকে। মুজিরুদ্দিন আল আলিমি হাম্বলির (মৃত্যু : ৯২৮) বর্ণনামতে শাফেয়ি মাজহাবের ইমাম মাকামে ইবরাহিমে, হানাফি মাজহাবের ইমাম হাজরে ইসমাইলের বিপরীতে, মালেকি মাজহাবের ইমাম রুকনে ইয়ামানি ও শামির মাঝামাঝিতে এবং হাজরে আসওয়াদের বিপরীতে হানাবেলা মাজহাবের ইমাম নামাজ পড়ান।

অভ্যাস অনুসারে একাধিক জামাতের এ ব্যবস্থা ৪৯৭ হতে শুরু করে বর্তমান ক্ষমতাসীন আলে সাউদ পযন্ত অব্যাহত থাকে। ৪৯৭ হিজরিতে ইমাম আবু তাহের সিলাফি (মৃত্যু : ৫৭৬) মক্কায় মাজহাবভিত্তিক তারাবির একাধিক জামাতের মিহরাব, নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে তাদের বিন্যাস ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। তার কয়েক শতাব্দী পর ঐতিহাসিক সামহুদি (মৃত্যু : ৯১১) মাজহাবভিত্তিক মিহরাব ও বিশ্বজুড়ে অনুরূপ আমলের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘মক্কা হতে এটা মদিনায় সংক্রমিত হয়। অনুরূপভাবে বায়তুল মুকাদ্দাস ও জামে মিসরে চলতে থাকে। এমনকি পরবর্তীতে ফিলিস্তিনের মসজিদে খলিলেও তা অনুসৃত হয়।

প্রখ্যাত আন্দালুসি পর্যটক আবুল বাকা আল-বালবি (মৃত্যু : ৭৬৭) বায়তুল মুকাদ্দাসের তারাবির দৃশ্যের চিত্রায়ন করেন। তিনি বলেন, ‘রমজান মাসের তারাবির নামাজের জামাতসংখ্যা সেখানে প্রায় চল্লিশটি আমি পেয়েছি।

কখনো কখনো একই মসজিদের একাধিক জামাতের কারণে সৃষ্ট বিশৃংখলা এবং কারিদের তেলাওতের কারণে মুসল্লিদের সমস্যার বিবেচনায় সরকার সেখানে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়। ইবনু কাসির (মৃত্যু : ৭৭৪) বলেন, দিমাশকের জামি উামাবিতে চার মাজহাবের একাধিক মেহরাব ছিল। তার সময়ে তারাবির নামাজে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে সবাই এক ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করেন।

৯২৬ হিজরির রমজানে দিমাশকের উসমানি শাসক জামে উমাবির হানাফি ইমামকে একরাতে এবং শাফেয়ি ইমামকে একরাতে নামাজ পড়াবার আদেশ দেন। শাফেয়ি মাজহাবের কট্ররপন্থীরা হানাফি মিহরাবে নামাজ ত্যাগ করে।

শিশুদের ইমামত
আলেমদের মাঝে শিশুদের ইমামত নিয়ে মতভেদ থাকলেও রমজানে শিশুদের দিয়ে তারাবির নামাজের বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। বিশেষত মক্কার হারামে। ঐতিহাসিকভাবে শিশুদের দিয়ে তারাবির ব্যাপারে জানা যায় যে,সিরাজের বাসিন্দারা শিশুদের দিয়ে তারাবির নামাজ আদায় করাতেন।

হিজাজ ও মিসরে ১২ বছর হলে বাচ্চাদের দিয়ে তারাবি পড়ানোটা ঐতিহ্য হয়ে ওঠে। ইবনু বতুতা (৭৭৯) মক্কার তারাবির বিষয়ে তাঁর সফরের অভিজ্ঞতার কথা বলেন, ‘প্রত্যেক মাজহাবের জন্য সেখানে আলাদা-আলাদা মিহরাব রয়েছে। রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে তাঁরা খতম করতেন। খতমে বিচারক ও বড় বড় ফকিহ অংশ নিতেন। মক্কার বড় মানুষদের সন্তানরা তারাবির খতম করতেন। যখন কুরআন খতম করা হতো, শিশুইমামের জন্য রেশম দিয়ে সুসজ্জিত মিম্বার বানানো হতো। আলো প্রজ্বলিত করা হতো। সেখানে ইমাম আলোচনা করতেন। আলোচনা শেষে তাঁর পিতা লোকদেরকে তার বাসায় দাওয়াত দিয়ে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন।

হাদিসের প্রখ্যাত ইমাম ইবনু হাজর আসকালানি হাফেজ ছাত্রদের সাথে ১২ বছর বয়সে মক্কাতে তারাবিহ পড়ান। মক্কার কাজি ও মুফতি মুহিব্বুদ্দিন বিন জহিরাহ (৮২৭) ১০ বছর বয়সে তারাবির ইমামতি করেন।

রাকাআত সংখ্যা ও লিখনী
তারাবির রাকাআত সংখ্যা নিয়ে ফিকহি মাজহাবের মধ্যে মতবিরোধ সর্বশেষ চৌদ্দশত শতাব্দী পযন্ত ছিল। ইবনু বতুতার বক্তব্য অনুসারে মক্কাবাসীরা স্বাভাবিকভাবেই বিশ রাকাআত তারাবিহ ও তিন রাকাআত বিতর আদায় করতেন। অন্যদিকে মদিনারবাসীদের আমলের ব্যাপারে ইমাম নববি (মৃত্যু : ৬৭৬) ইমাম শাফেয়ির সূত্রে বলেন, ‘আমি মদিনাবাসীদের ত্রিশ রাকাআত তারাবিহ ও তিন রাকাআত বিতর পড়তে দেখেছি।

হাদিস ও ফিকহের কিতাব আমাদেরকে তারাবির নামাজ ও তার পরিমাণ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। আবার কোনো কোনো আলেম তারাবিহ বিষয়ে স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেছেন। এর অধিকাংশের শুধু শিরোনামই আমাদের কাছে পৌঁছেছে। ফাজলুত তারাবিহ : হাফেজ আবু বকর মুহাম্মাদ বিন হাসান (৩৫১), কিতাবুত তারাবিহ : ইমাম হুসামুদ্দিন, কিতাবুত তারাবিহ : খাওয়ারিজমের মুফতি আহমাদ বিন ইসমাইল আল-হানাফি (মৃত্যু: ৬০০)

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মুসলিমগণ তারাবির নামাজ বেশ আনন্দের সাথে আদায় করে। সমাজের নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সবাই গুনাহ মাফের আশা নিয়ে এ মাসকে স্বাগত জানায়। ইবাদাত-বন্দেগিতে তাদের সময় অতিবাহিত হয়। ইবনু বতুতা ভারতের ব্যাপারে বলেন, ভারতে গায়কদের বাজার রয়েছে। সেখানে অনেক মসজিদও আছে। সেখানকার পুরুষ গায়কদের পাশাপাশি গায়িকারাও সেসব মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় করতো।

মাকরিজি কায়রোকে ‘মোমবিক্রেতাদের বাজার’ বলে উল্লেখ করেন। কারণ, সেখানে রমজান মাসে তারাবির নামাজের শিশুইমামদের জন্য প্রচুর পরিমাণে আলোকসুসজ্জিত বাহন বিক্রি হতো। (সূত্র : আল-জাজিরা)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত