প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মুক্তিযুদ্ধে মুসলিম দেশসমূহের অবস্থান

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : বাংলাদেশর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুসলিম দেশসমূহের সাধারণ প্রতিক্রিয়া ছিলো নেতিবাচক ও বিরোধিতামূলক এবং পাকিস্তানকে অন্ধ সমর্থনকারী। তবে অনুপুঙ্খভাবে বললে, কিছু মুসলিম দেশ বাংলাদেশ বা পাকিস্তান কোনো পক্ষকে সমর্থন করেনি, বরং তারা উভয়পক্ষ থেকে সমান দূরত্ব বজায় রেখে মৌনতা অবলম্বন করেছিলো। মোটা দাগে বললে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রতিক্রিয়ার বিচারে মুসলিম দেশসমূহকে চারটি দলে ভাগ করা যায়। প্রথম দল পাকিস্তানের সামরিক অভিযানকে যথার্থ মনে করেছে, এবং প্রত্যক্ষ সামরিক সহযোগিতা করেছে। এই দলে ছিলো সৌদি আরব, ইরান, লিবিয়া, জর্দান এবং তুরস্ক। বিশেষ করে ইরান তো পাকিস্তানের এই বিপদে তার পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করে।

দেশটি পাকিস্তানকে ৫২টি জঙ্গি-বিমান, অনির্দিষ্ট সংখ্যক হেলিকপ্টার ও ট্যাংক সরবরাহ করে। সৌদি আরব পাঠিয়েছিলো ৭৫টি জঙ্গি-বিমান, আর জর্দান দিয়েছিলো ১০টি এফ-১০৪ বিমান। উল্লেখ্য, এসব সামরিক সরঞ্জাম ছিলো আমেরিকার দেয়া, সেগুলোই ঘুরপথে আমেরিকার নির্দেশে পাকিস্তানে পাঠানো হয়। কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন প্রশাসন সরাসরি পাকিস্তানকে অস্ত্র-সাহায্য করতে অপারগ হওয়ায় এই কূটবুদ্ধি অনুসরণ করতে হয়। উল্লেখ্য, এমন মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে সৌদি আরব বিশেষভাবে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ বৈরী ছিলো। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, ৮ এপ্রিল সৌদি সাময়িকী আল মদিনাতে নির্বাহী সম্পাদক মুহাম্মদ সালেহ উদ্দীন এক প্রবন্ধ লেখেন। ‘এ স্যালুটেশন টু পাকিস্তান’ শিরোনামের প্রবন্ধটিতে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয় : ‘মুজিব একজন চিন্তাশক্তিরহিত জুয়ারীর মতো মানুষ, যে ক্ষমতালোভী এবং তা তার জাতি ও মানুষের ক্ষতি করে হলেও।’ লেখক একটি সত্য এড়িয়ে গেছেন যে, বৈধভাবে নির্বাচিত গরিষ্ঠ দলের কাছে সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ফলে সংকট তৈরি হয়েছিলো।

দ্বিতীয় দলের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ পাকিস্তানকে নৈতিক সমর্থন ও পরোক্ষ সহযোগিতা দিয়েছিলো। এদের মধ্যে ছিলো কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মরক্কো। তৃতীয় দলে ছিলো ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিসর, সুদান, আলজেরিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাক। এই রাষ্ট্রগুলো মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষ ছিলো। চতুর্থ দল আগাগোড়া মৌনতা অবলম্বন করেছে। এই দলভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ ছিলো সোমালিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন, লেবানন, চাদ, তিউনিসিয়া, নাইজেরিয়া, গায়ানা, মৌরিতানিয়া, সেনেগাল এবং মালি।

উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই কিছু মুসলিম রাষ্ট্র তড়িঘড়ি করে পাকিস্তানের সমর্থনে বিবৃতি দেয় : দেশ এবং বিবৃতি প্রদানের তারিখ : ইন্দোনেশিয়া, ২৭ মার্চ (পরে অবশ্য নিরপেক্ষ থাকে)। ইরান, ২৮ মার্চ।  সংযুক্ত আরব আমিরাত,  ৩০ মার্চ। তুরস্ক,  ৩ এপ্রিল। মালয়েশিয়া, ৩ এপ্রিল (পরে অবশ্য নিরপেক্ষ থাকে)। লিবিয়া, ৭ এপ্রিল। সিরিয়া ১৫ এপ্রিল  এবং সৌদি আরব২৮ এপ্রিল।

মুসলিম বিশ্বের এমন নীতি-অবস্থানের (যদিও তা কখনই অভিন্ন বা সমধর্মী ছিলো না) পেছনে কিছু ব্যাখ্যাযোগ্য কারণ আছে। প্রথমত, বাঙালি আত্মঅধিকার প্রতিষ্ঠার পেছনে ক্রিয়াশীল ছিলো ভাষিক-নৃতাত্ত্বিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যাতে আত্মপরিচয় বা গণআন্দোলন কোনো পর্যায়েই ইসলামের সংশ্লেষ ছিলো না বলেই মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ ধারণা করেছিলো। কাজেই তাদের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ ছিলো পাকিস্তানের ইসলামি সংহতি বিনষ্টির অশুভ উদ্যোগ। দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক (এবং ধর্মে আস্থাহীন) তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মুসলমান বৈরী ইসরাইলের সমর্থন ও সহযোগিতা (বাংলাদেশ ইসরাইলি উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে) মুক্তিযুদ্ধকে মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তৃতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে ভারতের সম্পৃক্ততা মুসলিম বিশ্বের কাছে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রকৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলো। কারণ তাদের দৃষ্টিতে ভারত ছিলো ‘হিন্দু ভারত।’ সর্বোপরি পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বকে বোঝাতে পেরেছিলো যে, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আসলে ইসলাম এবং ইসলামী ঐক্য-সংহতি বিপন্ন।

মুক্তিযুদ্ধে মুসলমান রাষ্ট্র্যসমূহের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠন ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) (বর্তমানে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা) ভূমিকাও বিবেচ্য। সেসময় ২২ সদস্যের (বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৫৭) এই সংস্থা সবসময়ই মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে শনাক্ত করেছে, যার উৎপত্তি বাইরের ষড়যন্ত্রে এবং এই কারণে পাকিস্তানের প্রতি সংস্থাটির সমর্থন অব্যাহত থেকেছে। ২৯ মার্চ সংস্থার মহাসচিব টুংকু আবদুর রহমান একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকটে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। কোনো অনুরোধ-উপরোধে পরবর্তী সময়ে সংস্থাটির এমন পাকিস্তানপন্থি ও বাংলাদেশবৈরী নীতিতে পরিবর্তন হয়নি। ২০ এপ্রিল একটি চিঠিতে জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট সংস্থার মহাসচিব টুংকু আবদুর রহমানকে সংকটে মধ্যস্থতা করার অনুরোধ করেন, কিন্তু কাজ হয়নি। উপরন্তু ২৫ জুন জেদ্দা সম্মেলনে ‘পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি ও আঞ্চলিক অখ-তার’ প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করা হয়। একই সময়ে প্রকাশিত ইশতেহারে পূর্ব পাকিস্তান সংকটে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়। ২৬ জুন দিল্লিতে কর্মরত বাঙালি কূটনীতিক কে. এম. শিহাবুদ্দীন (যিনি পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেছিলেন) মহাসচিবের কাছে লেখা এক চিঠিতে সংস্থাটির ভ্রান্তি নিরসনের জন্য লিখেছেন, ‘পাকিস্তান এখন মৃত এবং শহীদের মরদেহের নিচে সমাধিস্থ হয়েছে।’

জুলাই-আগস্টে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদও বেশ আবেগময় ভাষায় মহাসচিবকে চিঠি লিখে নীতি বদলাতে অনুরোধ করেন, কিন্তু কিছুই হলো না। বিশেষ করে তাজউদ্দীন আহমেদের চিঠি মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের পাকিস্তানপন্থি নীতিতে ইসলামী উপাদানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একটি পর্যায়ে চিঠিতে বলা হয়, ‘তাদের (মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ) পক্ষে এমন চিন্তা মর্মান্তিক যে, ইয়াহিয়ার দঙ্গল ইসলামি ন্যায়যুদ্ধ পরিচালনা করছে। সুতরাং এই দেশসমূহের নীরবতা উপনিবেশবাদ ও বর্বরতাকে সমর্থন করছে। যে দেশগুলো ইসলামাবাদকে প্রত্যক্ষ বৈষয়িক সহযোগিতা দিচ্ছে তারা আসলে স্বৈরাচারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।’ উপরে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ইসরাইলের সমর্থনের প্রসঙ্গ এসেছে, তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী গুরুত্বের বিচারে বিষয়টি খোলাসা করা দরকার। ২ জুলাই দেশটির সংসদে, যা নেসেট (কহবংংবঃ) নামে অভিহিত, সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাশবিকতা, ধ্বংস এবং নির্মম নির্যাতনকে নিন্দা জানানো হয়।

উপরন্তু ম্যাজেন ডেভিড এডম (গধমবহ উধারফ অফড়স) (ইসরাইলের রেডক্রস) ভারতে বাঙালি শরণার্থীর জন্য খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম পাঠায়। বোঝা যায়, ইসরাইলের উদ্দেশ্য ছিলো মুসলিম বিশ্বের সমর্থন-সহযোগিতাবঞ্চিত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে কূটনৈতিক ফায়দা সংগ্রহ করা। কিন্তু ইসরাইলের প্রতি সাড়া না দিয়ে মুজিবনগর সরকার কূটনৈতিক বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুসলিম বিশ্বের সামগ্রিক নীতি যে, পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দুর্বল ও বিচারবুদ্ধিহীন ছিলো প্রমাণ পাওয়া যায় মোহাম্মদ হায়কল নামে মিসরের যশস্বী সাংবাদিকের জবানিতে। তিনি ১৯৭৩-এর জানুয়ারিতে সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে ঢাকায় স্বীকার করেন, ‘সম্পূর্ণ ব্যাপারটি আমাদের কাছে পরিষ্কার ছিলো না। এখন আমরা অনুভব করি যে, আমাদের ধারণার বাইরে ঘটনা ঘটেছে।

লেখক : বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্ (বিইউপি)

 

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত