প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

২০ রাকাত তারাবি পড়া সুন্নত

আমিন মুনশি : রমজান মাসে রাতের বেলায় ইশার নামাজের পর এবং বিতর নামাজের আগে দুই দুই রাকাত করে ১০ সালামে যে ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা হয়, একে তারাবি নামাজ বলা হয়। আরবি ‘তারাবিহ’ শব্দটির মূল ধাতু ‘রাহাতুন’ অর্থ আরাম বা বিশ্রাম করা। বিশেষ করে প্রতি চার রাকাত পর একটু বসে বিশ্রাম করতে হয় এবং দোয়া ও তসবিহ পাঠ করতে হয়। এ জন্য এই নামাজকে ‘সালাতুত তারাবিহ’ বা তারাবি নামাজ বলা হয়।

রমজান মাসের বিশেষ নামাজ তারাবি। তারাবি জামাতে পড়া ও সম্পূর্ণ কোরআন শরিফ একবার খতম করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। রাসুল (সা.) নিজে তারাবির নামাজ পড়েছেন এবং সাহাবায়ে কিরামকেও পড়ার জন্য আদেশ দিয়েছেন। তারাবির রাকাতসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন অভিমত পাওয়া যায়। তবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও সর্বজন সমর্থিত হলো ২০ রাকাত।

তারাবির নামাজ ৮ রাকাত মনে করাটাই বিদয়াত। আর ৮ রাকাত মনে করে এর উপর আমল করা মানে বিদয়াতের উপর আমল করা। ২০ রাকাত তারাবি নামাজের ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজান মাসে রাত্রি জাগরণ করে তারাবির নামাজ আদায় করবে তার বিগত জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’ (সহীহ বোখারি, হাদিস: ১৯০১, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৫৯, সুনানে দারেমি: ১৮১৭, মুসনাদে আহমাদ: ৯৪৪৫, মুসনাদে হুমাইদি: ১০৩৭)

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রমজানের রোজাকে তোমাদের জন্য ফরজ করে দিয়েছেন। আর আমি (রাসূল) তোমাদের জন্য এ মাসের তারাবি নামাজকে সুন্নত করে দিলাম। যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখবে এবং তারাবির নামাজ আদায় করবে, সে গুনাহ থেকে সে দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে যে দিন মা তাকে জন্ম দান করেছিলেন।’ (নাসায়ী: ২২২২)

রাসুল (সা.) সর্বদা তারাবি নামাজ জামাতে পড়েননি। কারণ, নবীজি মনে করেছিলেন, যদি তিনি সর্বদা জামাতে তারাবি নামাজ আদায় করেন তাহলে তার উম্মতের উপর এটি ফরজ হয়ে যেতে পারে। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) রমজান মাসে বিশ রাকাত এবং বিতির পড়তেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা- ২/২৯৪, হাদীস নং- ৭৬৯২, মুসনাদে আব্দবিন হুমাইদ- ২১৮, আল মুজামুল কাবীর, হাদীস নং- ১২১০২, মাজমাউজ যাওয়ায়েদ, হাদীস নং- ১৭২, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং- ৪৩৯১)

এবার দেখার বিষয় হলো, উম্মতের ঐক্যমত্যের আমল এর উপর আছে কি নেই? যদি দেখা যায়, উম্মতের আমল এর উপরই। তাহলে আমল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার দ্বারা উক্ত হাদীস সহীহ হয়ে যায়। হযরত ইয়াহইয়া বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় ওমর বিন খাত্তাব (রা.) এক ব্যক্তিকে বিশ রাকাত তারাবি পড়ার হুকুম দিলেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবীশাইবা-২/২৯৩)

হযরত সায়েব বলেন, হযরত ওমর (রাঃ)র সময়কালে বিশ রাকাত তারাবি ছিল। (ফাতহুল বারী-৪/৪৩৬) যার সনদ বুখারীতে দুই স্থানে আছে। হযরত সায়েব বিন ইয়াজিদ (রাঃ) বলেন, আমরা হযরত ওমরের (রা.) শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবি ও বিতর পড়তাম। (সুনানে সুগরা লিল বায়হাকী, হাদীস নং-৮৩৩, মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদীস নং-১৪৪৩) ইমাম নববী রহ., সুবকী (রা.) (শরহুল মিনহাজ), মোল্লা আলী কারী (রাঃ) (শরহুল মুয়াত্তা) ও সুয়ুতী (রা.) এ বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন।

হযরত উবায় বিন কাব (রা.) বলেন, হযরত ওমর (রাঃ) আমাকে এই মর্মে আদেশ দিলেন, আমি যেন লোকদেরকে তারাবি পড়াই। তখন বিশ রাকাত পড়া হতো। (কানযুল উম্মাহ- ৮/২৬৪)। ইমাম বায়হাকী, আল্লামা বাজী, কাশতাল্লানী, ইবনে কুদামা, ইবনে হাজার মক্কী, তাহতাবী, ইবনে হুমাম, বাহরুর রায়েক প্রণেতা (রাঃ) প্রমুখগণ এ ব্যাপারে একমত হয়ে বলেন, হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবির উপরই সকলের সিদ্ধান্ত স্থির হয় এবং এভাবেই চলতে থাকে।

ভারতবর্ষে ইংরেজ আমলের পূর্বেও কোনো একজন মুহাদ্দিস বা ফক্বীহ এটাকে অস্বীকার করেননি। আর সুন্নত হওয়ার জন্য সেটির নিরবচ্ছিন্ন হওয়া শর্ত। তাই এই বিশ রাকাত তারাবীহ সুন্নতে ফারূকী হয়েছে। এ সেই ওমর (রা.) যার ব্যাপারে রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন, যদি আমার পর কোন নবি হতো তাহলে নবি হতো ওমর। তিনি আরো বলেছেন, দ্বীনের ব্যাপারে সবচে’ মজবুত হলেন ওমর রা.। রাসুল আরও বলেছেন, ওই সত্ত্বার কসম, যার আয়ত্বে আমার প্রাণ, শয়তান কখনো তোমার (ওমর রা.) চলার পথে তোমার সঙ্গে মিলিত হয়নি। বরং তোমার রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তায় চলে গেছে। (মুসলিম শরীফ, ৭ম খণ্ড, হাদিস- ৬০২৫)

হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) যার এতো মর্যাদা, যিনি এতো জ্ঞানের অধিকারী সেই ওমরই (রা.) তারাবির নামাজ ২০ রাকাত জামাতে পড়ার প্রচলন করে গেছেন। যদি বিশ রাকাত তারাবি নামাজ বিদআত হয়, তাহলে হযরত ওমরসহ (রা.) সেই সময়কার সমস্ত আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণের বিদয়াতি হওয়ার আবশ্যক হয়! (নাউযুবিল্লাহ) অথচ হুজাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, আমার পরে তোমরা তাদের মধ্যে আবু বকর ও ওমরের অনুসরণ করবে। (তিরমিজি, ষষ্ঠ খণ্ড- ৩৬০১)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত