প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কৃষকদের জন্য রাষ্ট্রের নতুন কোনো পরিকল্পনা নেই?

ফিরোজ আহমেদ : কৃষিতে ভর্তুকি দেয়ার কথাটাকে চোররা অত্যন্ত একটা বিভ্রান্তিকর বিষয়ে পরিণত করেছেন। কৃষককে অভুক্ত রেখেও কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া যায়। তাতে রাষ্ট্রীয় অর্থেই কৃষকের ঘাড়ে কাঁঠাল ভেঙে ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো হয়। যেমন : সারের দামে কৃষক ভর্তুকি পান। আমদানি করা সার কৃষককে সস্তায় দেয়া হয়। আমদানিকারকরা এই সার কিনে আনেন এবং ভর্তুকির অর্থটা পেয়ে যান। সরকারি প্রক্রিয়ায় কৃষক হ্রাসকৃত মূল্যে সার পান। খুবই নিরীহ প্রক্রিয়া, সন্দেহ নেই। কিন্তু এর ফলে দুটো ভয়াবহ বিষয় ঘটে, খানিকটা এখানে আলাপ করা যাক।

সার আমদানির একটা প্রণোদনা এভাবে তৈরি হয়। মুনাফা নিশ্চিত বলে দেশের সার কারখানা বছরাধিকাল বন্ধ রেখেও সার আমদানি করা হয়েছে। সারের দাম কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধিও করা হয়েছে। তারপর সরকার জনগণের কোষাগার থেকে সেই দাম পরিশোধ করে কৃষককে সস্তায় সার দিচ্ছে।

অন্যদিকে এই প্রক্রিয়াতে কৃষক তার উৎপাদন মূল্যের উপর কোনো মুনাফার নিশ্চয়তা পান না। সারের দাম কম কিংবা বেশি, তা সবার জন্যই সমান। ফলে সেই নির্দিষ্ট মূল্যের উপরই কৃষকের লোকসান কিংবা লাভ উঠানামা করবে। বাজার যেহেতু চাতাল মালিকের পক্ষে, সরকার চাতাল মালিকের পক্ষে, কৃষককে লোকসানে ধান বিক্রি করতেই হয়। লাভটা করেন চাতাল মালিক, তার আগে সার ব্যবসায়ী, বীজ ব্যবসায়ী, কীটনাশক ব্যবসায়ী সবাই। সার বাবদ গত বছর প্রায় নয় হাজর কোটি টাকা ভর্তুকি ছিলো। সারের দামে ভর্তুকি না দিলে সার কৃষককে উচ্চমূল্যে কিনতে হতো। কিন্তু যদি কৃষককে তা ঋণে কিনতে হতো এবং কৃষক পর্যায়ে উৎপাদিত ধানের উপর ভর্তুকি দেয়া হতো এই বাড়তি টাকার ধান কৃষকের কাছ থেকে কিনে এবং আরও ক্রয়মূল্যে কৃষককে মুনাফার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে তাহলে কৃষকই প্রত্যক্ষভাবে এই ভর্তুকির অর্থটা পেতেন।

অন্যদিকে দারণ ইতিবাচক যে বিষয়টা হতো তাহলো উচ্চমূল্যের সার কেনার বদলে দেশের যাবতীয় পচনশীল জৈববস্তুর যে সার হিসেবে সম্ভাবনা ও গুরুত্ব আছে, সেই বিষয়টা আরও বেশি কৃষকের সামনে আসতো। জৈব কৃষিতে তিনি আরও মনোযোগী হতেন, কিংবা হতে বাধ্য হতেন। সার ও কীটনাশকের ব্যবহার শুধু পরিমিত হতো তাই না, তার বিকল্প সম্ভাবনাগুলো বিকশিত হতো। এমনকি যে ফসলগুলো জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে সেগুলোর আবাদও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতো।

একটা পুরানো অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করি। ১৯৯৫ সালে সারের মজুদদারি ও ফটকাবাজারির কারণে বিরাট রাজনৈতিক গোলযোগ হয়েছিলো। বাজারে সার উধাও। আগুনের দামে বিক্রি। প্রতিবাদী কৃষকরা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। তাদের মরিয়া চেষ্টা ছিলো ধানের চারাগুলো রক্ষা করার জন্য, পুষ্ট করার জন্য দুমুঠো সার জোগাড় করা। এই বিরাট গোলযোগ, গুদামে কৃষকদের সার লুটের চেষ্টা হামলার পরিণতিতে মুনাফাখোর ফড়িয়ারা শেষ পর্যন্ত তাদের সারও বিক্রি করতে পারেনি। খুব আশ্চর্য বিষয় ছিলো যে, সেই বছরের ফসলে খুব প্রতিক্রিয়া পড়েনি। কৃষিবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা এবং অনেকের ভবিষ্যতবাণী ভুল প্রমাণিত হয়েছিলো। ধানের আবাদ সেই ঋতুতেও মোটামুটি একই ছিলো।

বর্তমান কৃষিতে সারের নিশ্চয়ই প্রয়োজন। কিন্তু আসলে সারের কতোখানি প্রয়োজন, নাকি ঔষধের মতোই সারও আমাদের গেলানো হয় কৃত্রিমভাবে, এর বড় অংশ হয়তো প্রকৃতিতে অপচয়ই হয়… আমরা জানতে পারি না। সত্যি যে, ফরাসি দেশের আধুনিক বন্দোবস্তে আমাদের চেয়েও মাথাপিছু অনেক বেশি সার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আমাদের ভূমির উর্বরতার সঙ্গে, পলিবাহিত এই ভূমির সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা করা মুশকিল। কিন্তু সারের উপর ভর্তুকি একটা ভয়াবহ চক্র তৈরি করেছে। সঙ্গে সরকারর ধান ক্রয় নীতি তো চাতাল মালিকদের জন্য আরেকটা ভর্তুকি। এসব ভর্তুকি মিলে গরিব চাষার আরও সর্বনাশ করে তাকে বাধ্য করছে তার সন্তানদের পোশাক শিল্পের সস্তা শ্রমিকে পরিণত হতে। এর বাইরে আসলে কৃষকদের জন্য আমাদের রাষ্ট্রের আর কোনো পরিকল্পনা নেই। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত