প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান ধর্মের মানুষের কাছে বিশেষ আবেদন, আপনারা  কেউ আইন, গালাগালি আর চাপাতি দিয়ে ভিন্নমতকে প্রতিহত করতে যাবেন না

পুলক ঘটক : শ্রীলঙ্কায় যেদিন জঙ্গিরা চার্চে হামলা করে কয়েকশো মানুষকে মেরে ফেলে সেদিন বরিশাল ক্যাথলিক চার্চে (গির্জা) একটি পূর্ব নির্ধারিত আনন্দ আয়োজন ছিলো। শোকসভা না করে ওই রক্তাক্ত দিনে উৎসব করার সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন কবি হেনরী স্বপন। এজন্য তার বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে’ আঘাত দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। কবির বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করা হয়েছে স্বয়ং চার্চের পক্ষ থেকে। মামলা দায়েরকারী ফাদার লরেন্স লেকাভালীয়ের গোমেজ নিজেই একথা সাংবাদিকদের বলেছেন।

কোনো চার্চের পক্ষ থেকে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেয়ার অভিযোগে মামলা দায়েরের ঘটনা (আমার জানামতে) বাংলাদেশে এই প্রথম। এটি একটি নতুন আলামতও বটে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আর কোনো চার্চ ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ রক্ষার জন্য মামলা মোকদ্দমায় অবতীর্ণ হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। অল্প কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়ার কার্ডিনাল জর্জ পেল দুজন বালককে যৌন নিপীড়নের দায়ে দ-িত হয়েছেন। আদালত তাকে দ- দেয়ার আগেই পেলের বিষয়টি রসিয়ে লিখেছে অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মিডিয়া। কিন্তু এজন্য পৃথিবীর কোনো দেশে কোনো চার্চ (কিংবা কোনো খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি) মিডিয়ার বিরুদ্ধে ‘ধর্মীয় অনুভূতি’তে আঘাতের অভিযোগে মামলা করেছে… এমন খবর পাওয়া যায়নি।

ফরাসি লেখক ফ্রিডেরিক মার্কেল সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম, ‘দ্য ভ্যাটিকান ইজ এ গে অর্গানাইজেশন’ অর্থাৎ ‘ভ্যাটিকান একটা সমকামী সংস্থা’। বইটি প্রকাশের আগে থেকে (গত ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ) ওই বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে স্বয়ং পোপ ফ্রান্সিস এবং ভ্যাটিকানের বিরুদ্ধে সমকামীতাসহ যৌন ও মাদক অপরাধে জড়িত থাকার সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছে বিশ্ব মিডিয়া। এজন্য ভ্যাটিক্যানের পক্ষ থেকে মিডিয়ার বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি। ‘ধর্মীয় অনুভূতি’র সংরক্ষক বাংলাদেশের মিডিয়াও সে খবর রসালোভাবে প্রচার করেছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো, ‘ভ্যাটিকান একটা সমকামী সংস্থা।’

পাঠক বলতে পারেন, বড় বড় পত্রিকা থাকতে ‘সংগ্রাম’ থেকে কেন উদ্ধৃতি দিলেন? সংগ্রাম থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছি, যাতে করে (পুরোটা পড়ার আগে) আপনারা নিজেদের মনোজগৎ আরেকবার তলিয়ে দেখার সুযোগ পান। নিজ অন্তর তলিয়ে দেখে নিচের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিন : প্রশ্ন ১. ‘ভ্যাটিকান একটা সমকামী সংস্থা’… এই নামের বইটি যদি ‘কাবা শরীফ একটা… ‘ হতো তাহলে আপনার প্রতিক্রিয়া কি হতো? প্রশ্ন ২. ‘কাবা একটা… ‘শিরোনাম দিয়ে দৈনিক সংগ্রাম এ রকম প্রতিবেদন ছাপাতো কিনা? বাংলাদেশের অন্য কোনো মিডিয়া এভাবে প্রতিবেদন ছাপাতো কিনা? প্রশ্ন ৩. দৈনিক সংগ্রামের ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ কেমন? ব্লাসফেমি আইনের দাবিদার ইসলামপন্থি পত্রিকা ‘সংগ্রাম’ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে তারা কীভাবে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় অনুভূতি মাখানো শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ভ্যাটিকান সম্পর্কে কুৎসাপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে? প্রশ্ন ৪. ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ সম্পন্ন আমাদের পাঠক সমাজ খ্রিস্টান যাজকদের সম্পর্কে এই রসালো লেখা কোন রসে পাঠ করেছেন? এই লেখার বাকি অংশ পড়ার আগে নিজের মনে এই চারটি প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে নেয়ার জন্য অনুরোধ করি। আমি এই লেখায় যার ছবি সংযুক্ত করেছি তিনি একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তাকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করি বিধায় তার কাছে একটি ছোট আবেদন জানানোর জন্য আমার এই লেখা।

মহাত্মন কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি রোজারিও, আমি যতোদূর জেনেছি কবি হেনরী স্বপনের বিরুদ্ধে যে মামলাটি হয়েছে, তা বরিশালের খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী একটি গোষ্ঠীর নিজেদের দ্বন্দ্ব বিরোধের ফল। এই মামলা দিয়ে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় অনুভূতি বা ভাবমূর্তির কোনোটাই উজ্জ্বল হচ্ছে না। দয়া করে আপনি উদ্যোগ নিয়ে এই মামলাটি প্রত্যাহার করার ব্যবস্থা করুন। ব্যক্তিগতভাবে আমি আপনার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছি। বাঙালির ইতিহাসে আপনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি আগামীতে পোপ হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার যোগ্য। আপনি আপামর বাঙালির গর্ব। আপনার বিজ্ঞতা ও মহানুভবতা আর দশজনের মতো হওয়ার কথা নয়। আপনি নির্দেশ দিলে খ্রিস্টান সমাজ তা অবজ্ঞা করে, এমন সাধ্য কারও আছে বলে মনে করি না। তিনটি প্রধান কারণে আপনাকে এই অনুরোধ জানাচ্ছি।

প্রথমত : যে আইনে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে সেই ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টকে আমরা গ্রহণযোগ্য আইন বলে মনে করি না। এই আইনে কারও বিরুদ্ধে মামলা করা হলে আইনটি মেনে নেয়া হয়। আমি প্রত্যাশা করি দেশের খ্রিস্টান সমাজ এই কালাকানুন গ্রহণ করবে না।

দ্বিতীয়ত : হেনরী স্বপন যে বিষয়টির সমালোচনা করেছেন তা যৌক্তিক এবং মানবিক আবেগপূর্ণ। বরিশালের গির্জায় সেদিনের ওই আয়োজন পূর্ব নির্ধারিত হলেও শ্রীলঙ্কায় মর্মন্তুদ ঘটনার পর তা পরিবর্তন করা যেতো। এ বিষয়ের সমালোচনা করলে তাতে ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ আহত হওয়ার কোনও কারণ দেখি না।

তৃতীয়ত : খ্রিস্টধর্ম, বিশ্বাস ও অনুভূতি রক্ষার জন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের প্রয়োজন নেই। স্বয়ং যিশুখ্রিস্ট এবং মাতা মেরী সম্পর্কে কতো কিছুই না বিশ্বজুড়ে লেখালেখি হচ্ছে! হাজার বছর ধরেই ভিন্নমতাবলম্বীরা এসব করছে। তাতে পৃথিবী থেকে খ্রিস্টানরা হারিয়ে যায়নি। কারও বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কিংবা চাপাতি দিয়ে হামলা করে খ্রিস্টানরা নিজেদের ধর্ম বা বিশ্বাস বাঁচায়নি। সেটা সঠিক পথ নয়।

১৬ শতকে শুরু হওয়া প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন খ্রিস্ট ধর্মের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে ১১০ একর আয়োতনের ভ্যাটিক্যানে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। তাতে শুধু প্রোটেস্ট্যান্টদের জয় হয়নি, ক্যাথলিকরাও জয়ী হয়েছে। রাষ্ট্রের উপর ধর্মের সার্বভৌম ক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারিয়ে ভ্যাটিকান আজ বিশ্বব্যাপী খ্রিস্টান মানসের উপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। খ্রিস্টানদের ধর্ম এবং রাজনীতি যদি আজ পর্যন্ত একীভূত থাকতো তাহলে রাজনৈতিক আন্দোলন ও পালাবদলের তোড়ে ধর্মটাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এতোকাল পরে এসে যারা রাষ্ট্রের আশ্রয়ে ভিন্নমতকে দমন করতে চায়, তারা নিজেরাই দেউলিয়া হয়। বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান… এই তিনটি ধর্মের মানুষের কাছে আমার বিশেষ আবেদন, অন্তত আপনারা কেউ আইন, গালাগালি আর চাপাতি দিয়ে ভিন্নমতকে প্রতিহত করতে যাবেন না। উগ্র মতবাদ, মৌলবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে আপনারাও যদি চরমপন্থা অবলম্বন করেন তাহলে চরমপন্থারই জয় হয়। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত