প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিক্ষার্থীদের ধানকাটা ও রূপপুরের রূপকথা

কাকন রেজা : এক. দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাশ্রমে কৃষকদের ধান কেটে দিচ্ছেন। গণমাধ্যম এমনটাই জানাচ্ছে। এমন খবরে অনেককেই উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন, আশা ব্যক্ত করেছেন। ভালো কথা। কিন্তু এই আশা উচ্ছ্বাসের বিপরীতে হতাশার চিত্রটি কি তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে? শিক্ষার্থীদের এই আপাত স্বেচ্ছাশ্রম যে কতোবড় বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে, তাকি তারা ধরতে পারছেন? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, পারছেন না। একটু খুলেই বলি।

বাংলাদেশে ধানকাটা মানে উৎসব, নবান্ন। এ সময় কৃষকেরা যেমন আনন্দিত থাকে, তেমনি আনন্দিত থাকে দিনমজুরেরা, গ্রামীণ ভাষায় কামলারা। মজুরদের মধুমাস বলতে পারেন সময়টাকে। শ্রম বিক্রি করে তারা অন্তত তিনটি মাস খেয়ে-পরে বেঁচে থাকে। আর কৃষকদের তো মধুমাস অবশ্যই, তাদের গোলাভরা থাকলে হৃদয়ও ভরা থাকে। গ্রামে-গ্রামে চলে যাত্রাপালা, হয় মেলা। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়।

এর বিপরীত চিত্র হলো শিক্ষার্থীদের ধানকাটা। বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেই এদেশের কৃষকেরা হাত বাড়ায় সাহায্যের জন্য। ধানকাটার সময় যদি কৃষকদের সাহায্যের প্রয়োজন হয়, এর মানে দুর্যোগ। অর্থাৎ গ্রামীণ অর্থনীতি ভালো নেই। একজন মজুরের পারিশ্রমিকে প্রায় দেড়মণ ধান চলে যায়। তারপর ধানের বাজারদর রীতিমতো হতাশাব্যঞ্জক। ক্ষোভে কৃষকেরা নিজ ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। কৃষকদের অক্ষমতার জের পড়েছে শ্রম বাজারেও। মজুরদের নিতে সাহস পাচ্ছে না কৃষকেরা। নিজ পরিবার-পরিজন, এমনকি উঠতি বয়সী মেয়েকে নিয়েও ক্ষেতে নেমেছেন কোনো কোনো কৃষক। ব্যয় পুষিয়ে নিতেই এমনটা করা তাদের। যার ফলে মজুরদের আয়ের ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়ে উঠেছে।

এই যে কৃষকদের ব্যয় পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা, গ্রামীণ শ্রম বাজার সংকোচন, এর কিছুই আশান্বিত হবার কোনো সূচক নয়। বরং সংকটের লক্ষণ। এর প্রভাব অনেক দূরবর্তী। কৃষকের হাতে পয়সা না থাকলে বাজারের ব্যবসায়ীদের ব্যবসা মার খাবে। গ্রামীণ অর্থনীতি রুগ্ন হলে শহর আক্রান্ত হবে। টান পড়বে রাজস্ব আদায় প্রচেষ্টাতেও। এটা একটা চেইন, যার শুরু গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে। মনে রাখা ভালো, বাংলাদেশ এখনও কৃষিনির্ভর। যারা শহুরে হয়ে উঠার কথা বলেন, তারা হয় অসত্য বলেন, না হয় না বুঝে বলেন।

দুই. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচের হিসাব নিয়ে খুব  হৈচৈ হচ্ছে। সেখানে বিছানা-বালিশসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম বিষয়ে খুব হাসিঠাট্টা করছেন মানুষ। খরচে একটি বালিশের দাম সব মিলিয়ে ধরা হয়েছে প্রায় সাত হাজার টাকার মতো। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, হাসিঠাট্টা না করার কোনো কারণ নেই। তবে হাসিঠাট্টার বিপরীত চিন্তাটি তেমন করে কিন্তু কারো মাথায় আসছে না। এই যে, বালিশের দাম সাত হাজার, কেটলির আট হাজারেরও বেশি, এসব কিন্তু গেছে আমাদের পকেট থেকেই। উনাদের পকেট ভরেছে, ভরবে আমাদের পকেট কেটেই।

কি করে ভরবে, তা প্রখ্যাত সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজার একটি লেখা থেকেই অনুধাবন করা যায়। যা প্রকাশিত হয়েছিলো ডেইলি স্টারে। তিনি কানাডাসহ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যমূল্য এবং গড় আয়ের সঙ্গে আমাদের অবস্থার তুলনা করেছেন। বাংলাদেশে গরুর মাংস কেজি প্রতি প্রায় ছয়শো টাকা। বাংলাদেশিদের গড় আয় এক হাজার নয়শো ডলার। বিপরীতে কানাডায় গরুর মাংস প্রতি কেজি দু’শ ছাপান্ন টাকার মতো। তাদের গড় আয় পঁয়তাল্লিশ হাজার ডলার। বাংলাদেশের পোশাকখাতের হিসাবে ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা, আর কানাডায় দুই লাখ আটান্ন হাজার। স্বীকার করি, কানাডার মতো অর্থনীতি আমাদের নয়। কিন্তু যাও আছে তাও তো চলে যায় ব্যয়ে। বাঁকা কথায় পকেট ভরতে। যার প্রমাণ রূপপুরের রূপকথা।

আমরা শিক্ষার্থীদের ধানকাটাতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি। রূপপুর রূপকথার ব্যয় নিয়ে হাসিঠাট্টা করি। কিন্তু উচ্ছ্বাস আর ঠাট্টার পেছনের চিত্রটা অনুধাবন করি না। আর করি না বলেই, দায়ীরা পার পেয়ে যায়। আর আমপাবলিকের জীবন কাটে দৌঁড়ের উপর।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত