প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

ইফতারের গুরুত্ব রোজা-নামাজ থেকে বেশি নয়

মুহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন : রমজানের এই দীর্ঘ ১০-১২ দিনে আমার যেটি মনে হলো, আসলে রোজা আমাদের উপর ফরজ নয়; ফরজ হলো ইফতার! এমনকি নামাজও নয়, শুধু ইফতারই যেনো ফরজ! সন্ধ্যাবেলা সব জায়গায় দেখা যায় ইফতার পার্টির আয়োজন। কোনোটি জেলা সংগঠনের, কোনোটি উপজেলা সংগঠনের, কোনোটি বন্ধুরা মিলে আবার কোনোটি অন্য কোনো সংগঠনের কিংবা বন্ধুরা একত্রিত হয়ে আয়োজন করে। বেশ কয়েকটি এই ধরণের প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে যেটি লক্ষ্য করলাম প্রায় ৭০ শতাংশ থাকেন আয়োজক এবং উপস্থিতদের মধ্যে বেরোজাদার এবং ইফতার শেষে নামাজ পড়েন না প্রায় ৮০ শতাংশ। কিন্তু ইফতারের আয়োজনে কোনো কমতি নেই।

প্রায় ৩০ থেকে ৪০ টি আইটেম না হলে যেন ইফতার হয় না। অথচ ইফতার করা এবং করানো হলো সুন্নত। যেটি আমরা হাদিসের মাধ্যমে বুঝতে পারি। হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ পড়ার আগে কয়েকটি কাঁচা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। যদি কাঁচা খেজুর না থাকত তাহলে শুকনো খেজুর দিয়ে। যদি শুকনো খেজুরও না থাকতো, তাহলে কয়েক ঢোক পানি দিয়ে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৬ এবং সুনানে তিরমিযি: (৬৯৬)’ অন্য একটি হাদিসে পাওয়া যায় মহানবী (সাঃ) বলেন,‘মানুষ ততদিন পর্যন্ত কল্যাণে থাকবে, যতদিন তারা অবিলম্বে ইফতার করবে (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ১৯৫৭)।’ এর দ্বারা স্পষ্ট যে আমাদের অবশ্যই ইফতার করতে হবে এবং সঠিক সময়ে অবিলম্বে ইফতার করা সুন্নত।

কিন্তু বর্তমানে ইফতারের আয়োজন নিয়ে এক একজন এতো বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, ইফতারের আগে যে দোয়া কবুলের সময় অথচ এ সময়ে দোয়া করার সময়টুকু তারা পান না। মহানবি (সাঃ) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেয়া হয় না। এক: ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া। দুই: রোজাদারের ইফতারের সময়কার দোয়া। তিন: মজলুমের দোয়া। (মুসনাদে আহমাদ: ৮০৪৩)।’ অন্য একটি হাদিসে আবু উমাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘প্রতিদিন ইফতারের সময় আল্লাহ কিছু মানুষকে (জাহান্নাম থেকে) মুক্ত করে দেন।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২১৬৯৮) অথচ দেখা যায়, ইফতারের সময় দোয়া করার সময় কই? ইফতার আয়োজন করতে হবে! বক্তৃতা দিতে হবে! উপস্থাপনা করতে হবে! নিজেকে দেখাতে হবে! ছবি তুলতে হবে! কী অদ্ভুত আমরা তাই না?

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল বাকারায় বলেন, ‘তোমাদের উপরে রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমনিভাবে করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি। যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ (সূরা বাকারা আয়াত: ১৮৩) রোজা সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে, হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দিব।’ (সহীহ বুখারী: ১৯০৪ এবং সহিহ মুসলিম: ১১৫১) মহানবি (সাঃ) বলেছেন, ‘রোজা হল ঢাল স্বরূপ।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৫১)

আমরা এর দ্বারা স্পষ্ট বুঝতে পারি রোজা রাখার গুরুত্ব কতো। রোজা আমাদের উপর ফরজ মানে অবশ্যই পালনীয়, পালন করতেই হবে। ‘যদি স্বেচ্ছায় একটি রোজাকে ভঙ্গ করা হয় তবে একটির কাফফারা হিসেবে ৬০টি আদায় করতে হবে। আবার যদি এই ষাটটি রোজা আদায়ের মধ্যে একটি ভঙ্গ করা হয় আবার ষাটটি আদায় করতে হবে নতুবা একটি রোজার বিনিময়ে ষাটজন ইয়াতিম এবং মিসকিনকে দু্ইবেলা খাবার খাওয়াতে হবে।’ (আদদুররুল মুখতার: ৪২৬)

আমরা ইফতার অবশ্যই করবো। তবে আমাদের যেটি গুরত্বপূর্ণ সেটিকে তো বেশি মূল্যায়ন করতে হবে। আগে আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে। কেননা নামাজ হলো ‘যারা মুসলিম এবং যারা মুসলিম নয় তাদের মধ্যে পার্থক্যকারী।’ (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৮২) কিন্তু আমরা নামাজ পড়বো না, রোজা রাখবো না অথচ ইফতারের বিরাট আয়োজন করবো এটি তো দৃষ্টিকটু। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার প্রথম ৩ এবং ৪ নং আয়াতে যারা সফলকাম এবং সঠিক পথে রয়েছে তাদের বর্ণনা দিয়েছেন, এর মধ্যে একটি হলো নামাজ কায়েম করা। এছাড়াও পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় নামাজ কায়েমের কথা বলা হয়েছে। তাই আমাদের ফরজ কাজকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি ওয়াজিব, সুন্নত এবং মুস্তাহাব কাজগুলোও। আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করার মতো ভয় কর এবং তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আল ইমরান, আয়াত নং: ১০২)

তাই আসুন আমরা এখন থেকে শপথ নেই, লোক দেখানো ইবাদতকে পরিহার করবো। আল্লাহকে ভয় করে শুধু সুন্নত নয়, ফরজ, ওয়াজিব সুন্নাত, মুস্তাহাব পালন করবো। রোজাকে ইফতার আড্ডা, বিনোদনের বস্তু না বানিয়ে প্রকৃত মুসলমান হওয়ার চেষ্টা করি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত