প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানব পাচারে ১৫ চক্র

ডেস্ক রিপোর্ট : ইমরান খান ২০১৮ সালের শুরুর দিকে দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় যান। লিবিয়া থেকে ইউরোপে যেতে পাড়ি দেন ভূমধ্যসাগর। গেল বছরের ১৬ আগস্ট ৮৪ জন যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা অবৈধ পথে যাত্রা করে ইউরোপ অভিমুখে। সাগরে যাত্রীদের অনাহারে কাটে পাঁচ দিন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তাদের নাজেহাল অবস্থা। অসুস্থ হয়ে পড়েন ইমরানসহ কয়েকজন। দৃষ্টিসীমায় ধরা দেয় না সাগরের কিনারা। দিগন্তপানে তাকিয়ে দিশাহারা আরোহীরা। ধুঁকে ধুঁকে ইমরান একসময় ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। পরে দিকহীনভাবে ভাসতে থাকা নৌযাত্রীদের সঙ্গে দেখা হয় মাল্টা কোস্টগার্ডের। সবাইকে উদ্ধার করে তারা নিয়ে যান শরণার্থী শিবিরে। আর মৃতদের নেওয়া হয় মাল্টা সরকারি মর্গে। এরপর কেটে যায় আট মাস। পরিবার ইমরানের আর কোনো খবর পায় না। কী হয়েছে ইমরানের? বেঁচে আছেন নাকি নেই? কোনো সংবাদ না পেয়ে পরিবার তাকে ‘মৃত’ ধরে নিয়েছিল। প্রিয়জনের সন্ধান না পেয়ে যখন হারানো শোক কিছুটা ফিকে হতে শুরু করল তখনই পরিবারের কাছে খবর আসে ইমরানের সন্ধান পাওয়া গেছে। সুদূর ইউরোপীয় দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টার মর্গে আছে ইমরানের লাশ। গত ৯ মে রাতে লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জুয়ারা উপকূল থেকে একটি বড় নৌকা ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। গভীর রাতে ভূমধ্যসাগরে তিউনিসিয়ার জলসীমানায় ওই নৌকা থেকে প্রায় ৭৫ জনকে একটি ছোট নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। নৌকাটি ছিল রাবারের তৈরি। আয়তনে ছোট। ৩০-৪০ যাত্রী বহনে সক্ষম এই নৌকা ৭৫ জনের ভার সইতে পারল না। যাত্রীরা ওঠার ১০ মিনিটের মধ্যে নৌকা ডুবে ৬০ জনের মৃত্যু ঘটে। তার মধ্যে ৩৯ জনের তালিকা প্রকাশ করেছে সরকার। উদ্ধারকৃত ১৭ জনের মধ্যেও ১৪ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। নৌকাটি ডুবে যাওয়ার পর তারা প্রায় আট ঘণ্টা ঠান্ডা পানিতে ভেসে ছিলেন। এভাবে সমুদ্রে ডুবে বাংলাদেশি অভিবাসীদের মৃত্যুর ঘটনা প্রথম নয়। কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে বহু বাংলাদেশি সাগরে ডুবে মারা যান। শুধু সমুদ্রপথে নয়, দুর্গম মরুপথে, তুষারপথে ও বনজঙ্গল পার হতে গিয়েও অনেকে মারা গেছেন। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছান, তাদেরও হয় পালিয়ে থাকতে হয়, কিংবা ঠাঁই হয় কারাগারে। যারা ভাগ্যান্বেষী তরুণদের ‘উজ্জ্বল জীবনের’ স্বপ্ন দেখিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল, এমন ১৫টি চক্রের গডফাদারের বেশির ভাগই থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাঝেমধ্যে দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণির সদস্যরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের কাছে ধরা পড়ছেন। গত কয়েক মাস আগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ মানব পাচারের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগে তেজগাঁও কলেজের শিক্ষক মোহাম্মদ আছেমকে দুই দফায় গ্রেফতার করলেও অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি জামিনে বের হয়ে আসেন। গতকাল র্যা ব গ্রেফতার করে দুটি চক্রের তিন সদস্যকে। এরা ভূমধ্যসাগরে নিহত ৩৯ জন বাংলাদেশিকে পাচার করেছিলেন। অন্যদিকে, ১০টির বেশি চক্র দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সহজসরল মহিলাদের উন্নত পরিবেশ ও নানা সুযোগ-সুবিধার কথা বলে গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। তবে কিছুদিন পরই সর্বস্ব হারিয়ে তারা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। চলতি মাসেই পাচারকারীদের বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও আনসার বাহিনীর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

ইউএনএইচসিআরের তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন এমন অভিবাসীদের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এ বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ মে পর্যন্ত ১৭ হাজার অভিবাসী ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছেছেন। এই যাত্রাপথে প্রায় ৫০০ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানো অভিবাসীর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভিজিল্যান্স টাস্কফোর্স বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত সচিব নাজিবুল ইসলাম বলেন, ‘মানব পাচারকারীদের খুঁজে বের করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ। তবে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কেউ মানব পাচরের শিকার হলে তা আমরা খতিয়ে দেখি। সম্প্রতি রিক্রুটিং এজেন্সির ভুয়া পরিচয় দিয়ে কম্বোডিয়া ও রাশিয়া পাঠানোর নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আমরা র্যা বকে সঙ্গে নিয়ে পল্টন এলাকা থেকে দুই প্রতারককে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। ভুল তথ্য দিয়ে বিদেশে গৃহকর্মী পাঠানোর বিষয়টিকে আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। সম্প্রতি একটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে জরিমানা করা হয়েছে। আরও কিছু অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। এগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিজিবি ও আনসার বাহিনীর মাধ্যমে পাচারকারীদের তথ্য আদায় করা সম্ভব। কারণ সারা দেশেই মাঠ পর্যায়ে আনসার বাহিনীর সদস্য এবং সীমান্তে বিজিবির সদস্যরা সদা সতর্ক থাকায় তাদের মাধ্যমে দেশ এ ক্ষেত্রেও উপকৃত হতে পারে। এ বিষয়ে কয়েকদিন আগেই আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়ে চিঠি লিখেছি।’ সূত্র বলছেন, পাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি কিছু বাংলাদেশিকেও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকার কমপক্ষে ৬০ স্থান দিয়ে মাছ ধরার নৌকায় করে মালয়েশিয়া নিয়ে যাচ্ছে। উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে অনেকেই মালয়েশিয়া পৌঁছাতে পারলেও সেখানে আবার তারা পুলিশের হাতে আটক হচ্ছেন। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পুলিশ সাগরপথে যাওয়া ৫৬ জনকে আটক করেছে। বাংলাদেশ কোস্টগার্ড বঙ্গোপসাগর দিয়ে মাছ ধরার নৌকায় মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টাকালে টেকনাফ থেকে কয়েক দফায় ৩০০-এর বেশি রোহিঙ্গাসহ কয়েক বাংলাদেশিকে আটক করেছে। কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছটা, ফিশারিঘাট, নাজিরাটেক, সমিতিপাড়া, মহেশখালীর সোনাদিয়া, গোরকঘাটা, কুতুবজোম, ধলঘাটা, উখিয়ার সোনারপাড়া, রেজুরখাল, ইনানী, ছেপটখালী, মনখালী, টেকনাফের বাহারছড়া, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, কচ্ছপিয়া, শামলাপুর, সদরের ঈদগাঁও, খুরুশকুল, চৌফলদী, পিএমখালী, চকঘোলারপাড়া, মাঝরপাড়া, পশ্চিমপাড়া, কাটাবনিয়া, খুরেরমুখ, হাদুরছড়া, জাহাজপুরারিয়া, পেকুয়া, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, পটিয়ার মতো পয়েন্ট দিয়ে মানব পাচারকারীরা এখনো সক্রিয়। ১২০ কিমি উপকূল নিরাপদ রাখতে কোস্টগার্ড, বিজিবি ও পুলিশ তৎপর থাকলেও পাচারকারী চক্র তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নৌকায় মানুষ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, দেশব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাচারকারীদের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা গরিব মহিলাদের ভুলিয়ে ভালিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। প্রতি জনের বিপরীতে তারা পেয়ে যাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন। একইভাবে চক্রের হোতাদের পকেটে ঢুকছে মোটা অঙ্কের টাকা। র্যা বের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল মাহাবুব আলম বলেন, ‘আমরা অনেক চক্রের সন্ধান পেয়েছি। তবে এখনই তাদের নাম প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। তাহলে তারা সতর্ক হয়ে যাবে। তবে মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট নিয়ে আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে।’ পুলিশ সদর দফতরের স্পেশাল ক্রাইম ডিভিশনের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. রেজাউল করীম বলেন, ‘মানব পাচার আগের তুলনায় অনেক কমেছে। এ বিষয়টিতে বাংলাদেশ পুলিশ অত্যন্ত সিরিয়াস।’

তিন পাচারকারী গ্রেফতার : সাগরপথে মানব পাচারকারী একটি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যা ব। তারা হলেন শরিয়তপুরের আক্কাস মাতুব্বর (৩৯), সিলেটের এনামুল হক তালুকদার (৪৬) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবদুর রাজ্জাক ভূইয়া (৩৪)। র্যা বের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত ৩টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে রাজধানীর আবদুল্লাহপুর থেকে আক্কাসকে, খিলক্ষেত থেকে এনামুলকে ও বিমানবন্দর এলাকা থেকে রাজ্জাককে গ্রেফতার করা হয়। অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির শিকার বাংলাদেশিরা এই মানব পাচার চক্রের খপ্পরে পড়েছিলেন।’ জানা গেছে, সিলেটের জিন্দাবাজারে ইয়াহিয়া ওভারসিজ নামে একটি এজেন্সি আছে এনামুলের। তিনি ১০-১২ বছর ধরে মানব পাচারে জড়িত। আবদুর রাজ্জাক চার-পাঁচ বছর ধরে এনামুলের দালাল হিসেবে কাজ করছিলেন। আক্কাসও দু-তিন বছর ধরে মানব পাচারকারী চক্রের দালাল হিসেবে কাজ করছেন। তারা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ এই অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সংঘবদ্ধ চক্রটি বিদেশি চক্রের যোগসাজশে অবৈধভাবে ইউরোপে লোক পাঠিয়ে আসছিল। বৃহস্পতিবার রাতে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় এনামুলসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেছেন ভূমধ্যসাগরে নিহত আবদুল আজিজের বড় ভাই মফিজ উদ্দীন।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত