প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

পাইলট নিয়োগে দুর্নীতি, কাঠগড়ায় বিমানের নিয়োগ কমিটি

ডেস্ক রিপোর্ট : বিমানের পাইলট নিয়োগে সীমাহীন দুর্নীতির পেছনে সাবেক এমডি ও সিইও মোসাদ্দিক আহমেদ একা নন, তার মর্জিমতো নিয়োগ কমিটিও কাজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনেও ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

সেই অভিযোগের সত্যতা নিরূপণের জন্য নিয়োগ কমিটির সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনতে চাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিম কিসের ভিত্তিতে বলেছে নিয়োগের বিষয়ে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ কিছুই জানে না, সব দুর্নীতির দায় সদ্য সাবেক এমডির- তারও সত্যতা নিশ্চিত করতে চায় দুদক।

কোনো পক্ষের চাপে পরিচালনা পর্ষদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির তদন্তে আনা হয়নি, নাকি সত্যিই পর্ষদ জানে না তা সুনিশ্চিত করা হবে অনুসন্ধানে।

দুদক মনে করে, পর্ষদের সিদ্ধান্ত ছাড়া বিমানে নিয়োগ বা এ জাতীয় বড় ধরনের কাজ হবে এটা অবিশ্বাস্য। পাইলট নিয়োগের বিষয়ে ওই তদন্ত কমিটির প্রধানের প্রতিবেদনই বা কতটুকু সঠিক তাও জানবে সংস্থাটি। সেজন্য তদন্ত টিমের প্রধানের কাছে বক্তব্য জানতে চাওয়া হবে। খবর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রের।

সূত্র জানায়, দুদকের এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে পাইলট নিয়োগের বিধিমালা, ২০১৮ সালে পাইলট নিয়োগের অনুমোদনসংক্রান্ত রেকর্ড, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল, সাইকোমেট্রিক টেস্টের ফলাফল, প্রার্থীদের আবেদন বাছাই কমিটির নামসহ নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের তালিকা চেয়েছে দুদক।

সংস্থাটির সহকারী পরিচালক ও পাইলট নিয়োগে দুর্নীতির অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের সই করা চিঠিতে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে। গেল সপ্তাহে ওই চিঠি বিমানের এমডির বরাবর পাঠিয়ে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।

চিঠি অনুযায়ী রোববার দুদকের কাছে তথ্য সরবরাহের শেষ দিন। ওই তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করবেন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা।

পাইলট নিয়োগ ছাড়াও বিমানের নন হ্যান্ডলিং কার্গো শাখার অর্থ আত্মসাৎসহ সংস্থাটির বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদক থেকে চারটি পৃথক টিম একযোগে কাজ করছে। বাকি তিন টিমের একটির নেতৃত্বে রয়েছেন সিনিয়র উপ-পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন। অন্য দুটি টিমে আছেন সহকারী পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন ও আতাউর রহমান। এ চার টিমের কাজ সমন্বয় করছেন পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।

গত ১৫ দিনের অনুসন্ধানে দুদকের টেবিলে বিমানের দুর্নীতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চলে এসেছে। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতি সংক্রান্ত পৃথক দুটি তদন্ত প্রতিবেদন। এছাড়া দুদকের গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমেও বেশ কিছু তথ্য চলে এসেছে। এর মধ্যে অনেকের অস্বাভাবিক সম্পদের তথ্যও রয়েছে।

বিমানের সদ্য সাবেক এমডি ছাড়াও কয়েকজন পরিচালক, জিএম, অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তা এমনকি বিমানের সিবিএ নেতাদের সম্পদের তথ্য এখন দুদকের কাছে। চলছে সেইসব তথ্য যাছাই-বাছাই।

অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের দুদকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যদিও এরই মধ্যে একাধিক কর্মকর্তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। তবে তাদের দেয়া তথ্য যাছাই করে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

এছাড়া পাইলট নিয়োগে দুর্নীতির অনুসন্ধানে পরিচালক ফ্লাইট অপারেশনসহ আরও ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়েছে। এরই মধ্যে সাবেক এমডি, একাধিক পরিচালক ও সিবিএ নেতাসহ ৪০ জনের সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।

বিমানের দুর্নীতি দমনের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, এ প্রতিষ্ঠানটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না দুর্নীতির কারণে। কারা এর পেছনে রয়েছে তাদের সবাইকে আমরা তদন্তের আওতায় আনতে চাই। বিচারের কাঠগড়া পর্যন্ত পৌঁছে দিতে চাই। সে লক্ষ্যেই আমাদের সবগুলো টিম কাজ করছে।

দুর্নীতি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সম্প্রতি অব্যাহতি দেয়া এমডি ও সিইও মোসাদ্দিক আহমেদসহ ১০ জনের বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে ২ মে দুদক থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার এসপির (ইমিগ্রেশন) কাছে চিঠি পাঠানো হয়।

বিদেশ যাত্রায় অন্য যেসব কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তারা হলেন- বিমান শ্রমিক লীগ সভাপতি ও সিবিএ নেতা মসিকুর রহমান, ট্রাফিক সুপারভাইজার জাকির হোসেন, কমার্শিয়াল সুপারভাইজার রফিকুল আলম, গ্রাউন্ড সুপারভাইজার মিজানুর রহমান, গ্রাউন্ড সুপারভাইজার একেএম মাসুম বিল্লাহ, জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার মারুফ মেহেদী হাসান, কমার্শিয়াল অফিসার জাওয়াত তারিক খান, মাহফুজুল করিম সিদ্দিকী ও গোলাম কায়সার আহম্মেদ।

সংস্থাটির এক পরিচালক বলেন, আমরা সেসব লোকজনের বিরুদ্ধে বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে চিঠি দেই, সাধারণত যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বেশ গুরুতর।

সূত্র জানায়, দুদকের উপ-পরিচালক মো. নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত টিম বিমানের কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জের ৭২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। ১০ বছরে ওই খাত থেকে ৭২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হলেও সব তথ্য না থাকায় মাত্র ৪১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ তদন্তে কার্গো শাখায় ৪১২ কোটি টাকা লোপাটের তথ্য বেরিয়ে আসে। যদিও সরকারি অডিট রিপোর্টে এ অর্থ তসরুপের বিষয়ে জড়িতদের সম্পর্কে তেমন কিছু বলা হয়নি।

বিমানের নন হ্যান্ডলিং কার্গো শাখার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সম্পর্কে ওই রিপোর্টে বলা হয়, ‘সার্কুলার না থাকায় সিডিউলবহির্ভূতভাবে বিমান থেকে কোনো টাকা আদায় করা যায়নি।’

তবে দুদক বলছে, তাদের অনুসন্ধানে কোনো ফাঁকফোকর রাখা হবে না। বিমানের সব শাখার দুর্নীতি এবার বের করে এনে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জনেন্দ্র নাথ সরকার বিমানে পাইলট নিয়োগে দুর্নীতির তদন্ত করেন। সেই প্রতিবেদন তিনি মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। এরপর তা মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনা করে বিমানের এমডি ও সিইও মোসাদ্দিক আহমেদকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এছাড়া দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের আবেদনের ভিত্তিতে দুটি তদন্ত প্রতিবেদনই দুদককে সরবরাহ করে মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত দুদকের দুটি বিশেষ টিম প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিমানের মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগ, গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ ও কার্গো শাখার অনিয়ম-দুর্নীতির অনুসন্ধান করছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শাখার দুর্নীতির তথ্যও সংগ্রহ করবে এ টিম।

বিমানে পাইলট নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়ে যুগ্ম সচিবের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, বিমানে পাইলট নিয়োগের আগে পরিচালনা পর্ষদের কাছ থেকে শূন্য পদের অনুমোদন নেয়া হয়নি। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়স নির্ধারণে বিমানের প্রচলিত নিয়ম নীতি মানা হয়নি। বরং তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা দিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করে এমডির ভাতিজাসহ কমপক্ষে ৩০-৩২ প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়।

এতে আরও বলা হয়, প্রার্থীদের প্রাথমিক বাছাইয়ের কাজটিও বিধি মোতাবেক হয়নি। বরং এক্ষেত্রে কোনো কোনো ব্যক্তি ও পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে সুপারিশ অংশে আরও বলা হয়, অপারেশন ম্যানুয়াল পার্ট-এ অনুযায়ী নিয়োগের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মান বণ্টন ম্যানুয়াল অনুযায়ী না করে মৌখিক পরীক্ষায় শতকরা ৫০ নম্বর রেখে বিশেষ প্রার্থীদের সুবিধা দেয়া হয়। সুপারিশে ক্যাডেট পাইলট নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম সৃষ্টির জন্য নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদ বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে মর্মেও মতামত দেয়া হয়।

সূত্র জানায়, ওই প্রতিবেদনের সুপারিশ ও সার্বিক বিষয়াদি বিবেচনায় নিয়ে পাইলট নিয়োগ কমিটির সবাইকে অনুসন্ধানের আরওতায় আনা হচ্ছে। নিয়োগ কমিটিতে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে সাবেক এমডি মোসাদ্দিক আহমেদ ছাড়াও নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক, সদস্য সচিব, চিফ অব ট্রেনিং, চিফ অব টেকনিক্যাল, ম্যানেজার এমপ্লয়মেন্ট, ম্যানেজার পার্সোনাল, লিখিত পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের মধ্যে সাবেক এমডি ছাড়াও পরিচালক প্রশাসন, পরিচালক ফ্লাইট, চিফ অব অপারেশন ও ট্রেনিং ও জেনারেল ম্যানেজার, আবেদন বাছাই কমিটির সদস্য, সাইকোমেট্রিক টেস্ট ও মৌখিক পরীক্ষা যারা নিয়েছেন তাদের বক্তব্য নেবে দুদক।
সূত্র : যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত