প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

জীবনের গতিপথ

আমিন মুনশি : হঠাৎ করেই চাকরিটা হারাতে হলো। এমন এক সময়ে আমাদের বসবাস যখন খুব সহজে কোথাও চাকরি পাওয়াও মুশকিল। গত কদিন ধরে শহরের এ মাথা থেকে ও মাথায় ঘুরছি। পরিচিত ভাই-বন্ধুদের নক করছি। ফেসবুকে অনেক সিনিয়র পার্সনদের ইনবক্সে মেসেজ দিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কথা বলছি-কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছুতেই কিছু হলো না।

ছোটবেলায় বাবুল ভাইয়ের টেম্পোতে হেলপারের কাজ করতাম। তখনও লেখাপড়ার মর্ম বুঝতাম না। বাবুল ভাই শুধু বলতো, ‘আজকাল লেখাপড়ার কোনো দাম নাই। সবাই খালি ফেমাস হইতে চায়। কোনভাবে যদি একবার ফেমাস হওন যায় অথবা ফেসবুকে ভাইরাল হওন যায় তাইলেই লাইফ সেটেল্ড।’ আমি অবশ্য পরে বুঝতে পারছি বাবুল ভাইয়ের দুঃখ; নিজে ভালো লেখাপড়া শিখেও কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারেন নাই বলেন ওরকম বলতেন। তবে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আমি বাবুল ভাইয়ের কাছ থেকেই পেয়েছি-সততা।

দুই.

-‘বিয়া কইরা বউরে খাওয়াবি কি? তুই নিজে খাবি কি? কয় টেকার চাকরি করোস যে বিয়া করার শখ উঠছে?’-আমার বড় আপা নাঈমা বলেছে কথাগুলো। ঘটনাচক্রে বাবুল ভাইয়ের সাথেই বিয়ে হয়েছে ওর।

-‘ক্যান, বাবুল ভাই কি তোরে না খাওয়াইয়া রাখে? হে কয়টেকা কামায় রোজ? আর আমি একজন সাংবাদিক। আমার ফেস্টিজ সম্পর্কে কোনো আইডিয়া আছে তোর?

-‘সাংবাদিক না ছাঁই! আজ এহানে কাল ওহানে দৌড়াস। তোর দুলাভাই তো তাও ভালো। গাড়ির ড্রাইভার। ইনকামও তোর থেইক্যা বেশি করে।’

-‘আরে খালি টাকাই চিনলি, মান-মর্যাদা বুঝি কিছু না! থাক…’

চাকরিটা হারানোর পর থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে নাঈমা আপার ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে হয়। বয়সে আমরা বড়ছোট হলেও তুইতোকারি সম্পর্ক। বন্ধুর মতন। ছোটবেলা থেকে নাঈমা আপা কখনোই আমাকে কাঁদতে দেয় না। আমাকে রেখে আজও ভাত খেতে বসে না। ইদানিং সে বাসায় বসে টেইলারিংয়ের কাজ করে দোকান থেকে অর্ডার এনে। আব্বা-আম্মা মারা যাওয়ার পর আমরা হয়ে গেছি একে অন্যের পৃথিবী।

তিন.

আমাকে লেখাপড়া করানোর জন্য বাবুল ভাই আজও নিঃসন্তান! ভাবতেই কেমন গা শিউরে ওঠে। কতো কষ্ট, কতো ত্যাগের বিনিময়ে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পেরেছি সে কথা চিন্তা করলে আড্ডায় সময় নষ্ট করার বিলাসিতা মন থেকে উবে যায়। ধীরে ধীরে এখন আমি অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছি। সংবাদপত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আসলেই এ যুগে একাডেমিক লেখাপড়ার কোনো দাম নেই। কাজকর্মে যে যতোটা দক্ষ সে ততোটা যোগ্য…

সারাদিনে আজ তিনটা অফিসে গেলাম। সবখানেই চাকরি প্রায় কনফার্ম হয়েই যায়। নাঈমা আপাকে কল দিলে শুনি উল্টো কথা ‘এই বেতনে কী হবে? তোর বউ তো তিনদিনের মাথায় ভাগবো।’ আমার মাথায় ধরে না, ডিজিটাল যুগে বউ পালতে কতো বেতনের চাকরি জোগাড় করতে হবে আমায়?

দিনশেষে একরাশ বিষন্নতা নিয়ে বাসায় ফিরলাম। ছোট্ট রুমটাতে ঝামটি মেরে শুয়ে থাকতে থাকতে মাথায় একটি প্ল্যান এলো। মাঝরাতে বাবুল ভাই যখন ফিরবে তখন ক্ষমা চাইবো তার কাছে। জানতে চাইবো, এক জীবনে কতো ত্যাগ স্বীকার করা যায়! হয়তো দেখা গেলো-তিনিই আমাকে আগে বুকে টেনে নিয়ে বলবেন, ‘এখন আর আমার কে আছেরে নাঈম! তোরাই তো আমার সবকিছু। ছোটোকালে তোরে যদি আরো আগেই লেখাপড়ায় দিতে পারতাম তাহলে আজ এ অবস্থা হতো না। আমি যে কদিন বাঁইচা আছি যে কয় টাকা বেতনের চাকরিই পাস, কর। তবে ভবিষ্যতের কথা ভুলিস না।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত