প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বাংলাদেশির মৃত্যু, তিন পাচারকারী আটক

সুজন কৈরী : অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবিতে বাংলাদেশী নিহতের ঘটনায় জড়িত চক্রের ৩ সদস্যকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করেছে র‌্যাব -১। তারা হলেন- শরিয়তপুরের মো. আক্কাস মাতুব্বর (৩৯), সিলেটের এনামুল হক তালুকদার (৪৬) ও বি-বাড়িয়ার মো. আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া (৩৪)।

শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব জানায়, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত আব্দুল্লাপুর, খিলক্ষেত ও বিমানবন্দর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওই তিনজনকে আটক করে। আটককৃতরা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমন অপরাধ করছে। এই সংঘবদ্ধ চক্রটি বিদেশী চক্র যোগসাজসে অবৈধভাবে ইউরোপে লোক পাঠিয়ে আসছে। এই সিন্ডিকেটটি ৩টি ধাপে কাজগুলো করত। সেগুলো হলো- বিদেশে গমনেচ্ছুক নির্বাচন, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় পাঠানো ও লিবিয়া থেকে ইউরোপ পাঠানো।

র‌্যাব জানায়, বিদেশে গমনেচ্ছুক নির্বাচনকালে চক্রের দেশীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষদের অল্প খরচে উন্নত দেশে গমনের প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে থাকে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। এই বিদেশ গমনেচ্ছুকদের বিদেশে গমনের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকেট ক্রয় ইত্যাদি কার্যাবলী এই সিন্ডিকেটের তত্ত¡বধানে সম্পন্ন হয়ে থাকে। পরে তাদের এককালীন বা ধাপে ধাপে কিস্তি নির্ধারণ করে ইউরোপের পথে পাড়ি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রার্থীদের সামর্থ অনুযায়ী ধাপ নির্বাচন করে থাকে। ইউরোপ গমনের ক্ষেত্রে তারা ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার বেশি অর্থ নিয়ে থাকে। তার মধ্যে সাড়ে ৪ থেকে ৫লাখ টাকা লিবিয়ায় গমনের আগে এবং বাকি টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার পর ভুক্তভোগীর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে নেয়।

চক্রটি বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি রুট ব্যবহার করে থাকে। রুটগুলো তারা সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী মাঝে মধ্যে পরিবর্তন অথবা নতুন রুট নির্ধারণ করে। সম্প্রতি লিবিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে তারা ৩টি রুট ব্যবহার করছে। সেগুলো হলো- বাংলাদেশ থেকে ইস্তাম্বুল (তুরস্ক) থেকে লিবিয়া, বাংলাদেশ থেকে ভারত হয়ে শ্রীলংকা (৪-৫দিন অবস্থান) থেকে ইস্তাম্বুল (ট্রানজিট) থেকে ত্রিপলী (লিবিয়া) যাওয়া এবং বাংলাদেশ থেকে দুবাই (৭-৮ দিন অবস্থান) থেকে আম্মান (জর্ডান) (ট্রানজিট) থেকে বেনগাজী (লিবিয়া) থেকে ত্রিপলী (লিবিয়া)।

র‌্যাব জানায়, ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবিতে হতাহতদের আটককৃতরা বাংলাদেশ থেকে বাসে কলকাতা এবং সেখান থেকে বিমানে দিল্লীতে পাঠিয়েছিল। এরপর দিল্লী থেকে বিমানে শ্রীলংকায় পাঠানো হয়। ভুক্তভোগীরা শ্রীলংকায় ওই স্থানের এজেন্টদের তত্ত্বাবধানে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করে। পরে ত্রিপলী (লিবিয়া) থেকে বাংলাদেশী এক এজেন্ট কথিত ‘ওকে টু বোর্ড’ ডকুমেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রীলংকায় এজেন্টদের কাছে পাঠায়ে। শ্রীলংকায় ওই এজেন্টরা ভুক্তভোগীদের ডকুমেন্ট হস্তান্তর করে। এরপর এজেন্টরা ভুক্তভোগীদের বিমানে ইস্তাম্বুল তুরস্কের ট্রানজিট হয়ে ত্রিপলী লিবিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে দুবাইয়ের মাধ্যমেও লিবিয়ায় পাঠানো হয়। দুবাইয়ে পৌছে তাদের বিদেশী এজেন্টদের তত্ত্বাবধানে ৭/৮ দিন অবস্থান করানো হয়। বেনগাজীতে পাঠনোর লক্ষ্যে বেনগাজী থেকে এজেন্টরা কথিত ‘মরাকাপা’ নামক একটি ডকুমেন্ট দুবাইতে পাঠায়। যা দুবাইয়ে অবস্থানরত বিদেশী এজেন্টদের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ওই ডকুমেন্টসহ বিদেশী এজেন্ট তাদেরকে আম্মান (জর্ডান) ট্রানজিট নিয়ে বেনগাজী লিবিয়ায় পাঠায়। বেনগাজীতে বাংলাদেশী এজেন্ট তাদেরকে বেনগাজী থেকে ত্রিপলীতে স্থানান্তর করে।

র‌্যাব আরো জানায়, ভুক্তভোগীরা ত্রিপলীতে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি কথিত ‘গুডলাক ভাই’সহ আরো কয়েকজন এজেন্ট তাদের গ্রহণ করে। তাদের ত্রিপলীতে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করানো হয়। সেখানে অবস্থানকালীন এজেন্টদের দেশীয় প্রতিনিধির দ্বারা ভিকটিমদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে থাকে। এরপর ভিকটিমদের ত্রিপলীর বন্দর এলাকায় একটি সিন্ডিকেটের কাছে অর্থের বিনিময়ে ইউরোপে পাচারের উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করে। ওই সিন্ডিকেট তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেয়। পরে সিন্ডিকেটটি সমুদ্রপথে অতিক্রমের জন্য নৌ-যান চালনা এবং দিক নির্ণয় যন্ত্র পরিচালনাসহ আনুসাঙ্গিক বিষয়ের উপর নানাবিধ প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট দিনে ভোর রাতে এক সঙ্গে কয়েকটি নৌ-যান লিবিয়া থেকে তিউনেশিয়া উপকূলীয় চ্যানেলের হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে গমনকালে ভিকটিমরা ভূমধ্যসাগরে মাঝে মধ্যেই দূর্ঘটনার শিকার হয় এবং জীবনাবসানের ঘটনা ঘটে থাকে।

ভূমধ্যসাগরের নৌকা ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ/নিহত বাংলাদেশিরা বৃহত্তর সিলেট, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ ও নোয়াখালীর বাসিন্দা। তারা বেশ কয়েকটি চক্রের মাধ্যমে অবৈধপথে ইউরোপে গমনাগমনের জন্য প্রতারনার শিকার হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেটের সম্পর্কে তথ্য পেয়েছে উল্লেখ করে র‌্যাব জানায়, আটক এনামুল হক এবং রাজ্জাক একটি সিন্ডিকেটের সদস্য। এনামুল বিএ পাস। তার সিলেট ইয়াহিয়া ওভারসিজ নামে জিন্দাবাজারে একটি এজেন্সি রয়েছে। প্রায় ১০/১২ বছর ধরে এ পেশায় নিয়োজিত। আটক আব্দুর রাজ্জাক এইচএসসি পাস। তিনি এনামুলের ব্রোকার হিসেবে কাজ করেন। প্রায় ৪/৫ বছর ধরে এই পেশায় নিয়োজিত। অপরদিকে আটক আক্কাস মাতুব্বর ২/৩ বছর ধরে ব্রোকার/দালাল হিসেবে কাজ করছে। ঢাকায় একটি চক্রের হয়ে তিনি কাজ করেন।

র‌্যাব আরো জানায়, অবৈধভাবে পাঠানোকালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত র‌্যাব ২০৯টি অভিযান চালিয়ে ৬০৯ জনকে আটক করে এবং ৭০৪ জন পুরুষ ও ১১০ জন নারীসহ মোট ৮১৪ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে।

প্রসঙ্গত, গত ৯ মে রাতে অবৈধভাবে ইউরোপে গমনকালে ভূমধ্যসাগরের তিউনেশিয়া উপকূলে নৌকা ডুবিতে প্রায় ৮৫-৯০ জন নিহত/নিখোঁজ হয়। তার মধ্যে ৩৯জন বাংলাদেশী। এছাড়া মিশরসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকও রয়েছে। বাংলাদেশে ভিকটিমদের আত্মীয়স্বজন শরিয়তপুরের নড়িয়া ও সিলেটের বিশ্বনাথ থানায় ২টি মামলা করে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত