প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ, লাভবান বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক খাত

তানজিনা তানিন : বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয় চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ। দুই দেশের শুল্কারোপ নিয়ে হুমকি-পাল্টা হুমকি চলছে এক বছর ধরে। যতই দীর্ঘ হচ্ছে চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ততই সম্ভাবনা বাড়ছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এটি একটি বড় সুযোগ। আমরা ইতোমধ্যেই এ সুযোগকে কাজে লাগাতে শুরু করেছি। ইনকিলাব।

চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের সুফল মিলছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে। চীন থেকে পণ্য কেনা কমিয়ে দেয়ায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গত অর্থবছরে যেখানে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিলো মাত্র দুই দশমিক ৮৫ শতাংশ, সেখানে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
২০১৮ সালে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) চীন ও ভিয়েতনামের চেয়ে মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। চীনের প্রবৃদ্ধি এক দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। গত বছর রপ্তানিতে চীন প্রথম ও ভিয়েতনাম দ্বিতীয় ছিলো। বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো তৃতীয়। অবশ্য মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানির সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে কম্বোডিয়া। দেশটি ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে মার্কিন বাজারে।

চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধকে একটি বড় সুযোগ বলে মনে করছেন দেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কোনো সন্দেহ নেই, মার্কিন বাজারে চলতি অর্থবছরে পোশাক রপ্তানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ। অনেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান এখন চীন থেকে পোশাক কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। চীনের বাজার ছেড়ে তারা মূলত কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বাজারের দিকে ঝুঁকেছে। তার কিছু অংশ বাংলাদেশের বাজারে এসেছে। তবে সুযোগটি আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছি না। কারণ বাজারটি বেশি দখলে নিয়েছে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম। কৌশলগত ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে তারা আমাদের চেয়ে বেশি সুযোগ নিয়েছে। অবশ্য আমাদের আরও ভালো করার সুযোগ রয়েছে মার্কিন বাজারে। এর জন্য মার্কিন ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।

অন্যদিকে বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতে বিনিয়োগ করছে চীনারা। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক চাপও বাংলাদেশের প্রতি চীনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। এমনিতেই চীনে শ্রম ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অন্যান্য দেশে উৎপাদন সরিয়ে নেয়ার কথা ভাবছিলেন বস্ত্র ও পোশাকের ক্রেতারা। এখন চীনারাও তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের পণ্যের ওপর বড় ধরনের শুল্কারোপের শঙ্কায় রয়েছেন। এ শুল্ক এড়াতে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করতে চাইছেন দেশটির উদ্যোক্তারা। এতে করে চীনের অস্তগামী শিল্পগুলোর (সানসেট ইন্ডাস্ট্রিজ) গন্তব্য হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় বস্ত্র ও পোশাকের মতো স্বল্প মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের উৎপাদন অন্যান্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছেন তারা।

বস্ত্র ও পোশাক খাতে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রতিফলন দেখা গেছে দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধিদের বক্তব্যে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সফরে আসেন চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের (সিসিপিআইটি) প্রতিনিধিরা। সফরকালে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে সিসিপিআইটির পরিচালক যৌ শিয়া বলেন, চীনের সানডং প্রদেশের অনেক বিনিয়োগ আছে বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতে। এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কয়েক বছর ধরে চীনারা বাংলাদেশে অফশোরিংয়ের আগ্রহ দেখাচ্ছেন। একদিকে পোশাক ও বস্ত্রের মার্কিন ক্রেতারা চীনের বিকল্প উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন। আবার চীনা প্রস্তুতকারকরাও নিজেদের বাজার টিকিয়ে রাখতে যৌথ ও শতভাগ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিতে শুরু করেছেন। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠানের সদস্য হওয়ার কথা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, বিগত অর্থবছরে দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতে চীনের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ প্রবাহ ২৩০ শতাংশ বেড়েছে। গত পাঁচ অর্থবছরে দেশে চীনের নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ৬২ কোটি ৭০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এর মধ্যে বস্ত্র ও পোশাক খাতে চীনা এফডিআইয়ের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি ডলার, যা মোট চীনা এফডিআইয়ের ২০ শতাংশের মতো।

বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে পোশাক খাতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা এখন অনেক ভালো। পর্যায়ক্রমে আমাদের উচ্চমূল্য সংযোজন সক্ষম পণ্য তৈরিতে মনোনিবেশ করতে হবে। এক্ষেত্রে চীনা বিনিয়োগকে আমরা স্বাগত জানাই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত