প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরা এবং বাংলাদেশে আলোর মিছিল

প্রফেসর ড. এম শাহ্ নওয়াজ আলি : ১৯৮১ সালে দেশের টানে, দেশেপ্রেমের মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে নিজ জš§ভূমিতে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এরপর থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাসে রচিত হতে থাকে নতুন ইতিহাস। শেখ হাসিনার জীবনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। স্বৈরাচার এরশাদ কিংবা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব তথা গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারে নিরন্তর চেষ্টা চালাতে গিয়ে তিনি বহুবার হামলার শিকার হয়েছেন, ঘাতকদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের মানসকন্যা হয়ে সৃষ্টিকর্তার অলৌকিক নিয়মে তিনি আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন।
৮১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অসংখ্যবার ঘাতকদের হত্যা চেষ্টাকে পরাজিত করে কখনও রাষ্ট্রনায়ক, কখনো-বা বিরোধীদলীয় নেত্রী, আবার কখনো রাজপথের প্রতিবাদী কা-ারি হয়ে দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোঁটাতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এ কথা স্বীকার করতেই হবে ঘাতকদের হিংস্র থাবা থেকে, স্বাধীনতাবিরোধীদের হামলা থেকে, মৌলবাদী ও জঙ্গিদের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা থেকে একাধিকবার বেঁচে গিয়ে শেখ হাসিনা আজ ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। সন্ত্রাসমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে ছুটে চলেছেন টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রূপসা থেকে পাটুরিয়া। কারণ, তার শরীরে বইছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের সৎ, সংগ্রামী, প্রতিবাদী এবং দেশপ্রেমের রক্তের ধারা।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনার জীবনে একটি রক্তাক্ত দিন। স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের সমাবেশে যাবার প্রাক্কালে এরশাদের মদদপুষ্ট তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে-গুলিতে প্রাণ হারায় ৪০ জন নেতাকর্মী। শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি করলেও ৪০ নেতাকর্মীর রক্তের বিনিময়ে ঘাতকদের টার্গেট ব্যর্থ হয়ে শেখ হাসিনা বেঁচে যান। এরপরও থেমে থাকেনি ষড়যন্ত্রকারীরা। একই বছর ১৫ আগস্ট শোক দিবসের কর্মসূচি চলাকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে ঘাতক চক্র। কিন্তু লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। এরপর ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে পতন হয় স্বৈরশাসক এরশাদের। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে শুরু হয় আরেক অধ্যায়।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই বছর ১৫ সেপ্টেম্বর উপনির্বাচনের দিন ধানমন্ডির গ্রিন রোডে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে ঘাতকেরা। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সেবারও ঘাতকদের টার্গেট ব্যর্থতায় পরিণত হয়। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে সারাদেশ যখন আন্দোলন-সংগ্রাম উত্তাল সেই মুহূর্তে দেশব্যাপী লং মার্চের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ট্রেনে যাবার পথে পাবনার ঈশ্বরদীতে শেখ হাসিনার কামরাকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি করে ঘাতকেরা। কিন্তু শেখ হাসিনা অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান। এরপর ১৯৯৫ সালের মার্চে পান্থপথে আওয়ামী লীগের দলীয় সভায় শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়। বিএনপি সরকারের আমলে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে শেষ হামলাটি চালানো হয়, ১৯৯৬ সালে, কার্জন হলের একটি অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে। কিন্তু প্রতিবারই ঘাতকেরা ব্যর্থ হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গিয়েছেন। ১২ জুন ১৯৯৬ সালে অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পন্থায় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ’৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ঘাতক চক্র এবং তাদের দোসররা, স্বাধীনতাবিরোধীরা তাকে হত্যার নতুন পন্থা খুঁজতে থাকে। ৯৬ সালের ১৫ আগস্ট টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারে বোমা হামলার পূর্ব পরিকল্পনা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে আগেই ফাঁস হওয়ায় চক্রান্তকারীরা ব্যর্থ হয়। এরপর ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের শক্তিশালী বোমা পুতে রাখে ঘাতকরা। জঙ্গি তথা মৌলবাদী নেতা মুফতি হান্নানের নেতৃত্বে ওই হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতায় ঘাতকদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে যান। ২০০১ সালের ২৯ মে খুলনার রূপসা সেতুর উদ্বোধনের দিন শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। এরপর ২০০১ সালের ১৪ জুলাই মেয়াদপূর্তি শেষে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়েন। ১ অক্টোবর ২০০১ সালের নীল নকশার নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা দখল করে। শুরু হয় হত্যা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ, কালো টাকায় জোয়ার এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন, তথা মানবতাবিরোধী সকল অপরাধ কর্মকা-ে জর্জরিত হয়ে সৃষ্টি হয় বিবর্ণ এক বাংলাদেশ।

২০০১ সালের ১ অক্টোবরের পর মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী এবং স্বাধীনতাবিরোধী জোট সরকারের প্রত্যক্ষ- পরোক্ষ মদদে কিংবা আশ্রয়ে বিরোধীদলের কত লোকের মৃত্যু হয়েছে, কতো সংখ্যক মানুষ ঘর-বাড়ি বসত-ভিটা ছেড়েছে কিংবা মহিমা-পূর্ণিমাদের মতো কতো নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, সে তথ্য আমার জানা নেই। তবে একথা নিশ্চিত করে বলতে পারি, ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী দিনগুলোতে বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী বর্বরোচিত ঘটনাগুলো বিশ্ব বিবেককেও নাড়া দিয়েছে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বিবেককে স্পর্শ করেনি। ২০০৪ সালের ৭ মে জনসভা চলাকলে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয় জনপ্রিয় নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার এমপিকে। আহসানউল্লাহ মাস্টারকে হত্যার পর বাবর-তারেকের হাওয়া ভবন যেন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একজন মন্ত্রীর (তৎকালীন উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু) সরকারি বাসভবনে জঙ্গি নেতাদের নিয়ে একটি দেশের বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এ জঘন্য অপরাধের ঘৃণা প্রকাশের ভাষা আমাদের জানা আছে কি? তারেক-বাবরের পরিকল্পনায় শেখ হাসিনাকে হত্যার চূড়ান্ত তারিখ এবং স্থান নির্ধারিত হয় ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে।

১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালীন শেখ হাসিনাকে যতবার হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে, তা একটি নজীরবিহীন ঘটনা। এ পরিস্থিতিতে এবং গণদাবির প্রেক্ষিতে ২০০১ সালে সংসদে জাতির পিতার পরিবাবের সদস্যদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য বিল পাস হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হবার পর পরিকল্পিতভাবে সে আইন বাতিল করে শেখ হাসিনাকে নিরাপত্তাহীন অবস্থায় ফেলে ঘাতকদের উস্কে দিয়ে হত্যার পথ প্রশস্ত করে দেয়। জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে সে ঘৃণীত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে নারকীয় হত্যাকা-ের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু ঘাতকদদের মূল টার্গেট ব্যর্থ হয়। গুরুতর আহত হয়েও বেঁচে যান শেখ হাসিনা।

এরপর তারেক-বাবরের পরিকল্পনায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারীদের আড়াল করতে ঘৃণিত-ধিকৃত মিথ্যাচার নাটক আমাদের সকলেরই জানা। জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে হাওয়া ভবনের কুকীর্তি, ভ-ামির সব মন্ত্র জাতির কাছে ফাঁস হয়েছে। গণধিকৃত বাবর-পিন্টু আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ইতিহাসের আলোয় সত্যের জয় হয়েছে। এখন বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে ঘাতকদের বিরুদ্ধে রায় দ্রুত কার্যকর করতেই হবে। তবেই বাঙালির জাতির ইতিহাসে ১৫ আগস্টের মতো আরেক কলঙ্কের কালিমা দূর হবে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে টানা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশকে পরিচালনা করছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আলোকিত বাংলাদেশ। যতোদিন শেখ হাসিনা বেঁচে থাকবেন, বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন ততোদিন এই দেশ আলোকিত হতে থাকবে।
লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত