প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফখরুলের শূন্য আসনে থামলো শপথ নাটক

ডেস্ক রিপোর্ট : সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ না নেওয়ায় বিএনপির মহাসচিব ও বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আসন শূন্য ঘোষণা করেছে সংসদ। সংসদে যোগদানের বিষয়ে গত সোমবার দলীয় সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিয়ে নিজেই শপথ না নেওয়ায় নাটকীয়ভাবে শেষ হয়েছে বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ প্রক্রিয়া।

মির্জা ফখরুল গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি দলীয় সিদ্ধান্তেই শপথ নেননি। বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফখরুলের ওপর আর আস্থা রাখতে পারছে না শীর্ষ নেতৃত্ব। সংসদে তাই ফখরুলের প্রতিনিধিত্ব চাইছে না তারা। তিনি আরও বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই ফখরুলের কর্মকা- নিয়ে দলের মধ্যে নেতিবাচক প্রশ্ন উঠেছে। দলের সিনিয়র নেতারা অভিযোগ করেছেন, মির্জা ফখরুল দলের হয়ে ঠিকভাবে কাজ করছেন না।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের বৈঠকে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ফখরুলের আসন শূন্য হওয়ার বিষয়ে সংসদকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে ৯০ দিনের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ নেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি অসমর্থ (শপথ না নেওয়ায়) হওয়ায় তার আসনটি শূন্য হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রবীণ অধ্যাপক হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপির সংসদে যোগদানের বিষয়টি অবশ্যই তাদের জন্য ইতিবাচক হয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে। আর ফখরুলের এ সিদ্ধান্ত অবশ্যই দলে অস্থিরতা তৈরি করবে। এতে স্পষ্ট যে, দলটিতে কোনো সমঝোতা নেই। নিজেই সংসদে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে নিজেই পিছিয়ে পড়ায় সবার মনে অবশ্যই সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তারপর ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে বিএনপির সংসদে আসার সিদ্ধান্ত সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য সুখবর। তারা তাদের দাবিদাওয়াগুলো সংসদে এসে বলবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপির আরও আগেই সংসদে আসা উচিত ছিল। আর মির্জা ফখরুল কেন শপথ নেননি সেটি দলীয়ও হতে পারে, আবার তার ব্যক্তিগত হতে পারে। তবে আমি মনে করি, মেইন বিএনপির সংসদে আসার সিদ্ধান্তে দলটিরই উপকার হয়েছে। মির্জা ফখরুল শপথ নিলে আরও ভালো হতো। এখন নতুন মেরুকরণ দেখতে হবে বিএনপিতে।

এ ব্যাপারে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ বীর বিক্রম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর মির্জা ফখরুল কেন শপথ নেননি এটা হাইকমান্ড জানেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে এরকম হয়েই থাকে। বিএনপি সংসদেই যেতে চেয়েছিল। নির্বাচনে কারচুপি হবে জেনেও আমরা অংশ নিয়েছি। চাপের বিষয়টি আমার মনে হয় না সঠিক।’

দলের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারেক রহমানের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় মির্জা ফখরুল শপথ নেননি। এখন তার মহাসচিব পদও হারাতে হতে পারে। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের প্রচারের সময় থেকেই মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে দলের সিনিয়র নেতারা অভিযোগ করে আসছিলেন। সর্বশেষ ফলাফলের পর ভরাডুবির জন্য সিনিয়র নেতারা তার মেরুদ-হীন অবস্থানকে দায়ী করেন।

তারেকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিএনপি সব নেতাকর্মী দ্বিধাবিভক্ত। ফখরুলের সিদ্ধান্তহীনতা দলের সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল করেছে। তিনি তার নির্বাচনীয় এলাকায়ও অজনপ্রিয়। তিনি ধারণা দেন, বগুড়া-৬ আসন থেকে তারেকের বিশ^স্ত কাউকেই উপনির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে জিতিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ বলেন, বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদে এসেছেন মূলত তাদের নির্বাচনী আসনের জনগণের চাপে। আমি মনে করি শপথ নেওয়া সংসদ সদস্যরা নিজ এলাকার জনগণকে সম্মান জানিয়েছেন এর মধ্য দিয়ে। শপথ নেওয়া সংসদ সদস্যদের অভিনন্দন জানান হানিফ। মির্জা ফখরুলের বিষয়টি বিএনপির দলীয় হতে পারে। তার শপথ না নেওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনিই হয়তো এতদিন বিএনপিকে সংসদে যোগদানের বিষয়ে বাধা দিয়ে আসছেন। এক প্রশ্নে হানিফ বলেন, বিএনপি সংসদে যাওয়ার সঙ্গে খালেদা জিয়ার মামলার কোনো সম্পর্ক নেই।

বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপির এখন উচিত হবে নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়া। তাদের আরও আগেই সংসদে যাওয়া উচিত ছিল। তবে সংসদে সংখ্যার দিক থেকে কম হলেও সরকারপক্ষকেও বিএনপির ও অন্যান্য বিরোধী দলের সদস্যদের মতপ্রকাশের সুযোগ দেওয়া উচিত। বিএনপি সংসদে যোগ দেওয়ায় আওয়ামী লীগের জন্যও জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ইতিবাচক হয়েছে। বিএনপি অবশ্যই এ ক্ষেত্রে অনেক ভালো কাজ করেছে।

এমাজউদ্দীন আরও বলেন, তবে সংসদ কার্যকর রাখা নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন দলের ওপর। তারা যদি বিএনপির ওপর দমনপীড়ন অব্যাহত রাখে এবং তাদের সংসদে কথা বলতে না দেওয়া হয় তবে সংসদ কার্যকর হবে না। তবে ফখরুলের ঘটনায় আবারও নতুন মোড় নেবে বিএনপিতে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্তও স্থিতিশীলতা এলো না।

এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ দেশ রূপান্তরকে জানান, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার নির্ধারিত ৯০ দিন গত সোমবার শেষ হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যেহেতু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সময়ের জন্য আবেদন করেননি, তাই সংসদের স্পিকার সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আসনটি শূন্য ঘোষণা করতে পারেন। এরপর সংসদ সচিবালয় থেকে নির্বাচন কমিশনে আসনটি শূন্য ঘোষণা হওয়ার একটি চিঠি পাঠাবেন। চিঠি পেলে কমিশন আসনটি শূন্য ঘোষণা করে গেজেট আকারে প্রকাশ করবে। ওই গেজেট প্রকাশের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে ইসি। ইসি সচিব আরও বলেন, আমরা এখনো চিঠি পাইনি। চিঠি পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

গত সোমবার রাত পৌনে ৮টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর আগে, ওইদিন বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বিএনপির নির্বাচিত চার সংসদ সদস্যকে শপথবাক্য পাঠ করান। এদিন শপথ নেন বগুড়া-৪ আসন থেকে নির্বাচিত মোশারফ হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মো. আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের মো. হারুন-অর রশীদ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া। এর আগে শপথ নিয়েছেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের জাহিদুর রহমান জাহিদ ও গণফোরামের মোকাব্বির খান এবং সুলতান মোহাম্মদ মনসুর।

যদিও শপথ নেওয়া এমপিরা সবাই বলেছেন, তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে সংসদে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা সংসদেও পুনর্নির্বাচনের দাবি জানাবেন।

এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে বিএনপি শপথ না নেওয়ার ঘোষণা দিলেও গত বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদ শপথগ্রহণ করেন। পরে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ও মিত্ররা। মাত্র আটটি আসন পায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচিত আটজনের মধ্যে ছয়জন বিএনপির আর দুজন গণফোরামের। তবে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে তা প্রত্যাখ্যান করে ঐক্যফ্রন্ট।

গণফোরামের দুই সংসদ সদস্যের মধ্যে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে বিএনপির প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর গত ৭ মার্চ শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন। এরপর ২ এপ্রিল সিলেট-২ আসন থেকে গণফোরামের প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত মোকাব্বির খানও শপথ নেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের শপথ নেওয়ার ক্ষেত্রে গত সোমবার ছিল শেষ দিন। অধিবেশন শুরুর পর ৯০ দিনের মধ্যে কেউ শপথ না নিলে ওই আসনে নতুন নির্বাচন আয়োজনের কথা ইসি এরই মধ্যে জানিয়েছে।

নবম জাতীয় সংসদে বিএনপি মাত্র ২৮টি আসন পেয়ে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। কিন্তু ওই পাঁচ বছর বেশিরভাগ সময়েই বিএনপি সংসদ সদস্যরা অধিবেশনে অনুপস্থিত ছিলেন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় বিএনপি সংসদের বাইরে থেকে যায়। সেই সময়ও দলের তৃণমূলসহ বেশিরভাগ নেতাকর্মীরাই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও দলটি ছিল নেতিবাচক। শেষ পর্যন্ত গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে দলটি অংশ নেয় এবং আট আসন পায়। এর মধ্যে বিএনপির ছয়টি আসন। এই পরিস্থিতিতে আবারও দলটি সংসদ বর্জনের ঘোষণা দেয়।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের পরে শপথ নেওয়ার জন্য স্পিকার ড. শিরীন শারমিনকে কোনো চিঠি তিনি দেননি। তার শপথ না নেওয়ার বিষয়টি দলের কৌশলের একটি অংশ। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আওয়াজ নামের একটি সংগঠনের আয়োজনে ‘উন্নয়নের মৃত্যুকূপে জনজীবন/নুসরাত একটি প্রতিবাদ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘স্পিকারের কাছে কোনো সময় চাইনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কিছু কিছু পত্রিকা লিখেছে আমি শপথের জন্য সময় চেয়েছি। একটি পত্রিকা লিখেছে আমি আজ শপথ গ্রহণ করব। এটা সাংবাদিকতার কোনো এথিকসের মধ্যে পড়ে না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যে শপথ নিয়েছি এর জন্য অনেকে অনেক মন্তব্য করেছেন। কিন্তু সময়ই প্রমাণ করবে শপথ নেওয়াটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল কি না। আগে আমরা শপথ নিইনি তার মানে এখন নেব না, তা তো হতে পারে না। আজকে যে শপথ নিয়েছি সেটা ভয়াবহ দানবকে পরাজিত করার জন্যই নিয়েছি।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সবাই শপথ নিয়েছে কিন্তু আমি শপথ নিইনি, এটা আমাদের দলের সিদ্ধান্ত। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘সোমবার থেকে রাজনীতি গরম। নিঃসন্দেহে এটি চমক, ইউটার্নও মনে করতে পারেন। আমাদের সিদ্ধান্ত অন্যরকম ছিল। ৩০ ডিসেম্বর দেশে কোনো নির্বাচন হয়নি, প্রহসন হয়েছে। সময়ের প্রয়োজনে রাজনীতিতে অনেক কিছুই হয়। সময়ই ঠিক করে দেবে আমাদের এই সিদ্ধান্ত ভুল, না সঠিক।’

‘সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করিনি’ এমন দাবি করে তিনি বলেন, ‘কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সমঝোতা করলে অনেক আগেই তিনি এ দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকতেন। আমরা কোনো বিদেশির পরামর্শে কিছু করিনি। আমরা চলমান রাজনীতি দেখছি। এগুলো বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
সূত্র : দেশ রূপান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত