প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইয়েতির পায়ের ছাপ দেখেছে ভারতীয় সেনারা, মানতে নারাজ বিজ্ঞানীরা

সালেহ্ বিপ্লব : রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে প্রাণিবিজ্ঞানিদের, তুমুল উত্তেজনায় ফেটে পড়েছেন সারাবিশ্বের মানুষ। পৌরানিক কাহিনীতে বিশালদেহী তুষার মানবের কথা আছে, ভালুকের মতো রহস্যময় অদেখা যে প্রাণীকে ইয়েতি নামে ডাকা হয়। মানুষের মনে একই সাথে ভয় ও বিস্ময়ে জেগে থাকা এই প্রাণীর পায়ের ছাপসহ বিভিন্ন চিহ্নের কথা জানা গেছে, সেও দুই শতাব্দি আগে থেকে শুরু। তবে এই প্রাণীটির অস্তিত্বের কোন শক্ত প্রমাণই মেলেনি এখনো। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন ইয়েতির পায়ের ছাপ টুইট করে, তখন অবিশ্বাসের খুঁটি একটু হলেও দুর্বল হয়ে যায়।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর এডিজি পিআই টুইটে বলেছেন, For the first time, an Moutaineering Expedition Team has sited Mysterious Footprints of mythical beast ‘Yeti’ measuring 32×15 inches close to Makalu Base Camp on 09 April 2019. This elusive snowman has only been sighted at Makalu-Barun National Park in the past.

দু’বছর আগেও ভারত সোরগোল তুলেছিলো ইয়েতি নিয়ে। তবে এবার প্রসেনজিৎ নন, ইয়েতির পায়ের ছাপ দেখেছেন সেনাসদস্যরা। ২০১৭ সালে ‘ইয়েতি অভিযান’ সিনেমা যে থ্রিল ছড়িয়েছিলো, এবারকার থ্রিলের তুলনায় তা নস্যিমাত্র। সারাবিশ্বে তোলপাড় লেগে গেছে, নেপালে ইয়েতির পায়ের ছাপ পাওয়ার খবরে। কে কোথায় ইয়েতির পায়ের ছাপ দেখেছে, প্রাণহিম করা গোঙ্গানি শুনেছে, এসব কথা হাজার বছরের পুরানো। রূপকথার গল্প। সারা দুনিয়ার মানুষ শুনে আসছে হিমবাহের সাথে আসে ইয়েতি। তুষার মানব। কারো কারো মতে, ইয়েতি দেখতে খানিকটা বনমানুষের মতো। বরফের এলাকায় হাজার বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা ইয়েতিকে বেশ কিছু সম্প্রদায় পুজো করে । ঊনিশ শতকে এই বিশালাকার তুষারমানব সম্পর্কে শোনা গিয়েছিলো, এরা নাকি হিমবাহের সঙ্গে আসে। নিজেদের সঙ্গে রাখে পাথরের ধারালো অস্ত্র।

এতদিন পর্যন্ত যে তথ্য ছিলো, তাতে বলা হত ইয়েতি অর্থাৎ তুষার মানব হিমালয় অঞ্চলের কল্পিত জীব। মানুষের মতোই দুপেয়ে তারা। সভ্য দুনিয়ায় ইয়েতির বর্ণনা প্রথম শোনান পর্বত অভিযাত্রী হাডসন, ১৮৩২ সালে। ১৮৯৯ সালে লরেন্স ওয়েডেল, ১৯৩৭ ব্রিটিশ অভিযাত্রী ফ্রাঙ্ক স্মিদি রহস্যময় তুষার মানবের অতিকায় পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়ার কথা জানান। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে পর্বত অভিযাত্রীরা জানান, ইয়েতির পায়ের ছাপ দেখেছেন তারা।

ইয়েতির নাম অনেকগুলো। এশিয়ায় তিব্বত ও নেপালে এলাকাতেই ইয়েতিকে একেকটি জায়গায় এক এক রকমের নামে ডাকা হয়। তিব্বতি ভাষায়, ইয়েতিকে ‘মিচে’ বলা হয়, যার অর্থ ‘মানুষ ভাল্লুক’। অনেকে আবার ইয়েতিকে ‘ডিজু-তেহ’ হিসাবেও উল্লেখ করেছে, যার অর্থ গবাদি ভাল্লুক বা হিমালয়ের বাদামী ভালুক। এর অন্য নামগুলোর মধ্যে রয়েছে মিগই (বন্য মানুষের তিব্বতি নাম), বান মঞ্চি (জংলি মানুষের নেপালি নাম), মিরকা এবং কাং আদমি।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর পর্বত অভিযাত্রী দল ৯ এপ্রিল মাকালু বেস ক্যাম্পের কাছে এই ছাপ দেখতে পান। এর মাপ ৩২ বাই ১৫ ইঞ্চি। মাকালু বরুণ ন্যাশনাল পার্কে এর আগে এই ধরনের ছাপ দেখতে পাওয়া গিয়েছিলো ।

বহু কাল ধরে লোকসাহিত্যে এবং মানুষের মুখে মুখে এই কাল্পনিক তুষারমানবের গল্প শোনা গেলেও আজ অব্দি একে দেখতে পাননি কেউই, নেই ছবিও। কেবল মাঝে মাঝেই বিশালাকার পায়ের ছাপ ও টুকরো কিছু জিনিস কৌতুহল বাড়িয়ে তোলে। লোকসাহিত্যে এবং মানুষের মনে ইয়েতি নিয়ে বহু ধারণা প্রচলিত।

নেপালের লোকসাহিত্যে ইয়েতিকে ‘ভয়ঙ্কর তুষারমানব’ বলেই ডাকা হয়েছে। খানিক বনমানুষের মতো দেখতে, যে কোনও মানুষের থেকেই বিশালাকার এবং মানুষের বিশ্বাস এই প্রাণী হিমালয়, সাইবেরিয়া, মধ্য ও পূর্ব এশিয়ায় বাস করে। ১৯ শতকেরও আগে ইয়েতিকে হিমবাহের প্রাণী বলে মনে করা হত! সেই সময় আদিবাসীরা ইয়েতিকে পুজো করত। মানুষ বিশ্বাস করতো, ইয়েতি আসলে বনমানুষের মতোই কোনও প্রাণী, যার সঙ্গে অস্ত্র হিসেবে থাকে একটা বিশাল পাথর। পাহাড়ে শিস দিয়ে ঘুরে বেড়ায় সে।

হিমালয়ের অভিযাত্রীদের অনেকে বারেবারেই হিমালয়ের বরফের মধ্যে একটি বন্য লোমশ জন্তুর গল্প শুনিয়েছেন। ১৯২০-র পর থেকে নেপালের এই পর্বতমালাকে ঘিরে এবং এর মধ্যে অদেখা ভয়ের এই কল্পকাহিনী মানুষের কাছে আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই, ইয়েতির পায়ের ছাপ, লোমের অংশ এসব দেখা গিয়েছে বলে দাবি উঠেছে কিন্তু আজ অব্দি কেউই এই ধরণের কোনও প্রাণীর কোনও বিশ্বাসযোগ্য ছবি দেখাতে পারেননি। তবে ইয়েতিকে নিয়ে ছবি বানিয়েছেন অনেকে পরিচালক।  ইয়েতি নিয়ে সর্বশেষ সিনেমাটি ভারতে হয়েছে, সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ইয়েতি অভিযান, যার মুখ্য অভিনেতা প্রসেনজিৎ।

জনপ্রিয় কার্টুন ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার্স অফ টিনটিন’-এর একটি পর্বে ইয়েতির উল্লেখ রয়েছে। এখানে ইয়েতিকে দেখানো হয়েছে এমন একটি জীব হিসেবে যা মানুষের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য নকল করতে পারে। এখানে ইয়েতি কেবল বুনো জন্তু নয়, বরং মানুষের মতো মন থাকা একটি প্রাণী।

২০১৬ সালে ট্র্যাভেল চ্যানেলে ‘হান্ট ফর দ্য ইয়েতি’ নামে একটি বিশেষ চার পর্বের অনুষ্ঠানও হয়েছে।

গবেষকরা অবশ্য এতদিনেও ইয়েতির অস্তিত্বের খুব একটা প্রমাণ পাননি। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি গোষ্ঠী হিমালয় অঞ্চল জুড়ে সংগৃহীত একাধিক নমুনা নিয়ে গবেষণা করেন এবং অবশেষে জানান, ওসবই আসলে ভাল্লুকের। ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুইজন দাবি করেন যে, তারা একটি অর্ধ মানুষ, অর্ধেক বানরের দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছে। যদিও পরে জানা যায় যে, ওটি আসলে একটি রবারের তৈরি গরিলার পোশাক।

এবার ভারতের সেনাবাহিনী ইয়েতির পায়ের ছাপ দেখার কথা জানানোতে নতুন করে তোলপাড়। ন্যাশনাল ইন্সিটিটিউট অব এডভান্স স্টাডিজ-এর প্রফেসর অনিন্দ্য সিনহা সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছেন সেনাবাহিনীর বক্তব্যকে। ইয়েতিফিয়েতি কিছু নয়, এগুলো বাদামী ভালুকের পায়ের ছাপ বলে মত দিয়েছেন বিশ্বখ্যাত এই বানরবিশেষজ্ঞ।

নিরেট প্রমাণ চার বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি’র (বিএনএইচএস) পরিচালক দীপক আপ্ত । তিনি বলেন, প্রকৃতিজগতে অনেক রহস্যময় ঘটনা ঘটে। পায়ের ছাপ ইয়েতির কি না, প্রমাণাদি লাগবে, লাগবে বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন। এ নিয়ে বিতর্কও হবে।

আরো অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন ইয়েতির অস্তিত্ব নিয়ে। তো এমন একটি প্রমাণবিহীন দাবি আবারো কেনো যে তুললেন ভারতের অভিযাত্রীরা, তাও আবার সেনাবাহিনীর, সেটাই আরেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত