প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নুসরাত হত্যায় জড়িত অনেকেই টাকার বিনিময়ে আওয়ামীলীগে আশ্রয় নিয়েছে

ডেস্ক রিপোর্ট : ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহানকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের কয়েকজনের সঙ্গে দলীয় সংশ্লিষ্টতা থাকায় বিব্রত আওয়ামী লীগ । কেন্দ্র থেকে বহিরাগতদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও এ নিয়ে দলে নতুন অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। বহিরাগত দলছুট হাইব্রিডদের সঙ্গে দলের প্রথম সারির অনেক নেতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এছাড়া জামায়াত-শিবির ও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে যারা রাতারাতি নেতা বনে গেছেন, তাদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের জেলা-উপজেলা কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা দিয়ে দলে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ আবার তাদের ক্ষমতাকেন্দ্রিক বাণিজ্যে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সরাসরি অংশীদার করে নিয়ে রাজনীতি লেবাস পাল্টেছেন বলেও গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন। যায়যায়দিন।

অন্যদিকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিসহ স্থানীয় পর্যায়ের অনেক বড় নেতা দলীয় প্রতিপক্ষকে কোনঠাসা রাখতে জামায়াত-শিবির-বিএনপির ক্যাডারদের নিজ উদ্যোগে আওয়ামী লীগে ভিড়িয়েছেন। বিশেষ করে সংসদ ও স্থানীয় নির্বাচনের আগে-পরে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটেছে বলে তৃণমূল নেতাকর্মীরা স্বীকার করেছেন। গত বছরগুলোতে বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানকারীদের তালিকা তৈরির পাশাপাশি তা যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, শুধু জেলা-উপজেলা কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে নয়, বহিরাগতদের দলে আশ্রয় দিয়ে রাতারাতি পদ-পদবি বাগিয়ে দেয়ার বিপুল সংখ্যক ঘটনা রাজনীতি কেন্দ্রবিন্দু খোদ রাজধানীতেই ঘটেছে। তবে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা না নিয়ে ক্ষমতাসীন দলে বহিরাগতদের কাউকে পাকাপোক্ত অবস্থা তৈরি করে দেয়ার ঘটনা নেই বললেই চলে।

বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানকারীদের তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানায়, বহিরাগত যারা রাতারাতি দলে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন, প্রাথমিকভাবে তাদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যদের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করা হবে। এসব বহিরাগতরা কার মাধ্যমে কবে, কীভাবে আওয়ামী লীগে ঢুকেছে তা খোঁজা হচ্ছে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে এ নিয়ে দলের ভেতরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির কথা ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ স্থানীয় একাধিক নেতাও স্বীকার করেছেন। তারা জানান, মাঠপর্যায়ে তথ্য অনুসন্ধানের পর আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহিরাগতদের দলে আশ্রয় দেয়ার প্রমাণ মিলেছে। এদের অনেকের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা না নেয়া হলেও দলীয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তাদের পেশিশক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ এসব নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে সেখানকার পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। গাছের চেয়ে পরগাছা রাতারাতি অনেক বেশি ডালপালা মেলে ধরায় এখন তা হুড়োহুড়ি করে ছেঁটে ফেলতে গেলে সেখানে দলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের অনেকেই।

দলীয় সূত্র জানায়, এ ধরনের আশঙ্কা থেকেই বছর খানেক আগে আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, যুদ্ধাপরাধী কেউ বা জামায়াত-শিবিরের কেউ যেনো দলে যোগ দিতে না পারে। এছাড়া অন্য দলের কেউ আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চাইলে তার অতীত যাচাই করে দেখার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল দলটির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের। তবে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই নির্দেশ দেয়া হলেও তা মানেননি অনেকেই। এছাড়া দলের কেন্দ্র থেকেও এ বিষয়টি এতদিন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণও করা হয়নি। ফলে স্থানীয় নেতারা যে যার মতো করে দলে বহিরাগতদের ঠাঁই দিয়েছেন।

বিষয়টি স্বীকার করে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, ‘আমরা দুর্ভাগ্যজনকভাবে লক্ষ্য করেছি যে, বিভিন্ন সময় বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে বিভিন্ন দল থেকে এসে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বা বিদ্রোহী প্রার্থীর সাথে ভিড়েছেন। যা উদ্বেগজনক।’

তিনি জানান, কোথায় কে কোন দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করল দলীয় সভাপতির নির্দেশে এরই মধ্যে সারাদেশে সে তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি তা যাচাই-বাছাই করার জন্য কমিটি করা হয়েছে। তালিকা যাচাই করে যাদের সাথে আওয়ামী লীগের রাজনীতির ফারাক পাওয়া যাবে, তাদের দল থেকে বের করে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হবে। দলের যারা তাদের প্রশ্রয় দিয়েছেন, তাদের ব্যাপারেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

যদিও কেন্দ্রের এ ধরনের হুমকি-ধামকিকে ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি’ বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের অনেকেই। তাদের ভাষ্য, বহিরাগতদের দলে ভেড়ানোর ব্যাপারে যেসব নেতারা বড় বড় কথা বলছেন, তারাই অনেকে নিজ স্বার্থে তাদের (বহিরাগতদের) দলে ঠাঁই দিয়েছেন। তাদের আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে নিজেরাই নানা খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। যা দেখে অন্যরা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তাই বহিরাগতদের দলে ঠাঁই দেয়ার ব্যাপারে কঠোর হতে হলে গোঁড়ার গলদ সারাতে হবে বলে মন্তব্য করেন তারা।

তাদের এ অভিযোগ যে একেবারে অমূলক নয়, তা জামায়াতের বেশ কয়েকজন পদধারী নেতার আওয়ামী লীগে যোগদানের ব্যাপারে দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতার ভূমিকায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু সুবিধাবাদী রাজনীতি নয়, এর পিছনে আর্থিক লেনদেন থাকতে পারে?

প্রসঙ্গত, কুষ্টিয়ায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় সদস্য, নাশকতার একাধিক মামলার আসামি নওশের আলী আওয়ামী লীগে যোগ দেন দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার হাত ধরে? এ নিয়ে ওই সময় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হলেও কার্যত এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

এছাড়া পাবনার আতাইকুলা ইউনিয়ন শাখা জামায়াতের নায়েবে আমির রাজ্জাক হোসেন রাজার নেতৃত্বে জামায়াতের ২ শতাধিক স্থানীয় নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেন ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে। যাদের অনেকের বিরুদ্ধেই হরতাল-অবরোধে নাশকতার মামলা আছে? স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, জামায়াতের নেতারা মামলা থেকে বাঁচতে ওই সময় আওয়ামী লীগে যোগ দিলেও তারা এখন দলে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। অথচ দলের ত্যাগী নেতারা অনেকেই ছিটকে পড়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জানান, বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে আশ্রয়ের ঘটনা ঘটেছে মূলত দুটি পর্যায়ে। প্রথম পর্যায় হলো- ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। আর দ্বিতীয় পর্যায় হলো-২০১৪ সালে চারদলীয় জোট যখন সরকারবিরোধী সহিংস আন্দোলনে ব্যর্থ হয় তার পর।

এর মধ্যে ২০০৯ সালের পর বড় দাগে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে মোট যোগদানের ঘটনা ঘটেছে ৮৩টি। এর মধ্যে ৬২টি যোগদান হয়েছে একই সঙ্গে জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের সম্মিলিত। বাকি ২১টি যোগদান হয়েছে শুধু বিএনপি নেতাকর্মীদের। আর এ যোগদানের ঘটনাগুলোর মধ্যে ৬০টি হয়েছে ২০১৪ সালের পর। বিএনপির নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে শুধুমাত্র নিজেদের গা বাঁচালেও জামায়াতপন্থি অংশ দলীয় পদ-পদবি পেতে সব সময়ই মরিয়া ছিল। এর জন্য তারা আওয়ামী লীগ নেতাদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আওয়ামী লীগের যেসব জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন ও ইউনিট কমিটির সম্মেলন ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের আগে শেষ হয়েছে আর অভ্যন্তরীণ বিরোধে যেখানে সম্মেলন হতে পারেনি সেসব এলাকায় যোগদানকারী জামায়াতপন্থী নেতারা অর্থের বিনিময়ে স্কুল-কলেজ পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপূর্ণ পদে বসেছেন। যেসব এলাকায় দলীয় সম্মেলন হওয়ার আগে যোগ দিয়েছেন, সেসব এলাকার কমিটিতে স্থান করে নিয়েছেন তারা।

এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার বলেন, জামায়াত সদস্যদের আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার সুযোগ করে দিয়ে শুধু দল হিসেকে আওয়ামী লীগই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং জাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? কারণ স্বাধীনতার পক্ষ এবং বিপক্ষ শক্তির যে একটি বিভাজন রেখা আছে, তা মুছে দেয়ার প্রবণতা এর মধ্যে লক্ষণীয়?

তিনি মনে করেন, স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের যে নেতারা জামায়াতকে তাদের দলে যোগ দেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন, তারা যে ভোটে সুবিধা নিতে এটা করছেন, তা নয়? এর পিছনে আর্থিক লেনদেন থাকতে পারে? তারা অর্থের বিনিময়ে জামায়াত সদস্যদের আওয়ামী লীগে আশ্রয় দিচ্ছেন? অন্যদিকে এই যোগদানের মাধ্যমে জামায়াত সদস্যরা যে আদর্শগত দিক দিয়ে পরিবর্তিত হয়েছেন, তা মনে করেন না শান্তনু মজুমদার?

তার কথায়, জামায়ত এখন নানা দিক দিয়ে চাপের মুখে রয়েছে? সাধারণ মানুষের কাছেও তারা প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে? তাদের নেতারা যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি?তারা নাশকতাসহ নানা সহিংসতার মামলার আসামি? তাই নিজেদের বাঁচাতে কৌশল হিসেবে তারা আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত