প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমাদের নতুন সময়কে যেরকম দেখতে চাই

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : নাইমুল ইসলাম খান সম্পাদিত ‘আমাদের নতুন সময়’ পত্রিকাটির ৬ বছর পূর্ণ হলো। পত্রিকাটি সম্পাদক, সাংবাদিক, কলাকুশলীদের জানাই বর্ষপূর্তির অভিনন্দন। যতটুকু জানি পত্রিকাটি এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় পাঠকদের হাতে কমবেশি পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে অসংখ্য পত্রিকার ভিড়ে নতুন একটি পত্রিকা জায়গা করে নেওয়া, পাঠকের হাতে পৌঁছানো মোটেও সহজ কাজ নয়। তেমন পরিস্থিতিতে আমাদের নতুন সময় এক বছরে দেশব্যাপী জায়গা করে নিতে পেরেছে- এটি একেবারেই কমকিছু নয়। নিশ্চয়ই পাঠকরা পত্রিকাটি হাতে তুলে নেওয়ার মতো পত্রিকাটিতে কিছু না কিছু পাচ্ছেন। পড়ার মতো খুঁজে নিচ্ছেন।

সেকারণেই পত্রিকাটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজের জায়গা করে নিতে পারছে। আমার ধারণা কর্তৃপক্ষ সামনের দিনগুলিতে আরো ব্যাপক সংখ্যক পাঠকের হাতে আমাদের নতুন সময়কে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। সেই চেষ্টাটি হতে হবে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও লেখালেখির মালমশলাতে। গত এক বছর যেসব সংবাদ ও লেখালেখি এই পত্রিকাটিতে হয়েছে তা পাঠকদের দৃষ্টি কাড়তে পেরেছে। সেকারণেই পত্রিকাটিকে উপেক্ষা করা পাঠকদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত পাঠকদের পাঠের চাহিদা বাড়ছে ও পরিবর্তিত হচ্ছে। পরিবর্তিত এই চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে সম্পাদনা পরিষদ পত্রিকার সংবাদ পরিবেশন ও লেখালেখির বিষয়কে গুরুত্ব দিবেন- এটি এই পত্রিকার একজন নিয়মিত লেখক হিসেবে আমার প্রত্যাশা থাকল।

পত্র-পত্রিকায় আমার লেখালেখি বেশ সময় ধরে। ১৯৭৫ সালে আমি সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে যাই। তখন থেকে বাংলাদেশে প্রকাশিত সোভিয়েত কিছু পত্রিকা- যুববার্তা, উদয়ন, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সোভিয়েত নারী পত্রিকায় আমি নিয়মিত লেখালেখি শুরু করি। সেইসব লেখা একান্তই সোভিয়েত ইউনিয়নে আমার দেখা অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক। তবে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় মাঝেমধ্যে আমার কিছু লেখা ছাপা হতো। সেগুলো তেমন উল্লেখ করার মতো নয়। বলা যায় এসবই পত্রপত্রিকায় লেখালেখিতে আমার হাতেখড়ি মাত্র।

১৯৮৫ সালের শুরুতে দেশে ফিরে আসার পর প্রথমেই চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী, দৈনিক পূর্বকোণ পরে ঢাকার দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় আমি বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি শুরু করি। বলা চলে ১৯৮৫ সাল পরবর্তী সময় থেকে আমার পত্রপত্রিকার লেখালেখির যুগ শুরু হয়। একই সময়ে আমি শিক্ষকতায় প্রবেশ করি এবং দ্বিতীয় জগৎ হিসেবে আমার পরিচয় সংবাদপত্রেই বিস্তৃত হতে থাকে। এটি আমার জন্যে সবচাইতে বড় অডিটোরিয়াম- যেখানে আমার চিন্তার সঙ্গে একমত হওয়া না হওয়ার মানুষের সংখ্যা অসংখ্য হতে থাকে। নব্বই দশকের শুরুতে দৈনিক আজকের কাগজ, জনকণ্ঠ, ভোরের কাগজ ইত্যাদি নান্দনিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার পর লেখক হিসেবে আমার লেখার সংখ্যা বেড়ে যেতে থাকে। এইসব পত্রিকায় আমি সম্পাদকদের আগ্রহে লেখার সুযোগ পেতে থাকি। ফলে গত তিনদশকেরও বেশি সময় ধরে আমি বাংলাদেশের প্রায় সবকটি নতুন প্রজন্মের নান্দনিক পত্রিকার পাঠকদের কাছে আমার লেখা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি।

সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান আজকের কাগজ এবং এর পরবর্তী যে কয়টি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তার সবকটিতেই আমি নিয়মিত লেখালেখি করার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু নাইমুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় আগে খুব একটা ঘটেনি। টেলিভিশন টকশোগুলোকে মাঝেমধ্যে একসাথে বসার সুযোগ পেয়েছি। নতুন পত্রিকা হিসেবে আমাদের নতুন সময় প্রকাশিত হওয়ার আগে দৈনিক অর্থনীতি পত্রিকার অফিসে একদিন লেখকদের সমাবেশে আমার উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ ছিল। সেটিই বলা চলে প্রথম তার সঙ্গে আমার পত্রিকা অফিসে দেখা সাক্ষাৎ, কথাবার্তা। তখনই তিনি তার পত্রিকার নতুন ভাবনা নিয়ে লেখকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছিলেন।

সেখান থেকেই আমাদের নতুন সময়ের ধারণাটি পাই। প্রথমে আমাদের অর্থনীতিতে পরে আমাদের নতুন সময় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার আগে কিছু লেখা পত্রিকাটিতে প্রকাশের জন্যে নেওয়া হয়। তবে আমার মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করেছিল যে এ ধরনের পত্রিকা আদৌ পাঠকদের কাছে সমাদৃত হবে কিনা? এছাড়া এতোসব নতুন নতুন পত্রিকার মাঝে প্রায় কাছাকাছি নামের আরোও দু-একটি পত্রিকার মধ্যে আমাদের নতুন সময় বিভ্রান্তি কাটিয়ে কতটা নিজস্ব জায়গা করে নিতে পারবে সেটিও আমার কাছে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দের সৃষ্টি করেছিল। তবে নাইমুল ইসলাম খানের একধরনের ক্যারিজমা রয়েছে- যেটি সম্পর্কে আমার আগে থেকেই ধারণা থাকায় মনে হয়েছে তিনি নতুন পত্রিকার জন্যে নতুন পাঠক তৈরি করতে নানা ধরনের উপাদানের সমাহার ঘটিয়ে পত্রিকাটিকে পাঠকদের কাছে নিয়ে যেতে পারবেন।

গত একবছর আমি এই পত্রিকাটিতে নিয়মিত লিখে আসছি। দেখছি এই পত্রিকায় বেশ ক’জন খ্যাতিমান লেখক, সাংবাদিক লেখালেখি ও সম্পাদনা কাজে যুক্ত হয়েছেন, যাদের লেখা পাঠকরা পড়তে আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত আছেন। ফলে সমসাময়িক নানা বিষয় একদিকে যেমন সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে অন্যদিকে কলাম লেখকদেরও ছোট ছোট কলাম প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠায় স্থান করে নিচ্ছে। এটি অন্যকোন পত্রিকায় দেখার সুযোগ নেই। সেদিক থেকে মনে হয় যারা নানা ইস্যুতে বিদগদ্ধ জনের লেখা পড়তে আগ্রহী তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে। এর ফলে পুরাতন পাঠক নয় নতুন নতুন পাঠকও তৈরি হচ্ছে যারা ছোট ছোট কলাম পড়তে আগ্রহ প্রকাশ করছে। আমাদের নতুন সময় সম্ভবত এ কারণে পাঠকদের কাছে নিজের একটি জায়গা করে নিতে পারছে।

এমনিতেই দেশে এখন নানা ধরনের পত্রপত্রিকার ভিড়ে পাঠকদের কাছে পত্রিকার আবেদন কতটা বাড়াতে পেরেছে সেটি নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন আছে। সেক্ষেত্রে নতুনত্ব না থাকলে পাঠক কেন নতুন পত্রিকাকে তুলে নিবে সেই প্রশ্নতো করা যেতেই পারে। আমার মনে হয় আমাদের নতুন সময় এক বছরে নিজের পাঠক সংখ্যা যাচাই করে নিতে পারে। সেটিকে আরোও কিভাবে বাড়ানো যেতে পারে, কী ধরনের লেখা থাকলে পাঠকদের বাড়িতে নিয়মিত পত্রিকাটি রাখা হবে সেটি বিবেচনায় রেখেই এর প্রচার সংখ্যা বাড়ানোর প্রতি মনোযোগ দিতে পারে। বাংলাদেশে অনেক পত্রিকা রয়েছে- যেগুলোর প্রচার সংখ্যা কমে এসেছে, মালিকপক্ষও পত্রিকার প্রচার বাড়াতে খুব একটা উৎযোগী নয়। এ ধরনের পত্রিকা খুব বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। থাকলেও এগুলোর সামাজিক মূল্য তেমন থাকবে না।

সেকারণেই প্রয়োজন হচ্ছে ব্যাপক সংখ্যক পাঠকের হাতে পৌছানোর মতো পত্রিকা। যার মধ্যে দেশ, সমাজ, বিশ্ববাস্তবতা, প্রকৃতি, জলবায়ু, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমাজ সচেতনতা, নানা ধরনের উপাদানসমৃদ্ধ লেখালেখি যেটি আমাদের দেশে এই মুহূর্তে বেশ জরুরি। কেননা আমাদের দেশ এখন অর্থনীতিতে দ্রুত সমৃদ্ধ অর্জন করছে। মানুষের কর্মব্যস্থতা বেড়ে গেছে। কিন্তু বইপড়া বা দেশবিদেশের জ্ঞান, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, পরিবেশ, বিজ্ঞান সচেতনতা, আইনকানুন, বিচার, প্রশাসন ইত্যাদি নিয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞানের বইপড়ার অভ্যাস এমনিতেই বেশ কম, সুযোগও অনেকের জন্যে কমে এসেছে।

সেকারণে ব্যস্ততার মাঝেও কর্মজীবি যেকোন মানুষ পত্রিকার পাতায় এইসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞানের চিটেফোঁটা হলেও যেন চোখ বুলিয়ে নিতে পারে সেই কাজটি পত্রিকাগুলো করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ পত্রিকারই তেমন সাধ বা সাধ্য আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু চারদিকের এত দুর্যোগ, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা, দুর্নীতি, দখল দারিত্ব মেধাহীনতার আস্ফালন ইত্যাদির পরিণতি আমাদের জন্যে মোটেও শুভকর নয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে কাজে লাগানোর জন্যে একেবারেই সহায়ক হবে না। সেকারণে প্রয়োজন কমবেশি জ্ঞানের চর্চা করা। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমনিতেই জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা খুব একটা মানসম্মত নয়, একুশ শতকের জন্য উপযোগীতো নয়ই বরং ক্ষতিকর পর্যায় রয়েছে বলে একজন শিক্ষা জগতের বিদায় মানুষ হিসেবে দৃঢ়ভাবে বলতে পারি। সেই পরিস্থিতিতে আমাদের গণমাধ্যম কতটা মানুষকে পারিপার্শিক এতসব সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ জানা, বুঝা ও প্রতিকার খুঁজে নেওয়ার ভূমিকা পালন করবে সেটি একটি মস্তবড় প্রশ্ন।

এমন পরিস্থিতিতে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে কয় বছর সম্মুখে আস্থার সঙ্গে চলতে পারবো সেটিও বেশ উদ্বেগের বিষয়। এইসব প্রশ্নের উত্তর খোজার জন্য আমাদের নতুন সময় কতটা নিজেকে লেখালেখিতে তৈরি করবে, পাঠকদের সচেতন করবে সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই কাজটি প্রথাগত কোন পত্রিকা নাও করতে পারে। আমাদের নতুন সময় প্রথা ভেঙ্গে সম্মুখে এগোতে চাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমাদের নতুন সময়কে সময়ের নতুন চাহিদাকে পাঠকের সম্মুখে তুলে ধরতে হবে। সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তাহলেই আমাদের দেশ, সমাজ এবং এর জনগন বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত