প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সরকার নিরাপদ, সংকটে বিরোধীরা

বিভুরঞ্জন সরকার : দেশের রাজনীতিতে এক জটিল অবস্থা তৈরি হয়েছে। সরকার এবং সরকারি দলকে যেখানে বিরোধীদের চাপের মুখে থাকার কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে সরকার আছে চাপমুক্ত এবং বিরোধী মহলে চলছে নানা সংকট। অবশ্য ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোর’ নীতি অনুযায়ী রাজনীতির চলমান অস্থিরতার জন্যও সরকারকেই দায়ী করা হচ্ছে। রাজনীতিতে যা কিছু ঘটছে, সব কিছুর পেছনেই খোঁজা হচ্ছে সরকারের হাত। সরকারবিরোধী ২০-দলীয় জোট নিষ্ক্রিয়। এরজন্য দায়ী কে? জবাব : সরকার। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অভ্যন্তরে সমস্যা বাড়ছে। কেন? সরকার কলকাঠি নাড়ছে। গণফোরামের দুই এমপি দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে শপথ গ্রহণ করলো কেন? সরকারের চাপে। বিএনপির এক এমপি দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নিলেন, অন্যরাও নিতে চাচ্ছেন। কারণ কি? সরকারি চাপ। জামায়াতের সংস্কারপন্থি বলে পরিচিতরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার পেছনেও আছে সরকারের হাত।

সরকার এখন সর্বশক্তির অধিকারী। বিরোধী দলগুলোও চলছে সরকারের অঙ্গুলি হেলনে। আসলে কি তাই? সরকার কি বিরোধী দলে গৃহদাহ উস্কে দিতে কোনো ভূমিকা পালন করছে? সরকার বা আওয়ামী লীগ কি তাদের বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করার জন্য নেপথ্যে সত্যি কোনো কলকাঠি নাড়ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। তবে রাজনীতি যেহেতু প্রধানত একটি কৌশলের খেলা সেহেতু সরকার যদি তার প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার কোনো কৌশলের সফল প্রয়োগ করে থাকে তাহলে তো সরকারকে দোষ দেয়া যাবে না। সরকারের আনুকূল্য বা বদান্যতায় কোনো দেশেই বিরোধী দল তৈরি বা প্রতিষ্ঠিত হয় না। বাংলাদেশেও সেটা হয়নি, হবেও না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি কোনো দল ভাঙার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কোনো দল ভাঙা বা অন্য কিছু করার নীতিতে যাবো কেন? যার যার দল সেই করুক। আওয়ামী লীগে অনেক লোকবল ও জনসমর্থন রয়েছে। অন্যের ভার নিতে যাবো কেন’?

প্রধানমন্ত্রী দল ভাঙার রাজনীতি না করার কথা বললেও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সাম্প্রতিক সময়ে নানা ধরনের গৃহবিবাদ মাথাচাড়া দিতে দেখা যাচ্ছে তাতে সরকারের কারো না কারো কোনো ইন্ধন একেবারেই নেই তা হয়তো বলা যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে সংকট, টানাপড়েন এখন কিছুটা বেশি। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও এখন আস্থা-বিশ্বাসের সংকট অতীতের যেকোনো সময় থেকে এখন বেশি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতিতে পাল্লা দেয়ার মতো দল হলো বিএনপি। কিন্তু ভুল রাজনৈতিক নীতি ও কৌশল গ্রহণ করে বিএনপি গত কয়েক বছরে নাজুক অবস্থায় চলে এসেছে। বিএনপি ক্ষমতায় থেকে জন্ম নেয়া দল। মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না, বিএনপিও তেমনি ক্ষমতা ছাড়া টিকতে পারে না। অথচ গত প্রায় এক যুগ ধরে দলটি আছে ক্ষমতা থেকে দূরে, এমনকি সংসদেরও বাইরে। বিএনপির কার্যক্রম দিনদিন সীমিত হয়ে পড়ছে। দলের প্রধান দুই স্তম্ভ খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের দীর্ঘ টানা অনুপস্থিতি বিএনপিকে কাহিল করে ফেলছে। দল কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। দলের সিনিয়র নেতারাও নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন না। তাদের মতামতের তেমন গুরুত্ব নেই। ভোটের রাজনীতি, জোটের রাজনীতি কোনোটাতেই জোরালো অবস্থান রাখার সুযোগ এখন বিএনপির নেই। বর্তমান সংসদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান ও মূল্যায়ন দলটির জনবিচ্ছিন্নতাই কেবল বাড়াচ্ছে। নির্বাচিত এমপিরা যদি সংসদে যোগ দেন এবং দল তাদের বহিষ্কার করে, তাহলে বিএনপির সংকট আরো বাড়বে। সামগ্রিক বিশ্লেষণে এটা বলা যায় যে, বিএনপিকে বাইরের কারো ভাঙার প্রয়োজন নেই। দলটি এমনিতেই নিঃশেষ হতে বসেছে।

বিএনপির ঘনিষ্ঠ মিত্র জামায়াতে ইসলামীও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় আছে। জামায়াতের একটি সংস্কারকামী অংশ নতুন নামে রাজনীতিতে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছে। জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত, সাবেক শিবির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু ‘জন আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ নামের একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে দলের মধ্যে কিছু ভিন্নমত থাকলেও তা খুব প্রবল নয়। যারা নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন তারা তাদের পক্ষে মূল জামায়াতের কতোটুকু সমর্থন আদায় করতে পারবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। তারা কোন জন আকাক্সক্ষ পূরণ করতে চান তা-ও দেখার বিষয়। জামায়াতের যে বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য সেটা যাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে তাদেরই চালকের আসনে থাকার কথা। নব্য জামায়াতিদের ব্যাপারে গণমাধ্যম যতোটা আগ্রহ দেখাচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে তার ছিঁটেফোটাও আছে বলে মনে হয় না।

ড. কামাল হোসেনের গণফোরামের মধ্যেও চলছে অস্থিরতা। নির্বাচনের আগে বিএনপিকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে রাজনীতিতে ব্যাপক প্রচার পেয়েছেন ড. কামাল হোসেন। বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করলে ক্ষমতায় যাওয়া সহজ হবে বলে হয়তো কোনো মহল থেকে কামাল হোসেনদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি কোনো সময় সহজসরল পথ ধরে অগ্রসর হয় না। নানা জটিল সমীকরণে কামাল হোসেন এবং বিএনপির সাধ পূরণ হয়নি। উল্টো কামাল হোসেনের দল গণফোরাম এখন গভীর সংকটের মুখে। কামাল হোসেনের নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ।

গণফোরামের দুই এমপি দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নিয়েছেন। আট বছর পর গত ২৬ এপ্রিল দলের কাউন্সিল অধিবেশন করা হলেও দলের নেতৃত্ব নির্বাচনে ব্যর্থ হয়েছেন কামাল হোসেন। নতুন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন ড. কামাল হোসেন। গণফোরামের মতো একটি নেতাসর্বস্ব দলও আবার ভাঙনের মুখে বলে শোনা যাচ্ছে। দেশে গণতন্ত্রের ঘাটতি নিয়ে সারাক্ষণ কথা বলেন কামাল হোসেনরা। কিন্তু নিজের দলটিও যে গণতন্ত্রের সংকটে ছটফট করছে তা নিয়ে দেশসেরা আইনবিদ ড. কামাল হোসেন।
লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত