প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শপথের শেষ দিন আজ

আহমেদ শাহেদ : সংবিধান অনুযায়ী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির বাকি পাঁচ সদস্যের শপথ নেয়ার শেষ দিন আজ। যদি আজকের মধ্যে তারা শপথ না নেন, তবে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
সংবিধানের পঞ্চম ভাগের প্রথম পরিচ্ছেদের ৬৭(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতা বলে এ বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি। শপথ না নিলে আসন শূন্য ঘোষণা করবেন, নাকি আরও সময় দেবেন- তা নির্ধারণের এখতিয়ারও স্পিকারের। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীই এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।

তবে তিনি মনে করেন, ‘বিএনপির বাকি সদস্যরাও শপথ নেবেন। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘আশাকরি তারা (বিএনপির সদস্যরা) শপথ নেবেন। আমরা শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তাদের জন্য অপেক্ষায় থাকব।’

বিএনপি থেকে নির্বাচিত একজনের শপথের পর বাকিরাও সংসদে যোগ দিতে পারেন বলে জোর গুঞ্জন চলছে। এ নিয়ে দলের ভেতরে ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। কেউ যাতে শপথ না নেন, সেজন্য নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, বিজয়ী ব্যক্তিরা যাতে শপথ নেন সেজন্য সরকার নানাভাবে চাপ তৈরি করছে এবং তাদের নজরদারিতে রেখেছে।

এ অবস্থায় বিএনপির নির্বাচিতদের সঙ্গে দলীয় নেতাদের যোগাযোগ করাও দুরূহ হয়ে পড়েছে। এছাড়া বিজয়ী কেউ কেউ দলের শীর্ষ নেতাদের এড়িয়ে চলছেন। তারপরও থেমে নেই তাদের তৎপরতা। নির্বাচিতদের সঙ্গে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কথা বলছেন। তাদের নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছেন।
এর অংশ হিসেবে রোববার সন্ধ্যায় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ফের জরুরি বৈঠকে বসেন। কিভাবে নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণ থেকে বিরত রাখা যায় তার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আটটি আসনে জয়লাভ করে। এর মধ্যে ছয়জন বিএনপির; বাকি দু’জন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামের। নির্বাচনের পরপরই ভোটে ব্যাপক অনিয়ম এবং কারচুপির অভিযোগ তুলে তা প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানানোর পাশাপাশি তারা শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে এ সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে গণফোরামের দুই সংসদ সদস্যের মধ্যে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহম্মেদ গত ৭ মার্চ শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন। তাকে অনুসরণ করে গণফোরামের প্রতীক উদীয়মান সূর্য নিয়ে সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত দলটির আরেক নেতা মোকাব্বির খান গত ২ এপ্রিল শপথ নেন।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান শপথ নেন। এ কারণে দল তাকে বহিষ্কারও করেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এভাবে শপথ নেয়ায় বিএনপির হাইকমান্ডসহ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বিব্রত। এরপর যাতে আর কেউ শপথ না নেন সেজন্য তারা তৎপর।

যদিও জাহিদুর রহমান জনগণের চাপে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এ শপথ নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস শেষ মুহূর্তে হলেও বিএনপির নির্বাচিত বাকি পাঁচজনও শপথ নেবেন।’ এমনটাই মনে করেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বিএনপি নিজের প্রয়োজনেই সংসদে আসবে।’

তবে শপথ না নেয়ার বিষয়ে এখনও অনড় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘আমরা শপথ নেব না। দলগতভাবেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কেউ শপথ নিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতিমধ্যে জাহিদুর রহমানকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’

তিনি দাবি করেন, শপথ নেয়ার ব্যাপারে সরকারের দিক থেকে তাদের সদস্যদের ওপর চাপ রয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সরকার এ ধরনের চেষ্টা করে থাকে। যদিও মির্জা ফখরুল ইসলামের এ দাবির বিরোধিতা করে মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপির সদস্যদের ওপর চাপপ্রয়োগের প্রশ্নই ওঠে না। বিএনপির সদস্যরা তাদের প্রয়োজনেই সংসদে আসবেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিএনপি থেকে নির্বাচিত আরও তিনজন শপথ নেয়ার অপেক্ষায় আছেন। কৌশলগত কারণে প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও ভেতরে ভেতরে এমনটাই প্রস্তুতি তাদের।

এই তিনজন হলেন- বগুড়া-৪ আসন থেকে নির্বাচিত মো. মোশারফ হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত সদস্য মো. হারুন উর রশীদ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচিত সদস্য আমিনুল ইসলাম। তাদের ইচ্ছা আছে কিন্তু দলের সিদ্ধান্তের কারণে দোটানায় পড়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হারুন উর রশীদ রোববার বলেন, ‘এখন কোনো মন্তব্য নয়, পরে কথা হবে।’ অন্যদিকে শপথের বিষয়ে জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম  বলেন, ‘আমি এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি।’

মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আমি এখনও দলীয় সিদ্ধান্তে অনড় আছি। দল যে সিদ্ধান্ত নেবে সেখানেই থাকব। তবে দলের রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। দেখা গেছে ১০ মিনিট আগেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন আসতে পারে।’ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের সদস্য উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াও শপথ নেবেন- এমন খবরের সত্যতা তার কাছে জানতে চাইলে রোববার যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘সময় শেষ হয়ে যায়নি। আশা করছি সবকিছু অচিরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

সূত্র জানায়, মুখে যাই বলুক না কেন বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী এই চারজন সদস্যই শপথ নেয়ার অপেক্ষায় আছেন। স্থানীয় পর্যায়ের জনগণের চাপের কথা মুখে বললেও মূলত পারিবারিক চাপ আর নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছা এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে। দলের সিদ্ধান্তের চাইতে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা প্রাধান্য পাওয়ায় শেষ মুহূর্তে হলেও শপথ নিতে পারেন তারা। বিষয়টি আজকের মধ্যেই পরিষ্কার হবে।

সংবিধানের ৬৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হইবে, যদি (ক) তাহার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে নব্বই দিনের মধ্যে তিনি তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিতে ও শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করিতে অসমর্থ হন; তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পূর্বে স্পিকার যথার্থ কারণে তাহা বর্ধিত করিতে পারিবেন।’

সংবিধানের এ বিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে তাদের শপথ নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ হিসেবে আজকের (২৯ এপ্রিল) মধ্যে শপথ না নিলে আসনগুলো শূন্য হবে। একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ৩০ জানুয়ারি। ২৯ এপ্রিল ৯০ দিন পূর্ণ হবে। এক্ষেত্রে একই অনুচ্ছেদের ‘অনুরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পূর্বে স্পিকার যথার্থ কারণে তাহা বর্ধিত করিতে পারিবেন’- বিধানটি প্রয়োগ করে শপথ নেয়ার সময় বাড়াতে পারেন।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে রোববার বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী কারও সদস্যপদ শূন্য ঘোষণা করা না করার পুরো এখতিয়ার একমাত্র স্পিকারের। নব্বই দিনের মধ্যে কোনো সদস্য শপথ না নিলে তিনিই করণীয় ঠিক করবেন। এক্ষেত্রে স্পিকার নির্বাচিত সদস্যকে শপথ নেয়ার জন্য আরও সময় দিতে পারেন, নাও পারেন। তবে সময় বাড়ানোর জন্য নির্বাচিত সদস্যকে স্পিকার বরাবর আবেদন করতে হবে। যার ওপর ভিত্তি করে স্পিকার শপথ নেয়ার সময় বাড়াতে পারেন।’

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিএনপির নির্বাচিত পাঁচ সদস্য শপথ না নিলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবহিত করা হবে। এরপর নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। সূত্র : যুগান্তর।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত